একসময় বাংলাদেশের বিনোদন জগতের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম ছিল সিনেমা। ঈদ, পূজা কিংবা বিশেষ ছুটির দিনগুলোতে সিনেমাহলে দর্শকদের দীর্ঘ সারি ছিল পরিচিত দৃশ্য। নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় সিনেমাহল ছিল মানুষের অন্যতম বিনোদনকেন্দ্র। কিন্তু গত দুই দশকে সেই বাস্তবতা দ্রুত বদলে গেছে। বর্তমানে দর্শকসংখ্যার দিক থেকে নাটক, বিশেষ করে ইউটিউবভিত্তিক নাটক, সিনেমাকে ছাড়িয়ে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সিনেমা ও গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তির বিস্তার, দর্শকের জীবনযাত্রার পরিবর্তন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের উত্থান এবং গল্প বলার ধরনে পরিবর্তন-এসব কারণ নাটকের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির বিভিন্ন সময়ের তথ্য অনুযায়ী, একসময় দেশে এক হাজারেরও বেশি সিনেমাহল ছিল। বর্তমানে সচল হলের সংখ্যা একশর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অনেক জেলা শহরেও স্থায়ীভাবে সিনেমা দেখার সুযোগ নেই। ফলে সিনেমার সঙ্গে সাধারণ দর্শকের সরাসরি সংযোগ কমে গেছে।

অন্যদিকে ইউটিউব নাটকের বাজার ক্রমাগত বিস্তৃত হয়েছে। দেশের জনপ্রিয় নাটকগুলো প্রকাশের কয়েক দিনের মধ্যেই লাখ লাখ ভিউ অর্জন করছে। অনেক নাটক ১ কোটি থেকে ৫ কোটির বেশি দর্শকও পেয়েছে। দেশের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরাও নিয়মিত এসব নাটক দেখছেন।

গণমাধ্যম গবেষকরা বলছেন, নাটকের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর সহজলভ্যতা। দর্শককে নির্দিষ্ট সময়ে কোনো হলে যেতে হচ্ছে না। একটি স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই যে কোনো সময়, যে কোনো স্থানে নাটক দেখা সম্ভব। বর্তমান ব্যস্ত জীবনে এ সুবিধা দর্শকদের নাটকের দিকে বেশি আকৃষ্ট করছে।

নির্মাতা ও নাট্যসংশ্লিষ্টদের মতে, নাটকের গল্পে সাধারণ মানুষের জীবনের প্রতিফলন বেশি দেখা যায়। মধ্যবিত্তের সংগ্রাম, পারিবারিক সম্পর্ক, প্রেম, বন্ধুত্ব, চাকরি, সামাজিক সংকট কিংবা সমসাময়িক নানা বিষয় নাটকের কাহিনিতে উঠে আসে। ফলে দর্শক সহজেই নিজেদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে গল্পকে মিলিয়ে নিতে পারেন।

নির্মাতা ও অভিনেতা সালাহউদ্দিন লাভলু একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ গল্পই নাটকের সবচেয়ে বড় শক্তি। দর্শক যখন নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি পর্দায় দেখতে পান, তখন সেই কনটেন্টের সঙ্গে তাদের আবেগগত সম্পর্ক তৈরি হয়।

অন্যদিকে সিনেমা নির্মাতারা মনে করেন, সিনেমা এখনো সবচেয়ে শক্তিশালী ভিজ্যুয়াল মাধ্যম হলেও নিয়মিত দর্শক ধরে রাখতে এ শিল্পকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে। এ বিষয়ে তরুণ নির্মাতা রায়হান রাফি মনে করেন, বর্তমান দর্শক আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তারা বিশ্বমানের কনটেন্ট দেখছেন। ফলে গল্প, নির্মাণশৈলী এবং উপস্থাপনায় নতুনত্ব না থাকলে দর্শক ধরে রাখা কঠিন।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের মূলধারার অনেক সিনেমা একই ধরনের গল্প ও ফর্মুলানির্ভর নির্মাণের কারণে দর্শকের আগ্রহ হারিয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু সিনেমা নতুন ধরনের গল্প এবং আন্তর্জাতিক মানের নির্মাণশৈলীর মাধ্যমে প্রশংসা পেয়েছে, তবুও সামগ্রিক শিল্প এখনো রূপান্তরের মধ্যদিয়ে যাচ্ছে।

নাটকের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির আরেকটি কারণ এর দৈর্ঘ্য। একটি নাটক সাধারণত ৩০ থেকে ৬০ মিনিটের মধ্যে শেষ হয়ে যায়। ব্যস্ত কর্মজীবনের মানুষ সহজেই অল্প সময়ে বিনোদন নিতে পারেন। অন্যদিকে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা দেখতে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় প্রয়োজন হয়। সময়ের এ বাস্তবতাও দর্শকের পছন্দে প্রভাব ফেলছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও নাটকের প্রসারে বড় ভূমিকা রাখছে। ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম কিংবা টিকটকে নাটকের ছোট ছোট অংশ, সংলাপ বা দৃশ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে নতুন দর্শকও নাটকের প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন। সিনেমার প্রচারণাও এখন ডিজিটাল মাধ্যমে হচ্ছে, তবে নাটক এ সুবিধা আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পেরেছে।

সিনেমার দর্শক কমে যাওয়ার আরও একটি বড় কারণ হচ্ছে, কনটেন্ট। নির্মাণে দুর্বলতা তো আছেই, সিনেমার গল্পের গভীরতা না থাকার কারণেও দর্শকরা হলবিমুখ হচ্ছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সিনেমার দর্শক কমে গেলেও সিনেমার গুরুত্ব কমে যায়নি। বরং বর্তমানে দর্শকসংখ্যার চেয়ে কনটেন্টের মান ও প্রভাব বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উন্নত প্রযুক্তি, শক্তিশালী চিত্রনাট্য, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ এবং আধুনিক বিপণন কৌশল প্রয়োগ করতে পারলে বাংলাদেশের সিনেমা শিল্প আবারও বড় পরিসরে ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

সাংস্কৃতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি নাটক বনাম সিনেমার লড়াই নয়; বরং দর্শকের অভ্যাস পরিবর্তনের গল্প। একসময় মানুষ বিনোদনের জন্য সিনেমাহলে যেতেন, এখন বিনোদন নিজেই মানুষের হাতে থাকা মোবাইল ফোনে পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে যে মাধ্যম দর্শকের জীবন, সময় এবং বাস্তবতার সবচেয়ে কাছাকাছি থাকতে পারছে, দর্শকরাও সেই মাধ্যমকেই বেছে নিচ্ছেন। সেই বিবেচনায় বর্তমানে নাটক এগিয়ে থাকলেও সিনেমার জন্য সম্ভাবনার দরজা এখনো খোলা। প্রয়োজন শুধু সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দর্শকের ভাষা, জীবন ও প্রত্যাশাকে নতুন করে বোঝা।