মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একসময় যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন করবেন, এটা এখন বেশিরভাগ ইসরায়েলির কাছেই প্রায় অনিবার্য বলে মনে হচ্ছে। ১৯৪৮ সালে বিভিন্ন জায়নবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীকে একত্র করে রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই জোট ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
বর্তমানে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার টিকিয়ে রাখার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এক পথে হাঁটছেন। চলমান দুর্নীতির মামলায় তাঁর কারাদণ্ডের সম্ভাবনা আছে। পাশাপাশি চলতি বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সাধারণ নির্বাচনে তিনি ক্ষমতা হারাতেও পারেন।
একদিকে লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করে ইরানের সঙ্গে সমঝোতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে ওয়াশিংটনের। ২০২৩ সাল থেকে লেবাননে ধারাবাহিকভাবে বোমাবর্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। অন্যদিকে, ইসরায়েলি জনগণের একটি বড় অংশ ওই যুদ্ধ অব্যাহত রাখতে চায়। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে নেতানিয়াহু তাঁর চার দশকের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ের মুখোমুখি।
২০২৫ সালের জুনে ইরানের বিরুদ্ধে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে মতবিরোধের খবর প্রকাশিত হয়েছিল। এক বছর পর সেই সম্পর্ক আরও অবনতির দিকে গেছে বলে মনে হচ্ছে। কারণ, তেহরানকে ঘিরে ভবিষ্যতে কীভাবে এগোনো হবে, তা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির আলোচনায় ইরান গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধের দাবি তুলেছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে বড় ধরনের মতবিরোধের পথ তৈরি হয়েছে। গত মাসে একটি ফোনালাপের কথিত অডিও ফাঁস হয়। যদিও হোয়াইট হাউস সেটি অস্বীকার করেনি। সেখানে শোনা যায়, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতে মরিয়া ট্রাম্প লেবাননে হামলা বন্ধ করতে অস্বীকৃতি জানানোয় নেতানিয়াহুকে তীব্র ভর্ৎসনা করছেন।
খবরে বলা হয়, ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ বলে অভিহিত করেন এবং অকৃতজ্ঞতার অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর হস্তক্ষেপ না থাকলে নেতানিয়াহু এতদিনে জেলে থাকতেন। ট্রাম্প কথিতভাবে তাঁকে আরও বলেন, ‘এখন সবাই তোমাকে ঘৃণা করে। এই ঘটনার কারণে সবাই ইসরায়েলকেও ঘৃণা করে।’
গত সপ্তাহে অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, নেতানিয়াহু ‘জানেন যে, আসল বস কে।’ অনেকের মতে, এই মন্তব্যই দুই নেতার সম্পর্ক যে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তার একটি স্পষ্ট স্বীকারোক্তি।
জুনে এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, বর্তমানে ট্রাম্পই বিশ্বের একমাত্র নেতা, যিনি ইসরায়েলের প্রতি সহানুভূতিশীল। একই সঙ্গে সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির সমালোচনা করা ইসরায়েলি মন্ত্রীদের উদ্দেশে তিনি কড়া সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, ‘আপনাদের মাতৃভূমিকে রক্ষা করা প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দুই-তৃতীয়াংশ অস্ত্রই আমেরিকার হাতে তৈরি এবং আমেরিকান করদাতাদের অর্থে পরিশোধ করা হয়েছে।’
সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণই নয়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ডানপন্থী জনতাবাদী আন্দোলন ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইনের’ (মাগা) একটি অংশের মধ্যেও ইসরায়েল নিয়ে তীব্র সংশয় তৈরি হয়েছে। মাগা শিবির থেকে সরে যাওয়া ট্রাম্পের একসময়ের প্রভাবশালী সমর্থক মার্জোরি টেলর গ্রিন যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েল-সমর্থন নীতির কঠোর সমালোচনা করেছেন। ডানপন্থী রাজনৈতিক অঙ্গনের সবচেয়ে সোচ্চার সমালোচকদের একজন সাবেক টেলিভিশন উপস্থাপক টাকার কার্লসন। জুনের শেষ দিকে তিনি বলেন, ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত বুঝতে পেরেছেন যে, তাঁর প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠেছে ইসরায়েল।
নিজের পডকাস্টের শুরুতেই কার্লসন অভিযোগ করেন, ইসরায়েল ‘অনুরোধ, প্ররোচনা ও চাপ প্রয়োগের’ মাধ্যমে ট্রাম্পকে ইরানের ওপর হামলা চালাতে রাজি করিয়েছিল। তাঁর দাবি, সেটিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশ লেবাননের বিরুদ্ধে ‘আরেকটি যুদ্ধ’ শুরু করাই ছিল উদ্দেশ্য।
ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) গবেষক এবং জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যানিয়েল বাইম্যান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে ঐতিহ্যগতভাবে সবচেয়ে বেশি ইসরায়েলপন্থী দল রিপাবলিকান পার্টির নেতৃত্বে থাকলেও, ট্রাম্পের হাতে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে একাধিক বিকল্প পথ খোলা রয়েছে।
বাইম্যান বলেন, ‘আমি মনে করি, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে যথেষ্ট নমনীয় হওয়ার সুযোগ রয়েছে। যদিও অনেক রিপাবলিকান দৃঢ়ভাবে ইসরায়েলপন্থী, প্রেসিডেন্টের একটি অত্যন্ত অনুগত সমর্থকগোষ্ঠী আছে। তিনি ইতোমধ্যেই দেখিয়েছেন, নিজের দলের বিশাল অংশকে তিনি নিজের অবস্থানের সঙ্গে একমত করাতে পারেন। এ ক্ষেত্রে অনেক ডেমোক্র্যাটও তাঁর সঙ্গে থাকবেন। কারণ, দলটি ক্রমেই ইসরায়েলের প্রতি আরও সমালোচনামুখর হয়ে উঠছে।’
ইসরায়েলের ইতিহাসজুড়ে দেশটির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও সামরিক সমর্থনের গুরুত্ব সম্পর্কে ইসরায়েলে খুব কম মানুষই জানেন। ২০১৬ সাল থেকে একটি সমঝোতা স্মারকের (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) আওতায় ১০ বছরের জন্য ৩৮ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা পেয়ে আসছে ইসরায়েল। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্য কোনো দেশের করা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক সহায়তা চুক্তি।
গাজায় বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয় বলে বিবেচিত ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সমর্থনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত এই যুদ্ধে অন্তত ৭২ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এ ইস্যুতে জাতিসংঘে হওয়া বিভিন্ন বিতর্কে ইসরায়েলের পক্ষে ওয়াশিংটন অন্তত ছয়বার ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে।
ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনকে ঘিরে প্রচারণার সময় নেতানিয়াহুর অনেক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কের অবনতি এবং ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরেন। যদিও তাঁদের অধিকাংশই মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সেই যুদ্ধগুলোর সমর্থক ছিলেন, যেগুলো শেষ পর্যন্ত এই কূটনৈতিক সংকট সৃষ্টি করেছে।
জুনের মাঝামাঝি সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ, ইসরায়েলের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে নেতানিয়াহুর দৃশ্যমান ব্যর্থতার সমালোচনা আরও জোরদার করেন। তিনি এক্সে লিখেছিলেন, ‘আমরা যদি দ্রুত এই সরকারকে পরিবর্তন করতে না পারি, তাহলে ইসরায়েলের বৈদেশিক সম্পর্ক পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে।’
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সাবেক চিফ অব স্টাফ এবং চলতি বছরের নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত গাদি আইজেনকটও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার কঠোর সমালোচনা করেছেন। সম্প্রতি আইজেনকট অভিযোগ করেন, নেতানিয়াহু পরিস্থিতি এতটাই খারাপভাবে সামলেছেন যে, ট্রাম্প ইসরায়েলকে পাশ কাটিয়ে একাই ইরানের সঙ্গে চুক্তির পথে এগোনোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর ফলে ইসরায়েল তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক নিমরোদ ফ্লাশেনবার্গ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রই মূল ভিত্তি হিসেবে বিশ্বের কাছে ইসরায়েলের অবস্থান নিশ্চিত করে। ইসরায়েলের জন্য যুক্তরাষ্ট্রই সবকিছু। প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, কূটনৈতিক মর্যাদা, সবই তারা দেয়।’
মার্কিন লেখক ও সাবেক কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ট্রাম্প ইসরায়েলের সঙ্গে প্রকাশ্যে দ্বন্দ্বে জড়ানো প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট নন, তবে খুব কম প্রেসিডেন্টই এটি এতটা প্রকাশ্যভাবে করেছেন। তিনি বলেন, ‘কিন্তু বর্তমান প্রশাসনের মতো ভাষায় কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট বা ভাইস প্রেসিডেন্ট কখনো কথা বলেননি। আবার ইসরায়েলি নেতার সঙ্গে হওয়া আলোচনার এমন তথ্যও ফাঁস করেননি, যেখানে তাঁকে ছোট করা হয়েছে এবং তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। কংগ্রেস কিংবা সাধারণ জনগণের মধ্যে, রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় ভোটারের কাছেই ইসরায়েল এর আগে কখনো এতটা অজনপ্রিয় ছিল না।’
তবে উত্তেজনা থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প প্রশাসন যে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করার কথা ভাবছে, এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। মিলার বলেন, ‘ট্রাম্প যদি সত্যিই ইসরায়েলের ওপর গুরুতর চাপ প্রয়োগ করেন, তাহলে সেটি হবে এমন কোনো বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জনের উদ্দেশ্যে, যা তাঁকে রাজনৈতিকভাবে সফল হিসেবে তুলে ধরবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ মুহূর্তে এমন কোনো বিষয় নেই, সেটা লেবানন হোক, গাজা হোক কিংবা ইসরায়েল-সৌদি সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণই হোক, যেটি বড় ধরনের সাফল্যের এতটা কাছাকাছি রয়েছে যে, তার জন্য ইসরায়েলের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ প্রয়োগ করা প্রয়োজন হবে।’
অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান
আরও পড়ুন:








