কমলনগরে নির্মাণ শ্রমিক নুরুল আলম নুরু হত্যা মামলায় আইনি বেড়াজালে পিষ্ট হয়ে চরম মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন এক গৃহবধূসহ নিরীহ দুই ইটভাটা শ্রমিক। কেবল মুঠোফোনের কল রেকর্ডের (সিডিআর) সূত্র ধরে সন্দেহের তালিকায় পড়ে ভিটেমাটি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন একই পরিবারের এ তিন সদস্য। যে কারণে নিজেদের সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে মামলা থেকে বেকসুর খালাস পেতে এবং মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে শত শত এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে মানববন্ধন করেছেন ভুক্তভোগীরা। শনিবার বেলা ১১টার দিকে উপজেলার চরকাদিরা ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ড এলাকার ছিদ্দিকিয়া দাখিল মাদ্রাসা সংলগ্ন সড়কে এ মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। এতে এলাকার কয়েকশ নারী-পুরুষ অংশ নিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। ভুক্তভোগীরা হলেন-চর কাদিরা ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের মৃত আহাম্মদ উল্লাহর ছেলে ইটভাটা শ্রমিক মো. জহির, তোরাবগঞ্জ ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের মৃত দুলালের ছেলে কামাল উদ্দিন এবং চর কাদিরা ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের জামালের স্ত্রী নুরনাহার বেগম পাখি। জামিনে মুক্ত মামলার প্রধান সন্দেহভাজন নুরুন্নাহার পাখি বেগম মানববন্ধনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, ‘বছরখানেক আগে একটা রং নম্বর থেকে নুরু আমার ফোনে কল দেন। এরপর কথা বলতে বলতে আমাদের মধ্যে একটা পবিত্র ভাই-বোনের সম্পর্ক তৈরি হয়। ১৯ জানুয়ারি নুরুর ফোন বন্ধ পেয়ে আমি নিজেই খোঁজ নেওয়ার জন্য কয়েকবার চেষ্টা করি। আমি যদি অপরাধী হতাম, তবে মোবাইল খোলা রেখে নিজের বাড়িতে থাকতাম না, আত্মগোপন করতাম।’ পাখি বেগম আরও জানান, তার স্বামী একজন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ইটভাটা শ্রমিক। সাত বছরের একটি কন্যাসন্তান নিয়ে সংসার চালাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে জামিনের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে তারা সম্পূর্ণ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। মামলা চালানোর মতো কোনো আর্থিক সামর্থ্য এখন তার নেই। ৮২ বছরের অন্ধ মা, স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে সংসার চালানো অপর আসামি দিনমজুর জহিরুল ইসলাম মানববন্ধনে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘আমি নুরুকে কোনো দিন দেখিনি, চিনিও না। পুলিশ বলছে, আমার ভাতিজি পাখির নম্বরের সঙ্গে আমার নম্বরে যোগাযোগ ছিল। পরিবারের লোক হিসাবে ভাতিজির সঙ্গে ফোনে কথা বলাটাই কি আমার অপরাধ? সাড়ে তিন মাস বিনা অপরাধে জেল খাটলাম। জামিন নিতে গিয়ে একমাত্র সম্বল ঘরের ভিটেটুকুও বিক্রি করে দিয়েছি।’ একইভাবে ঘরে পঙ্গু সন্তান, বিয়ের উপযুক্ত মেয়ে এবং স্ত্রীকে নিয়ে চরম বিপাকে পড়া মামলার ৩নং আসামি কামাল অশ্রুসিক্ত হয়ে বলেন, ‘জামিনের খরচ চালাতে গিয়ে ১০ শতাংশ বসতভিটা বিক্রি করে দিয়েছি। এখন দুচোখে অন্ধকার দেখছি। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে খালাস না পেলে আত্মহত্যা করা ছাড়া আমাদের আর কোনো পথ থাকবে না।’ মানববন্ধনে জহিরের অন্ধ মা নজুফা খাতুন তার ছেলেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ন্যায়বিচারের আকুতি জানান। মানববন্ধনে বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রযুক্তির অপব্যবহার বা স্রেফ কল তালিকার ওপর ভিত্তি করে দিনমজুর ও নিরীহ মানুষদের এভাবে হত্যা মামলায় জড়ানো কোনোভাবেই উচিত হয়নি। এছাড়া আসল অপরাধীরা যাতে আড়ালে পার পেয়ে না যায় এবং এ অসহায় পরিবারগুলো যেন আইনি হয়রানি থেকে চিরতরে মুক্তি পায়, সেজন্য মামলাটি গভীরভাবে ও নিরপেক্ষভাবে পুনঃতদন্তের জোর দাবি জানান তারা।

মামলার প্রাথমিক এজাহার ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা যায়, উপজেলার সাহেবের হাট ইউনিয়নের বাসিন্দা ও নির্মাণ শ্রমিক নুরুল আলম নুরু ১৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায় নিখোঁজ হন। এর তিন দিন পর ১৯ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মাতাব্বরহাট মেঘনা নদীর তীর সংরক্ষণ বাঁধের সিসি ব্লকের ওপর থেকে শরীরে আঘাতের চিহ্নসহ নুরুর লাশ উদ্ধার করে কমলনগর থানা পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ নুরুর ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ট্র্যাক করে দেখতে পায়, নুরুন্নাহার পাখি নামের এক নারীর নম্বরে নুরুর একাধিকবার যোগাযোগ হয়েছিল। এ যোগাযোগের সূত্র ধরেই ১৯ জানুয়ারি রাতে পাখি বেগম, তার চাচা জহিরুল ইসলাম এবং ফুপা কামাল হোসেনকে আটক করা হয়। পরে নিহত নুরুর পরিবারের দায়ের করা হত্যা মামলায় এ তিনজনকে সন্দেহভাজন আসামি দেখিয়ে কারাগারে পাঠায় পুলিশ। দীর্ঘ ৩ মাস ১৬ দিন কারাভোগের পর সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পান তারা। আদালতের নির্দেশে বর্তমানে মামলাটি জেলা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত করছে। তদন্তকারী সিআইডি লক্ষ্মীপুর জেলা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্ব ও সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। সিআইডি প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করলেও কেবল ‘কল লিস্ট’ বা ‘সিডিআর’ দেখে কাউকে চূড়ান্ত অপরাধী বিবেচনা করে না। আমরা ঘটনার নেপথ্যের প্রকৃত কারণ ও পারিপার্শ্বিক সব তথ্য-প্রমাণ খতিয়ে দেখছি।’