চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করে শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ নিতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিল্প, বস্ত্র ও পাট এবং বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

তিনি বলেন, গ্যাসের সংকট বর্তমানে বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান অন্তরায়।

শনিবার (২৭ জুন) ‘ইন্ডাস্ট্রি প্লেসমেন্ট, রিক্রুটমেন্ট অ্যান্ড ট্যালেন্ট ডেভেলপমেন্ট' শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে মন্ত্রী এ কথা বলেন। পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের (এইউডব্লিউ) এইচএসবিসি-এইউডব্লিউ স্কুল অব অ্যাপারেলের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠানটি হয়।

তৈরি পোশাক শিল্পে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, নারী নেতৃত্ব বিকাশ এবং শিল্প ও একাডেমিয়ার মধ্যকার সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যেই এ আয়োজন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। অতিথি ছিলেন এইউডব্লিউর উপাচার্য এবং বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ড. রুবানা হক।

শিল্পমন্ত্রী জানান, সরকার এরই মধ্যে এলএনজির মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহ যুক্ত করেছে। এর সঙ্গে আরও ৫৫০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিদ্যমান শিল্পকারখানাগুলোতে গ্যাসের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে সরকার আরও বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে কাজ করছে এবং এ লক্ষ্যে একটি ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে।

খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘আমরা যদি এ বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে এবং তা সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে আমি নিশ্চিত আগামী এক বছরের মধ্যেই দেশের শিল্প খাতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাবে।’

আরও পড়ুন

গ্যাস-সংকটে সার কারখানা চালু করা হচ্ছে না: সংসদে শিল্পমন্ত্রী

তার মতে, বর্তমানে দেশের বিদ্যমান শিল্প উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হলে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধিও কয়েক শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত বাড়তে পারে।

গ্যাস সংকটের প্রভাব তুলে ধরে তিনি বলেন, বিপুল বিনিয়োগ করার পরও অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর উৎপাদনে যেতে পারছে না।

‘আমি এমন একটি শিল্পগোষ্ঠীর কথা জানি, যারা প্রায় ১৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু গ্যাস না থাকায় তাদের কারখানা চার বছর ধরে অলস পড়ে আছে। আবার ১৮ লাখ টন উৎপাদন সক্ষমতার একটি বৃহৎ স্টিল মিলও কয়েক বছর ধরে গ্যাসের অভাবে উৎপাদন শুরু করতে পারেনি,’ যোগ করেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

শিল্পমন্ত্রী জানান, জ্বালানি সংকট দ্রুত সমাধানের পথ খুঁজে বের করাই সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে দেশের শিল্পকারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারবে, যা শিল্পোন্নয়ন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং রপ্তানিমুখী শিল্পখাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতেই সরকার এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে বলে জানান তিনি।

দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য অত্যন্ত দক্ষ নারী পেশাদারদের একটি ধারা তৈরি করার লক্ষ্যেই এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে ‘এইচএসবিসি-এইউডব্লিউ স্কুল অব অ্যাপারেল’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপের সুযোগ, গ্র্যাজুয়েটদের নিয়োগ ও দেশের তৈরি পোশাক খাতের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা করা হয়।

আলোচনায় শিল্প-একাডেমিয়া মেলবন্ধন, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে বিশ্ববিদ্যালয় এবং পোশাক শিল্পের একসঙ্গে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয় ।

শিল্পমন্ত্রী পোশাক শিল্পে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং নারীর নেতৃত্ব বিকাশে বিজিএমইএ এবং এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের যৌথ উদ্যোগকে স্বাগত জানান।

অনুষ্ঠানে এইউডব্লিউর উপাচার্য ড. রুবানা হক পোশাক শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ এবং নেতৃত্ব বিকাশের ওপর তার গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য তুলে ধরেন। তিনি পোশাক খাতের নারী কর্মীদের উচ্চশিক্ষার জন্য এইউডব্লিউর ‘মাস্টার অব সায়েন্স ইন অ্যাপারেল অ্যান্ড রিটেল ম্যানেজমেন্ট’ প্রোগ্রামে স্পনসর করার জন্য বিজিএমইএয়ের সদস্য কারখানাগুলোর প্রতি আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, এই অংশীদারত্ব পোশাক খাতের আগামী প্রজন্মের নেতৃত্ব তৈরিতে এই শিল্পের প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করবে। এই যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে পোশাক খাতের জন্য সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট, সাসটেইনেবিলিটি এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দক্ষ পেশাদার নারী কর্মকর্তাদের একটি শক্তিশালী পাইপলাইন তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সভাপতির বক্তব্যে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘এই উদ্যোগটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বৈশ্বিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে বিজিএমইএয়ের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতিরই একটি অংশ। আমরা এইউডব্লিউর এই দূরদর্শী প্রস্তাব এবং স্পনসরশিপ মডেলটিকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করছি। পোশাক শিল্পে আগামী প্রজন্মের নেতৃত্ব গড়ে তুলতে বিজিএমইএ তার সদস্য কারখানাগুলোকে এই সুনির্দিষ্ট স্পনসরশিপ উদ্যোগে অংশ নিতে উৎসাহিত করবে।’

আইএইচও/একিউএফ/এমএস