মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে ঘুমিয়েছে সূর্যের নিয়মে। সহজ কথায়, সূর্য ডুবলে অন্ধকার। অন্ধকার নেমে এলেই মস্তিষ্কের সংকেত—এবার ঘুমাতে হবে। আবার ভোরে আলো ফুটলে মস্তিষ্কই জানান দেয়, এবার জেগে ওঠো। এই ছন্দটার নাম সার্কাডিয়ান রিদম, অর্থাৎ শরীরের ভেতরের ঘড়ি। কয়েক হাজার বছরের বিবর্তনে এটা গড়ে উঠেছে আলো-অন্ধকারের নিয়মে।

১৮৭৯ সালে টমাস আলভা এডিসন বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কার করলেন। মানে রাত আর অন্ধকার থাকল না। কিন্তু আসল বিপর্যয় এল আরও পরে—যখন আলোটা ঘর ঢুকে পড়ল বিছানায় কাঁথা বা কম্বলের নিচে, শিশুর চোখের ঠিক সামনে। সূর্যের আলো দূরের। ঘরের বাতি ছাদে। কিন্তু মোবাইল ফোনের নীল আলো চোখ থেকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে। কয়েক হাজার বছরে আমাদের দেহঘড়ি যেভাবে তৈরি হয়েছে, তা এত কাছের, এত উজ্জ্বল আলোর জন্য কখনো প্রস্তুত ছিল না। সেই ঘড়ি এখন ভেঙে পড়ছে প্রতি ঘরে, প্রতি রাতে। প্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি ঘুম হারাচ্ছে টডলার থেকে সব বয়সী শিশুরাও। রাতে বিছানায় যাওয়ার পর যখন শিশুরা অন্ধকার ঘরে স্মার্টফোনে শর্টস বা ভিডিও দেখে, তখন তার মস্তিষ্ক স্মার্টফোনের আলোয় বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। মস্তিষ্ক সময়টাকে দিন হিসেবে বিবেচনা করে। তাই মস্তিষ্ক ঘুমের রাসায়নিক মেলাটোনিন নিঃসরণ বন্ধ রাখে। ফলে ঘুম দেরিতে আসে। ওদিকে আবার সকালে স্কুলে যাওয়ার জন্য ভোরে ওঠার চাপ রয়েছে। অথচ ৮-৯ বছরের একটি শিশুর দরকার অন্তত ৯ ঘণ্টা ঘুম। সেখানে ৫-৬ ঘণ্টা ঘুমিয়ে সকালে স্কুলে গেলে খুব স্বাভাবিকভাবে শিশুটি ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারে না। শিক্ষকও ভাবেন, শিশুটি অমনোযোগী। অভিভাবক ভাবেন, সন্তান অলস। অথচ অগোচরে রয়ে যায় কাঁথার নিচে জ্বলতে থাকা সেই স্মার্টফোনের নীল আলোটা। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ঘুমহীনতা নীরবে শরীরের ক্ষতি করে। না ঝরে রক্ত, না চোখের জল। শুধু ধীরে ধীরে শরীর ক্ষয়ে যায়।

ঘুমের জন্য রাসায়নিক মেলাটোনিন নিঃসরণ খুব জরুরি। সন্ধ্যা নামলে মস্তিষ্ক মেলাটোনিন ছাড়তে শুরু করে। এটাই শরীরকে বলে, এবার ঘুমানোর সময়। কিন্তু স্ক্রিনের নীল আলো এই ব্যবস্থাকে এলোমেলো করে দেয়। নীল আলো দিনের আলোর মতো। চোখে পড়লে মস্তিষ্ক ভাবে, এখনো দিন। তাই মেলাটোনিন ছাড়া বন্ধ করে দেয়। ফল—শরীর ক্লান্ত, কিন্তু ঘুম আসে না। গবেষণা বলছে, শোয়ার আগে স্ক্রিন ব্যবহার শিশু-কিশোরদের ঘুম দেরিতে আসা, কম ঘুম আর খারাপ মানের ঘুমের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।

শুধু স্মার্টফোনের আলোই নয়। ইউটিউব কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার কনটেন্টও ঘুম কম হওয়ার জন্য দায়ী। উত্তেজক ভিডিও, গেম বা মন খারাপ করা কিছু দেখলে মস্তিষ্ক উদ্দীপিত থাকে। সেই অবস্থা শান্ত না হলে ঘুম আসে না। তাই শোয়ার আগের এক ঘণ্টা স্ক্রিন দেখা মানে মস্তিষ্ককে বিগড়ে দেওয়া। এ জন্যই বলা হয়, ঘুমের আগের অন্তত দুই ঘণ্টা কোনো ধরনের স্ক্রিন দেখা ছোট বা বড় কারও জন্যই স্বাস্থ্যকর নয়।

ঘুম শুধু বিশ্রাম নয়, ঘুমের সময় মস্তিষ্ক নিজের ক্ষত সারিয়ে তোলে ও মস্তিষ্কে জমা বর্জ্য অপসারণ করে নেয়। মস্তিষ্ক দিনে যা শিখেছে, ঘুমের সময় সেটা দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে স্থানান্তরিত হয়। ঘুম কম মানে শেখাও কম। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ

হয় না। ঘুম কম হলে শিশুর মেজাজ খিটখিটে থাকে, রাগ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে বেশি, ধৈর্য কমে যায়। শিশুদের গ্রোথ হরমোন সবচেয়ে বেশি নিঃসৃত হয় গভীর ঘুমে।

আমেরিকান একাডেমি অব স্লিপ মেডিসিনের মতে, বয়স অনুযায়ী শিশুর ঘুমের চাহিদা বদলায়। ৩-৫ বছর বয়সী শিশুদের দৈনিক ১০-১৩ ঘণ্টা, ৬-১২ বছর শিশুদের ৯-১২ ঘণ্টা, ১৩-১৮ বছর বয়সীদের ৮-১০ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশের চিত্র অনুযায়ী, স্কুল, কোচিং, হোমওয়ার্ক আর স্ক্রিন—সব মিলিয়ে শিশুদের ঘুমটাই সবচেয়ে আগে বলি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার শিশুর ঘুমের স্বাভাবিক চক্র নষ্ট করছে। তার প্রভাব পড়ছে তার শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশে। ঘুমের ক্ষতিটা চোখে পড়ে না সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু বছর ঘুরতে ঘুরতে সেটাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় ক্ষতি। কোনো এক রাতে ঘটে না বলে সে ক্ষতি কেউ হঠাৎ ধরতে পারে না।

শিশুদের ভালো ঘুমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো ঘুমের নির্দিষ্ট রুটিন তৈরি করা, যা প্রতিদিন একই সময়ে চলতে থাকবে। ঘুমানোর আগে কুসুম গরম পানিতে গোসল বা শরীর মুছে দিলে পেশি শিথিল হয়। শিশুর হাতে স্মার্টফোন দেওয়ার পরিবর্তে শিশুকে হালকা মৃদু কণ্ঠে ঘুমপাড়ানি গান শোনানো বা শান্ত কোনো গল্পের বই পড়ে শোনানো যেতে পারে। ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে ঘরের উজ্জ্বল আলো নিভিয়ে হালকা বা ডিম লাইট জ্বালিয়ে দিন। ঘরের তাপমাত্রা যেন খুব গরম বা ঠান্ডা না হয় এবং চারপাশ শান্ত থাকে, তা নিশ্চিত করুন।

লেখক: চিকিৎসক, কাউন্সেলর ও সাইকোথেরাপি প্র‍্যাকটিশনার, ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার বিডি