চট্টগ্রামে টানা চার দিনের ভারি বর্ষণ ও জলাবদ্ধতার কারণে খেটে খাওয়া মানুষ বিপাকে পড়েছেন। বিশেষ করে ফুটপাতের হকার, নির্মাণ কাজের ঠিকা শ্রমিক, গাড়িচালক, রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র আয়ের দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষের কষ্টের শেষ নেই। পরিবার-পরিজন নিয়ে অর্থকষ্টে দিনাতিপাত করছেন তারা। বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা স্থায়ী হলে তাদের কষ্ট আরও বাড়বে। বাসাবাড়িতে পানি ঢোকার কারণে বস্তি এলাকার মানুষজনও খাবারের কষ্টে পড়েছেন। নগরীর বিভিন্ন স্থানে খোঁজ নিয়ে এবং ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে এই চিত্র পাওয়া গেছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পে হাজার-হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এরপরও সাধারণ মানুষ জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাচ্ছে না। টানা চার দিনের বর্ষণ ও দুদিনের জলাবদ্ধতায় গরিব ও নিম্নআয়ের মানুষ বেশি কষ্টে পড়েছে। তাদের সাহায্যে জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন তথা সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের এগিয়ে আসা উচিত।’
জানা যায়, গত চার দিনে চট্টগ্রামে ৮০৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। নগরীর নিম্নাঞ্চল ছাড়াও অধিকাংশ এলাকায় বৃষ্টির পানি থইথই করছে। পানি ঢুকে পড়েছে বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। এতে বাসাবাড়ির আসবাবপত্র ও দোকানের পণ্য নষ্ট হয়ে গেছে। চকবাজার এলাকার বাসিন্দা গৃহবধূ সুমাইয়া আক্তার বলেন, ‘ঘরের নিচতলায় কোমর সমান পানি উঠেছে। বৃষ্টির পানি আর ড্রেনের পানি একাকার হয়ে গেছে।’
নগরীর প্রবর্তক মোড়ে রিকশাচালক মো. আরমান বলেন, ‘পানির কারণে রাস্তার কোথায় গর্ত আছে জানি না। এর পরও ঝুঁকি নিয়ে রিকশা নিয়ে বের হয়েছি।’ পরিবহণ ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমার পাঁচটি ট্রাক দুদিন ধরে বসা অবস্থায় রয়েছে। কোনো ভাড়া নেই।’
জলাবদ্ধতার কারণে দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে ঢুকতে পারছে না পণ্যবাহী ট্রাক। তাই লোড-আনলোড বন্ধ। এখানকার কুলি-মজুর যারা লোড-আনলোডের কাজ করেন তারাও অর্থকষ্টে পড়ে গেছেন বলে জানান এই এলাকার ব্যবসায়ীরা।
বৃহত্তর বাকলিয়া এলাকায় নিম্নআয়ের এবং খেটে খাওয়া মানুষের সংখ্যা বেশি। বাকলিয়ার তক্তার পুল এলাকার বাসিন্দা গৃহকর্মী জ্যোৎøা বেগম বলেন, তার স্বামী রিকশা চালান। তিনি মানুষের বাসায় কাজ করেন। তাদের কলোনির বেশির ভাগ বাসায় পানি ঢুকেছে। তারা কেউ কাজে যেতে পারছে না। আবার বসে বসে যে খাবে সেই সঞ্চয়ও হাতে নেই। এই অবস্থায় বৃষ্টি না থামলে, জলাবদ্ধতা দীর্ঘায়িত হলে কষ্টের শেষ থাকবে না।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে কোথাও কোথাও শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা হলেও বাকলিয়া এলাকার কেউ করপোরেশন কিংবা সরকারের তরফ থেকে সে ধরনের কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পায়নি।
বন্দরের ইয়ার্ডে কনটেইনারে পানি, পণ্য নষ্টের শঙ্কা : একদিকে ভারি বর্ষণ, অন্যদিকে কর্ণফুলীতে ভরা জোয়ার। এই দুই কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ডে বুধবার পানি জমে যায়। ইয়ার্ডে সারি সারি করে রাখা নিচের স্তরের কনটেইনারে পানি ঢুকে আমদানি পণ্য নষ্ট হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়। পানির কারণে দুদিন ধরে এখানে কাস্টমস কর্তৃপক্ষও স্বাভাবিক কাজ করতে পারছে না। অর্থাৎ আমদানি পণ্যের পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা শুল্কায়ন কার্যক্রম চালাতে পারছে না। অন্যদিকে বন্দরের বহির্নোঙরে থাকা ৫০টি মাদার ভেসেল থেকেও পণ্য খালাস বা লাইটারিং বন্ধ রয়েছে। সাগর উত্তাল থাকা এবং বৃষ্টির কারণে লাইটার জাহাজ বহির্নোঙরে যেতে পারছে না। তাই বহির্নোঙরে পণ্য খালাস বন্ধ রাখা হয়েছে। চট্টগ্রাম চেম্বার ও ব্যবসায়ীদের সূত্র জানিয়েছে, বহির্নোঙরে প্রতিদিন ৫ লাখ টন পণ্য খালাস হয়। তিন দিন ধরে পণ্য খালাস বন্ধ থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হবেন আমদানিকারকরা। মুখোমুখি হতে হবে জরিমানার।







