কুফরি কালাম বা কালো জাদুর আশ্রয় নিয়ে তাবিজ-কবজ করার ব্যাধি বর্তমানে ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষ অপরের অনিষ্ট কামনায় লিপ্ত হচ্ছে ব্ল্যাক ম্যাজিকের মতো নিকৃষ্ট পন্থায়। এমন কি আন্তর্জাতিক ফুটবল ও ক্রিকেট টুর্নামেন্টের মাঠে প্রকাশ্য ব্ল্যাক ম্যাজিক বা কালো জাদুর প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে।

যারা আধুনিক বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে বা অতিবিজ্ঞানমনস্কতার কারণে কোরআনে বর্ণিত 'সিহর' বা জাদুর বাস্তবতাকে অস্বীকার করেন, তাদের জন্য এগুলো এক একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। এটি এখন কোনো গোপন বিষয় নয়, বরং আন্তর্জাতিক মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতেও খেলোয়াড়দের ওপর কালো জাদু করার খবর নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। সুতরাং, এর সত্যতাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। একজন মুমিনের জন্য অবশ্য বাহ্যিক কোনো প্রমাণের প্রয়োজন হয় না, স্বয়ং পবিত্র কোরআনে সিহরের বিবরণ থাকাই যথেষ্ট।

বিজ্ঞান সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে না, ভবিষ্যতেও পারবে না। তাই কেউ কালো জাদু বা কুফরি কালাম দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন বলে মনে হলে, ভুক্তভোগীর প্রথম কাজ হবে মহান আল্লাহর দিকে রুজু হওয়া এবং তাঁরই নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা। এ ধরনের অনিষ্ট থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে প্রথমত দৈনন্দিন কিছু সুন্নাহভিত্তিক আমল নিয়মিত করা উচিত। কেউ যদি সকাল-সন্ধ্যার রক্ষাকবচ দোআসমূহ নিয়মিত পাঠ করে এবং রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শেখানো সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করে, তবে ইনশাআল্লাহ কোনো কালো জাদু তার ক্ষতি করতে পারবে না। এ ছাড়া প্রতি হিজরী মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের ‘আইয়ামে বীজের' রোজা পালন এবং ঘরে নিয়মিত সুরা বাকারা তিলাওয়াত করা বা শ্রবণ করা এই সমস্ত অনিষ্ট থেকে সুরক্ষার অন্যতম মাধ্যম।

আরও পড়ুন

শায়খ আহমাদুল্লাহ / রাগের মাথায় ভুল থেকে বাঁচার উপায়

এ বিষয়ে আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন থেকে একটি সংক্ষিপ্ত নির্দেশিকা বা লিফলেট প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে বদনজর ও ব্ল্যাক ম্যাজিক থেকে বেঁচে থাকার গাইডলাইন রয়েছে। এটি ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইট থেকে বিনামূল্যে ডাউনলোড করা সম্ভব।

আর কেউ যদি ইতোমধ্যেই কালো জাদুতে আক্রান্ত হয়ে পড়েন, তবে তাঁর জন্য করণীয় হলো 'রুকইয়াহ' বা শরঈ ঝাড়ফুঁকের আশ্রয় নেওয়া। কোরআন কারিমের নির্দিষ্ট কিছু আয়াত নিয়তসহকারে পাঠ করে নিজের শরীরে, পানিতে বা খাদ্যে ফুঁ দেওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর রহমতে আরোগ্য লাভ করা সম্ভব। কোরআনের জীবন্ত অলৌকিকত্ব ও মুজিজার এক অনন্য নিদর্শন হলো এই রুকইয়াহ।

এ প্রসঙ্গে একটি বাস্তব ঘটনা উল্লেখ করা যায়। দেশের বাইরে বসবাসরত এক সুপ্রসিদ্ধ লেখক, যাঁর দীর্ঘদিনের লেখালেখি ও আদর্শিক অবস্থান থেকে স্পষ্ট যে তিনি বামপন্থী ভাবধারার অনুসারী, তাঁর মেয়ে অত্যন্ত জটিল এক সমস্যায় আক্রান্ত হন। একপর্যায়ে তিনি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তার মেয়ে কোনো শারীরিক বা চিকিৎসাবিজ্ঞান সংক্রান্ত সমস্যায় নয়, বরং জিন-জাদুর সমস্যায় আক্রান্ত ছিল। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান এটিকে স্বীকার না করায় চিকিৎসকেরা হাসপাতালেই তাঁদের চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

আরও পড়ুন

হামের টিকা নিয়ে কী বলেছিলেন? যে ব্যাখ্যা দিলেন শায়খ আহমাদুল্লাহ

একদিন প্রায় মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে পড়ে থাকা মেয়েটি হাসপাতালের অত্যন্ত সুরক্ষিত ওয়ার্ড থেকে হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। উন্নত প্রযুক্তির সিসিটিভি ক্যামেরা যাচাই করে এবং স্থানীয় পুলিশের তদন্তের মাধ্যমেও তাৎক্ষণিকভাবে তার সন্ধান মেলেনি। পরবর্তীতে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরের অন্য একটি শহরের হাসপাতাল থেকে মেয়েটিকে উদ্ধার করা হয়, যার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা পুলিশ বা চিকিৎসকদের কাছে ছিল না। এমতাবস্থায় তাঁকে নিয়মিত কোরআনের তিলাওয়াত ও রুকইয়াহ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। জাগতিক চিকিৎসার পাশাপাশি আল্লাহর কালামের মাধ্যমে রুকইয়াহ করার ফলে মেয়েটি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে এবং বর্তমানে সে পুনরায় পড়াশোনা শুরু করেছে।

কালো জাদু বা তাবিজ-কবজের ক্ষতি থেকে বাঁচতে সবচেয়ে উত্তম পন্থা হলো 'সেলফ রুকইয়াহ' বা নিজের রুকইয়াহ নিজে করা। অভিজ্ঞ রাকিদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট আয়াতসমূহের তালিকা সংগ্রহ করে ভুক্তভোগী নিজেই তা পাঠ করে ফুঁ দিতে পারেন; কারণ আরোগ্য বা কারামতি কোনো ব্যক্তির মাঝে থাকে না, তা থাকে স্বয়ং আল্লাহর কালামে। বর্তমান সমাজে অনেকে মনে করেন রুকইয়াহ কেবল রাকিদের মাধ্যমেই করাতে হবে। দীর্ঘ কিরাত বা আয়াত পাঠে অলসতা বা অক্ষমতার কারণে অভিজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য রাকিদের সাহায্য নেওয়া বৈধ হলেও বর্তমানে এ ক্ষেত্রে এক শ্রেণীর অসাধু ও অর্থলোভী মানুষের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। তাই যে কোনো বিভ্রান্তি এড়াতে নিজের আমল নিজে করাই সবচেয়ে নিরাপদ।

আমাদের পরিচিত এক উচ্চশিক্ষিত বুয়েট পড়ুয়া প্রকৌশলী দম্পতির ঘরেও এমন অলৌকিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত ডিস্টার্ব বা জিনের উপদ্রব দেখা দিয়েছিল। তার ঘরে রান্না করা খাবার বা ফ্রিজে রাখা ডিম দৃশ্যমান কোনো কারণ ছাড়া ঘরের মেঝেতে এসে পড়ার মতো ঘটনা ঘটত। পরবর্তীতে তিনি কোনো রাকির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়ে, প্রয়োজনীয় আয়াতসমূহ পাঠ করার নিয়ম জেনে নিজে নিজেই রুকইয়াহর আমল শুরু করেন এবং আল্লাহর রহমতে তার ঘরের সমস্যা কেটে যায়।

বর্তমান যুগে মানুষ সব সমস্যা শর্টকাট পদ্ধতিতে সমাধান করতে চায়। কিন্তু আল্লাহর কালামের মাধ্যমে আরোগ্য লাভের জন্য বান্দার পক্ষ থেকে আন্তরিক প্রচেষ্টা ও সাধনার প্রয়োজন। এটি কোনো কৃত্রিম বা যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয় যে ট্যাবলেট খাওয়ার মতোই সাথে সাথে ফলাফল পাওয়া যাবে। প্রাকৃতিক ও ধর্মীয় নিয়মে যে কোনো প্রতিকারের মধ্য দিয়ে যেতে একটু সময় লাগে। পক্ষান্তরে, শয়তান বা দাজ্জালের পদ্ধতি হলো তাৎক্ষণিক ও কৃত্রিম, যা আপাতদৃষ্টিতে কল্যাণকর মনে হলেও বাস্তবে ধ্বংসাত্মক। সুতরাং, কেউ কালো জাদু বা কুফরির দ্বারা আক্রান্ত হলে অধৈর্য না হয়ে শরঈ নিয়মে নিজের রুকইয়াহ নিজে করা অথবা বিশ্বস্ত কোনো দ্বীনদার ব্যক্তির পরামর্শ অনুযায়ী আল্লাহর কালামের মাধ্যমে প্রতিকার খোঁজা উচিত। মহান আল্লাহই একমাত্র আরোগ্যদানকারী।

সূত্র: শায়খ আহমাদুল্লাহর অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত বক্তব্যের ভিডিও থেকে লেখাটি তৈরি করা হয়েছে।

ওএফএফ