ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে হামলার পর দেশটির সামরিক বাহিনী উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনায় ব্যাপক পালটা হামলা চালিয়েছে। গত মঙ্গল ও বুধবার কৌশলী এসব হামলায় বাহরাইন, কাতার, কুয়েত ও জর্ডানে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এতে দিশেহারা হয়ে পড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধ বন্ধে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়ায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার থেকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র হামলা স্থগিত রেখেছে।

শুক্রবার আলজাজিরা জানায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন-ইরান বারবার আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করায় তিনি সম্মত হয়েছেন। এর আগে ন্যাটো সম্মেলনে এসে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে অন্তর্বর্তী চুক্তি শেষ বলে ঘোষণা দেন। মার্কিন এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানায়, ওয়াশিংটন এখনো ইরানের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নিতে চায়।

৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির মধ্যে হরমুজে জাহাজ চলাচল নিয়ে দুই দফা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পালটাপালটি হামলা হলো। সর্বশেষ দুদিনের হামলা ছিল বেশ ভয়াবহ। এ সময়ে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল অনেকটাই কমে আসে। বিশ্ববাজারে আবারও বাড়তে থাকে জ্বালানি তেলের দাম।

মার্কিন হামলার জবাবে ইরানের সামরিক বাহিনী বাহরাইন, কুয়েত, কাতার ও জর্ডানে বেশি হামলা চালিয়েছে। এ চার দেশের ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানে হামলা চালিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। এক্ষেত্রে তারা বিশেষ একটি কৌশল নিয়েছে। তেহরান নিখুঁতভাবে উপসাগরীয় দেশে মার্কিন স্থাপনায় থাকা প্রতিরক্ষা সরঞ্জামকে লক্ষ্যবস্তু করছে। এর মধ্যে রয়েছে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও। কাজটি করছে স্বল্পমূল্যের ড্রোন ও ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে।

নতুন মার্কিন হামলার পর গত ৮ জুলাই ইরান ৮৫টি মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এ হামলা ঠেকাতে আরব দেশগুলোর প্রতিরক্ষা বাহিনী আকাশে বিপুলসংখ্যক মূল্যবান ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র খরচ করতে বাধ্য হয়। এতে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেকটা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।

এর ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই যুদ্ধের মাঠে নতুন কৌশলে নামে ইরানের সেনাবাহিনী। হামলা চালানো হয় সুনির্দিষ্ট ও সুপরিকল্পিত ছন্দে। প্রথম দিনে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে যখন দুর্বল করে দেওয়া হয়েছিল, দ্বিতীয় দিনে ড্রোনের ঝাঁক পাঠিয়ে ইরান সেই ব্যবস্থার সেন্সর ও গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক কেন্দ্রগুলোকে অন্ধ করে দেয়ার কাজ করে। কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনে একযোগে চালানো এ হামলায় প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাটারি, প্রাথমিক সতর্কবার্তা প্রদানকারী অন্টেনাসহ জ্বালানি মজুত কেন্দ্রগুলোকে নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

কৌশলী ইরানের আক্রমণের ধরন আমলে নিচ্ছেন সামরিক বিশ্লেষকরা। কারণ, তেহরান কোনো বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালাচ্ছে না। তারা উপসাগরীয় ওই দেশগুলোতে থাকা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটি কার্যকরী স্থরকে চিহ্নিত করে একে একে ধ্বংস করছে। আর এতে অল্প ব্যয়ের ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে।

ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে উচ্চ উচ্চতার প্রতিরক্ষা স্তরকে ব্যস্ত রেখে ড্রোনের মাধ্যমে নিচু উচ্চতায় আঘাত হানা-এ দ্বিমুখী কৌশলের কাছে হার মানছে মার্কিন প্রতিরক্ষা। কাতারের আল উদাইদ বিমান ঘাঁটির গুরুত্বপূর্ণ রাডার কেন্দ্রটি যখন ড্রোনের আঘাতে ধ্বংস হয়, তখন পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের আকাশ প্রতিরক্ষার মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ে।

ইরানের এ অভিযানের পেছনে দেশটির সামরিক নেতৃত্ব যে কঠোর প্রস্তুতি নিয়েছিল তা এখন স্পষ্ট। গত জানুয়ারিতে ইরানের মেজর জেনারেল আমির হাতামির উপস্থিতিতে ইরানের নিয়মিত বাহিনী এক হাজার ড্রোন অন্তর্ভুক্ত করে। শাহেদ ১০১ ও হাদিদ ১১০-এর মতো উন্নত প্রযুক্তির ড্রোন রাডারের আওয়াজ পাওয়ার আগেই গন্তব্যে আঘাত হানছে। ফলে প্রতিরক্ষা বাহিনী এগুলো ঠেকাতে পারছে না।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও এ লড়াইয়ে বিজয় দেখছে ইরান। শতকোটি ডলারের ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র খরচ করে নামমাত্র মূল্যের ড্রোন ধ্বংস করা হচ্ছে।

ইরানের সেনাবাহিনী রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানায়, তারা কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কাতারের একটি আগাম সতর্কীকরণ কেন্দ্র এবং বাহরাইনে মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি জ্বালানি ডিপোতে হামলা চালিয়েছে। হামলার কথা নিশ্চিত করেছে কুয়েত ও জর্ডান। রেভল্যুশনারি গার্ডস জানায়, তারা জর্ডানের আজরাক সামরিক ঘাঁটিতে ১০টি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আঘাত হেনেছে।

উত্তেজনা কমাতে চলছে কূটনীতিও

সিএনএন জানায়, মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান চাচ্ছে দুপক্ষ আবারও টেবিলে ফিরে আসুক। তুরস্ক ও ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে পৃথক ফোনালাপে উত্তেজনা কমাতে কথা বলেছেন। পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের সঙ্গে ফোনালাপে আরাঘচি মার্কিন হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। সূত্র জানায়, নতুন উত্তেজনা শুরুর পর কাতারের প্রতিনিধি দল ইরানে গেছে। তবে হামলা আপতত স্থগিত হলেও কোনো পক্ষ ছাড় দিতে সম্মত হয়নি।

নতুন হামলায় হরমুজে বিলম্ব

আইআরজিসি বলছে, হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ও হস্তক্ষেপ জলপথটি পুনরায় সচল করার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে। তারা বলছে, গত দুই সপ্তাহে ইরানের তত্ত্বাবধানে এ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা যুদ্ধের আগের অবস্থার প্রায় ৫০ শতাংশে ফিরে এসেছিল। হামলার কারণে এখন বিলম্ব হবে। তারা জানায়, শুধু তেহরান-নির্ধারিত পথেই জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।