কানাডায় ওয়ার্ক পারমিট (কাজের অনুমতিপত্র) ও স্থায়ী বসবাসের প্রলোভন দেখিয়ে এক বাংলাদেশি নারীকে অর্থনৈতিক শোষণ এবং শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগে দুই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডা প্রবাসীকে ভিন্ন ভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির আদালত। দণ্ডপ্রাপ্ত দুই ব্যক্তি হলেন মোহাম্মদ (এম ডি) মাসুম (৪৫) ও সোহেল হায়দার (৫৬)।

গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) কানাডার স্যাসকাচোয়ান প্রদেশের স্যাসকাটুন প্রাদেশিক আদালতের বিচারক মিগুয়েল মার্টিনেজ এ মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন।

রায়ে মানব পাচার এবং তিনটি পৃথক যৌন নির্যাতনের (ধর্ষণ) অভিযোগে প্রধান অভিযুক্ত মোহাম্মদ মাসুমকে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অপর অভিযুক্ত সোহেল হায়দারকে মানব পাচারের অপরাধে কানাডার আইনের সর্বনিম্ন ৪ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

কারাদণ্ডের পাশাপাশি ভুক্তভোগী নারীর বকেয়া মজুরি ও ক্ষতিপূরণ (রেস্টিটিউশন) হিসেবে সোহেল হায়দারকে ৫ হাজার ৮৮৫.১৬ কানাডিয়ান ডলার এবং মোহাম্মদ মাসুমকে ১২ হাজার ২৬৮ কানাডিয়ান ডলার প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

কানাডায় ২০৯ বাংলাদেশির ভিসা জালিয়াতি: ৫ জনের নামে মামলা

যেভাবে নারীকে শোষণ করা হয়

ঘটনা ২০২২ সালের ১ আগস্ট থেকে ২০২৩ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে। বাংলাদেশে প্রায় ১৮ বছর সরকারি চাকরিতে কর্মরত থাকা ওই নারীকে (যার নাম প্রকাশ করা হয়নি) কানাডায় রেস্তোরাঁয় চাকরি এবং অস্থায়ী কর্মসংস্থান প্রক্রিয়ার ( টিএফডব্লিউ) মাধ্যমে স্থায়ী বসবাসের আশ্বাস দেওয়া হয়।

কানাডায় আসার পর প্রথমে তাঁকে স্যাসকাচোয়ানের গিল লেক এলাকায় সোহেল হায়দারের পরিচালিত একটি রেস্তোরাঁয় এবং পরবর্তী সময় টিসডেল এলাকায় মোহাম্মদ মাসুমের রেস্তোরাঁয় কাজে বাধ্য করা হয়।

অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কাছে ওই নারীর বৈধ ওয়ার্ক পারমিট ছিল না। পারমিটের কাগজ প্রক্রিয়াধীন—এমন তথ্য দিয়ে তাঁকে সপ্তাহে ৬ দিন দীর্ঘ সময় খাটানো হতো এবং ঠিকমতো মজুরি দেওয়া হতো না। এই সুযোগে মোহাম্মদ মাসুম ওই নারীর বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে নেন এবং শারীরিক বলপ্রয়োগের মাধ্যমে একাধিকবার যৌন নির্যাতন চালান, যাকে বিচারক আদালতের রায়ে স্পষ্টভাবে ধর্ষণ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

পরবর্তী সময় এলরোস (Elrose) শহরের একটি রেস্তোরাঁর নামে ভিন্ন একটি ওয়ার্ক পারমিট হলে সেখানে পৌঁছানোর পর ভুক্তভোগীর করুণ অবস্থা দেখে স্থানীয় কিছু সচেতন কানাডিয়ান নাগরিক সহযোগিতার হাত বাড়ান। তাঁদের সহায়তায় ভুক্তভোগী নারী ওই শোষণের জাল থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন এবং আইনি আশ্রয় নেন।

‘তারা আমার জীবন ধ্বংস করে দিয়েছে’

আদালতে দেওয়া ভিকটিম ইম্প্যাক্ট স্টেটমেন্টে (ক্ষতিগ্রস্তের জবানবন্দি) ভুক্তভোগী নারী নিজের করুণ অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘আমি তাদের ভুলতে পারি না। তারা আমার স্বপ্ন থামিয়ে দিয়েছে। তারা আমার জীবন, আমার সম্মান, আমার ভবিষ্যৎ, পরিবার ও ক্যারিয়ার—সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে।’ তিনি আরও জানান, দেশে তাঁর বিষয়ে নানা বিভ্রান্তিকর কানাঘুষা ছড়ানোর কারণে সমাজে তাঁর পরিবারের সম্মান ক্ষুণ্ন হয়েছে। একসময় স্বাবলম্বী ও আত্মনির্ভরশীল থাকা এই নারী এখন চরম মানসিক আঘাত (ট্রমা) ও নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন।

আইনগত গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে কানাডিয়ান আদালতের নির্দেশে (পাবলিকেশন ব্যান) ভুক্তভোগী নারীর নাম ও পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

আদালতের পর্যবেক্ষণ ও রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য

শুনানিকালে ক্রাউন প্রসিকিউটর লেসলি ডানিং আদালতে যুক্তি দেন, অভিযুক্ত দুজনই ( সোহেল ও মাহফুজ) ভুক্তভোগী নারীর ওপর প্রবাসজীবনের চরম সুযোগ নিয়েছিলেন এবং তাঁর জীবনের প্রায় প্রতিটি দিক নিয়ন্ত্রণ করে বিশ্বাসের চরম অবমাননা করেছেন। চূড়ান্ত রায়ে বিচারক মিগুয়েল মার্টিনেজ উল্লেখ করেন, নবাগত ও অস্থায়ী বিদেশি কর্মীদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে এ ধরনের শোষণ ও অপরাধ কঠোর হস্তে দমন করা প্রয়োজন।

কানাডায় বাংলাদেশ কমিউনিটির সচেতন প্রবাসীরা এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলছেন, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও প্রলোভনে পড়ে ভুয়া ভিসা বা অনিয়মতান্ত্রিক উপায়ে কানাডায় আসার ক্ষেত্রে সবাইকে আরও সতর্ক হওয়া উচিত।