বিগত বছরের অধিকাংশ সময়জুড়ে ইরান যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে ইসরায়েল বেশ আত্মবিশ্বাসী ও বিজয়ের সুরে কথা বলেছে। কিন্তু সেই অভিযান পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই জেরুজালেম তাদের নতুন হুমকি খোঁজা শুরু করেছে। তবে এই নতুন হুমকিকে সংজ্ঞায়িত করা বেশ কঠিন। ইরানের মতো এর নির্দিষ্ট কোনো রাজধানী বা কেন্দ্র নেই। বরং এই বলয়ে এমন কিছু রাষ্ট্র রয়েছে, যাদের সামরিক বাহিনী বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ও ঐতিহ্যবাহী।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ইহুদি সংগঠনগুলোর প্রেসিডেন্টদের সম্মেলনে ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট বলেন, ‘তুরস্কই হলো নতুন ইরান।’ আগামী নির্বাচনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে বেনেট প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

ইসরায়েলের পরবর্তী টার্গেট কি পাকিস্তান

সেদিন আরও এক ধাপ এগিয়ে বেনেট অভিযোগ করেন, আঙ্কারা (তুরস্ক) মূলত ‘সৌদি আরবকে আমাদের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলার চেষ্টা করছে এবং পারমাণবিক শক্তিসমৃদ্ধ পাকিস্তানের সঙ্গে মিলে একটি বৈরী সুন্নি অক্ষ গড়ে তুলছে।’

এর মাত্র পাঁচ দিন পর নেতানিয়াহুও প্রায় একই সুর ধরেন। তিনি ভারত, গ্রিস ও সাইপ্রাসকে নিয়ে একটি ‘ষড়্‌ভুজ জোট’ গঠনের ঘোষণা দেন। নেতানিয়াহুর ভাষ্যমতে, ইসরায়েল ইতিমধ্যে যে শিয়া অক্ষকে ভেঙে দিয়েছে, তার বিপরীতে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা এই সুন্নি ব্লকের মোকাবিলা করতেই এই জোট।

সহজ কথায়, ইসরায়েলের এই দুই শীর্ষ নেতা মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে একই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। আর তা হলো, দেশটির পরবর্তী কৌশলগত লড়াই ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানের মতো হবে না। ইরানকে বিচ্ছিন্ন করতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র বছরের পর বছর ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু এবারের প্রতিপক্ষ অনেক বেশি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এক শক্তি এবং প্রচলিত সামরিক ক্ষমতার বিচারে তারা অনেক বেশি সুসজ্জিত।

তুরস্ককে এই সম্ভাব্য অক্ষের সবচেয়ে শক্তিশালী সদস্য মনে করা হচ্ছে। খাতা-কলমে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী রয়েছে তাদেরই। প্রায় ৩ লাখ ৫৫ হাজার সক্রিয় সেনাসদস্যের এই বাহিনীর পেছনে বার্ষিক প্রতিরক্ষা বাজেট ২৭ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

দেশটির নিজস্ব অস্ত্রশিল্প তুরস্ককে বিশ্বের শীর্ষ মানববিহীন আকাশযান বা ইউএভি রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করেছে। তাদের তৈরি সর্বাধুনিক জেটচালিত যুদ্ধ ড্রোন ‘কিজিল এলমা’ ইতিমধ্যে পরীক্ষার সময় রাডার-নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আকাশে থাকা লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে সফল হয়েছে। চলতি বছরই তুর্কি সামরিক বাহিনীর কাছে হস্তান্তরের জন্য এটি এখন গণ-উত্পাদনে যাচ্ছে। অন্যদিকে, আঙ্কারার ‘ব্লু হোমল্যান্ড’ মতবাদের অধীনে দেশটির নৌবাহিনী এখন পূর্ব ভূমধ্যসাগরের বিশাল এলাকাজুড়ে সক্রিয় রয়েছে, যা ইসরায়েলের সমুদ্রবর্তী গ্যাসক্ষেত্রগুলোর খুব বেশি দূরে নয়।

ইসরায়েল ও তুরস্ক কখন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে?

এরপরে রয়েছে মিসর। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এখনো মাঝেমধ্যে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের উদাহরণ টানেন, যখন ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মিসরের বিমানবাহিনীকে মাটিতেই ধ্বংস করে দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সামরিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে সেই তুলনা আর টিকবে না।

২০২৬ সালে মিসরের নিয়মিত সেনাসদস্যের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৪ লাখ, আর রিজার্ভ সেনা রয়েছে আরও ৮ লাখ। প্রতিরক্ষায় বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার খরচ করা মিসর এখন মার্কিন আব্রামস ট্যাংক, ফরাসি রাফাল জেট, রুশ সু-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং জার্মানিতে তৈরি সাবমেরিনের এক মিশ্র ও শক্তিশালী অস্ত্রাগার গড়ে তুলেছে।

খোদ নেতানিয়াহুও এই পরিবর্তনটি টের পেয়েছেন। গত ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েলি পার্লামেন্ট পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা কমিটির এক রুদ্ধদ্বার অধিবেশনে তিনি বলেছিলেন, ‘মিসরীয় সেনাবাহিনী শক্তিশালী হচ্ছে এবং আমাদের এটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা দরকার।’

সুতরাং ২০২৬ সালের মিসর আর ১৯৬৭ সালের মিসর এক নয়, তা এখন ইসরায়েলি কর্মকর্তারাও স্বীকার করতে শুরু করেছেন।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সৌদি আরব। টাইফুন ও এফ-১৫ যুদ্ধবিমান নিয়ে গড়ে ওঠা তাদের বিমানবাহিনী আকারে ছোট হলেও বেশ সক্ষম। একই সঙ্গে রিয়াদ এখন ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের বাইরেও নিজেদের নিরাপত্তা সম্পর্ক বহুমুখী করার কাজে হাত দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বৈরিতা গড়ে উঠেছিল চার দশক ধরে একটি সুনির্দিষ্ট আদর্শিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু তুরস্ক, মিসর, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের তেমন কোনো যৌথ আদর্শ বা যৌথ কমান্ড নেই। বিশেষ করে কায়রো ও রিয়াদের সঙ্গে ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের শান্তিচুক্তি এবং পর্দার আড়ালের নিরাপত্তা সমঝোতা রয়েছে, যা বাতিলের কোনো ইঙ্গিত এই দুই দেশের সরকার দেয়নি।

তবে ইসরায়েলি পরিকল্পনাবিদদের সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন করছে পাকিস্তান। কর্মকর্তাদের মতে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র পাকিস্তানের কাছেই কার্যকর পারমাণবিক অস্ত্রাগার এবং তা বহনের উপযোগী ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। তা ছাড়া দেশটির বিমানবাহিনীও সম্প্রতি বাস্তব যুদ্ধে নিজেদের প্রমাণ করেছে। পেন্টাগন নিশ্চিত করেছে যে চীন পাকিস্তানকে ৩৬টি জে-১০সি ফাইটার জেট সরবরাহ করেছে। ইসলামাবাদের দাবি, গত বছর ভারতের সঙ্গে এক সংক্ষিপ্ত লড়াইয়ে এই বিমানগুলো থেকে দূরপাল্লার পিএল-১৫ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ভারতের বেশ কয়েকটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করা হয়, যার মধ্যে অন্তত একটি রাফাল জেটও ছিল।

গত এপ্রিলে পাকিস্তান তাদের এই ধরনের ডজন দুয়েক যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছিল ইসলামাবাদ সফর শেষে ইরানি কূটনীতিকদের নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য।  
তবে এই সবকিছু মিলে আসলেই কোনো সুসংগঠিত বা সমন্বিত হুমকি তৈরি করছে কি না—সেটি এখনো একটি বড় প্রশ্ন।

খোদ ইসরায়েলের নিরাপত্তাব্যবস্থার ভেতরেই এ নিয়ে তীব্র মতভেদ রয়েছে। আঙ্কারা, কায়রো, রিয়াদ ও ইসলামাবাদকে এক সুতায় বাঁধার মতো কোনো যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নেই; এমনকি এই চার দেশের সরকার সামরিক কোনো পরিকল্পনা একসঙ্গে করছে—এমন কোনো প্রমাণও মেলেনি।

ইসরায়েল-ভারত যেভাবে পাকিস্তানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করতে চেয়েছিল

ইসরায়েলের সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইয়োয়াভ গালান্ত বেনেটের চেয়ে কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি কেবল লিখেছেন, তুরস্ক ‘এখন আর প্রান্তিক কোনো অংশীদার নয়’, বরং তারা নিজেদের একটি বড় আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। এটি মূলত তুরস্কের উচ্চাকাঙ্ক্ষার বর্ণনা, কোনো আসন্ন সংঘাতের ইঙ্গিত নয়।
কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা বিষয়ের পণ্ডিত আন্দ্রিয়াস ক্রিগ নেতানিয়াহুর ‘ষড়্‌ভুজ জোট’কে স্রেফ পূর্বের সম্পর্কগুলোর একটি নতুন ব্র্যান্ডিং বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে চ্যাথাম হাউসের ইয়োসি মেকেলবার্গ এবং যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত অ্যালন পিনকাস প্রকাশ্যে যুক্তি দেখিয়েছেন যে বেনেট ও নেতানিয়াহু—উভয়েরই নিজস্ব অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। সামনে নির্বাচন কিংবা বর্তমান সরকারি জোট টিকিয়ে রাখার জন্য একটি ‘বাহ্যিক হুমকি’ জিইয়ে রাখা তাঁদের প্রয়োজন।

তাঁরা সতর্ক করে বলেন, আঙ্কারাকে দ্বিতীয় তেহরান হিসেবে গণ্য করতে গিয়ে ইসরায়েল হয়তো নিজেই নিজের এমন এক শত্রু তৈরি করে ফেলবে, যার অস্তিত্ব বাস্তবে নেই।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বৈরিতা গড়ে উঠেছিল চার দশক ধরে একটি সুনির্দিষ্ট আদর্শিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু তুরস্ক, মিসর, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের তেমন কোনো যৌথ আদর্শ বা যৌথ কমান্ড নেই। বিশেষ করে কায়রো ও রিয়াদের সঙ্গে ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের শান্তিচুক্তি এবং পর্দার আড়ালের নিরাপত্তা সমঝোতা রয়েছে, যা বাতিলের কোনো ইঙ্গিত এই দুই দেশের সরকার দেয়নি।

এখন পর্যন্ত এই দেশগুলোকে যদি কোনো কিছু এক করে থাকে, তবে তা হলো ইসরায়েলের ওপর ক্ষোভ ও শঙ্কা। যে ইসরায়েল মাত্র এক বছরে অঞ্চলের ছয়টি দেশে আঘাত হেনেছে এবং এখন খোলাখুলিভাবে একটি ‘উত্থিত কট্টরপন্থী সুন্নি অক্ষ’ নিয়ে কথা বলছে। এই শঙ্কা বেনেটের সতর্কবাণী অনুযায়ী কোনো বাস্তব সামরিক জোটে রূপ নেবে কি না, তা আঙ্কারা, কায়রো, রিয়াদ বা ইসলামাবাদের সিদ্ধান্তের চেয়ে জেরুজালেম আগামী দিনে কী সিদ্ধান্ত নেয়, তার ওপরই বেশি নির্ভর করছে।

  • জসিম আল-আজাবি সাংবাদিক ও লেখক। মিডল ইস্ট মনিটর থেকে অনূদিত।