বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা কোনটি? ক্রিকেট না ফুটবল? তর্কসাপেক্ষে এখনও ফুটবলকেই এগিয়ে রাখতে হবে। ক্রিকেটে বাংলাদেশ জাতীয় দল ভালো খেলে, র্যাংকিংয়ে সেরা ৬,৭ কিংবা ৮ নম্বরে থাকে, নিয়মিত বিশ্বকাপ খেলে। আন্তর্জাতিক সিরিজ কিংবা বিপিএল হলে গ্যালারি ভরে যায় দর্শকে।
বিপরীতে ফুটবল? র্যাংকিংয়ে ১৮০, ১৭৮ এর নিচে নামতে পারে না। ঘরোয়া লিগে দর্শক নেই। আবাহনী-মোহামেডান মাঠে নামলেও দর্শকদের মাঠে টানতে পারে না। মাঝে-মধ্যে জাতীয় দলের খেলা হলে কিছু দর্শক হয়।
উপরের দুই বক্তব্যের মাপকাঠিতে হয়তো আপনি ক্রিকেটকে এগিয়ে রাখবেন, রাখাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এখনও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গেলে দেখবেন, ফুটবল খেলায় যেমন জনসমাগম ঘটে, ক্রিকেটে তেমনটা হয় কি না! বিশ্বকাপ এলেই বোঝা যায় ফুটবল নিয়ে বাংলাদেশের মানুসের উন্মাদনা কোন লেভেলে গিয়ে পৌঁছায়।
জার্সি-পতাকা আর বিশাল বিশাল স্ক্রিণে খেলা দেখার আয়োজন, তুমুল তর্ক-বিতর্ক - ফুটবল বিশ্বকাপটা যেন বাংলাদেশের মানুষের অস্থি-মজ্জার ভেতরে ঢুকে পড়া একটি খেলা। যেখান থেকে বের হতে পারে না কেউই। বিশ্বকাপের পুরো সময়টা এ দেশের মানুষ সব কিছু ভুলে শুধু ফুটবল নিয়েই মেতে থাকে।

বাংলাদেশের মানুষের বিশ্বকাপ উন্মাদনা, বিশেষ করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলকে নিয়ে যে জন-সমর্থন তৈরি হয় তার খবর এরই মধ্যে সাত সমুদ্র-তেরো নদী পেরিয়ে লাতিনের দেশগুলোতেও পৌঁছে গেছে। দেশ দুটির ফুটবলাররাও জানে, তাদের নিজেদের দেশের চেয়েও পাগল সমর্থন হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে ছোট্ট দেশ বাংলাদেশেও আছে।
ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে এত উন্মাদনা যে দেশটিতে, সেই দেশটি কেন বিশ্বকাপ ফুটবলে খেলতে পারে না? কেন বিশ্বকাপই নয় শুধু, অন্তত এশিয়া কাপের চূড়ান্ত পর্বেও খেলার যোগ্যতা অর্জন করে না। কেন এত ফুটবল উন্মাদনার দেশটির দৌড় সর্বোচ্চ সাফ টুর্নামেন্ট পর্যন্ত সীমিত?
র্যাংকিং বিশ্লেষণ
ফিফা র্যাংকিংয়ে বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮১তম। দীর্ঘদিন ধরেই ১৮০’র ঘরে ঘোরাফেরা করছে বাংলাদেশের র্যাংকিং। ২০১৭ সালে সর্বনিম্ন ১৯৭তেও নেমে গিয়েছিল তারা। ২০১৫ সাল থেকেই এই ধারাবাহিক অধপতন। ২০১৪ সাল পর্যন্ত ১৬৪, ১৬৫ পর্যন্ত ছিল স্বাভাবিক র্যাংকিং। ২০০৯ সালে ১৫০-এর আগে (১৪৯) ছিল বাংলাদেশের অবস্থান।
শুনলে অবাক হবেন, ১৯৯২ সালে ফিফা র্যাংকিং সিস্টেম চালু করার পর ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ১১০ নাম্বার পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। দেশের ফুটবল ইতিহাসে এটাই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ফুটবল র্যাংকিং।

এবং শুনে আরও অবাক হবেন- এবার বিশ্বকাপ খেলা সবচেয়ে আলোচিত দল কেপ ভার্দের ১৯৯৬ সালে র্যাংকিং ছিল ১৪৫ থেকে ১৫৫। অর্থ্যাৎ, ফিফা র্যাংকিং দিয়ে শক্তির বিচার করলে বাংলাদেশ সেবার কেপ ভার্দের চেয়ে ছিল অনেক এগিয়ে। ২০০০ সালে একটা সময় তারা নেমে গিয়েছিল ১৮২তম স্থানে। ওই বছর বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৩১ থেকে ১৫০ এর মধ্যে।
কুরাসাওয়ের র্যাংকিংই শুরু হয়েছিল ২০১১ সাল থেকে। তার আগে এই দেশটির ফুটবলের ইতিহাসই নেই। ২০১৪ সালে কুরাসাও সর্বনিম্ন ১৮৩তম স্থানে পর্যন্ত নেমে গিয়েছিল। ওই একই সময় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৬৪-১৬৫ এর মধ্যে।
আরেকটি আলোচিত দল কঙ্গোর ফুটবল র্যাংকিংয়ের ইতিহাস পাওয়া যায় ১৯৯৯ সাল থেকে। যদিও দেশটি আগে জায়ার নামে পরিচিত ছিল এবং ফুটবলও খেলতো জায়ার নামে। এই দেশটি সর্বনিম্ন ১৩৩তম অবস্থানে নেমেছিল ২০১১ সালে।
জনসংখ্যার বিশ্লেষণ
এবারের বিশ্বকাপে আলোচিত এই তিনটি দেশের মধ্যে জনসংখ্যা বিশ্লেষণ করলে আরও বেশি অবাক হতে হয়। ক্যারিবিয়ান দ্বীপদেশ কুরাসাওয়ের জনসংখ্যান মাত্র দেড় লাখ। সবচেয়ে কম জনসংখ্যার ছোট দেশ হিসেবে বিশ্বকাপে খেলে এবার রেকর্ড গড়েছে দেশটি। আফ্রিকান দ্বীপদেশ কেপ ভার্দের জনসংখ্যা সাড়ে ৫ লাখ থেকে সাড়ে ৫ লাখ। আলোচিত দল ডিআর কঙ্গোর জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ১২ কোটি প্লাস।

প্রায় ১৮ কোটি জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশ। কুরাসাও আর কেপ ভার্দের সঙ্গে জনসংখ্যার বিষয়টা তুল্যই না। কিন্তু এক সময় র্যাংকিংয়ে পিছিয়ে থাকা দেশগুলো আজ বিশ্বকাপে খেলতে এসে রীতিমত আর্জেন্টিনা, স্পেন, উরুগুয়েসহ বিশ্বসেরা ফুটবল দেশগুলোকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। সেখানে এতবেশি ফুটবল উন্মাদনা থাকা, একসময় র্যাংকিংয়ে এগিয়ে থাকা এবং বিপুল জনসংখ্যার দেশ হয়েও কেন বিশ্বকাপে খেলতে পারে না বাংলাদেশ?
কিছুদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে প্রবাসী বাংলদেশিদের নিয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া এর একটি ছোট্ট কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘বিশ্বকাপে খেলার উজ্জ্বল সম্ভাবনা আছে বাংলাদেশের। কিন্তু এ লক্ষ্য অর্জন করার ক্ষেত্রে কিছু অন্তরায় রয়েছে। বাংলাদেশে দক্ষ স্ট্রাইকারের অভাব, ক্লাবগুলোর অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও ফুটবল শুধু ঢাকা শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় বিশ্বকাপে খেলার শুধু স্বপ্নই দেখে যেতে হচ্ছে।’
হামজা চৌধুরী, শামিত সোমদের সাথে আরও ভালো মানের প্রবাসী ফুটবলার যুক্ত হলে বাংলাদেশকেও ভবিষ্যতে বিশ্বকাপ দেখা যেতে পারে বলে মনে করেন অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া।
তাহলে সমাধান কী?
এআইয়ের কাছে জানতে চেয়েছিলাম- কেপ ভার্দে, কুরাসাওয়ের মত দেশগুলো বিশ্বকাপে খেলতে পারলেও বাংলাদেশ পারে না কেন? যদিও বাংলাদেশে ফুটবল তুমুল জনপ্রিয় এবং জনসংখ্যাও এই দেশ দুটির চেয়ে বিপুল পরিমাণ বেশি। আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স বেশ কিছু বাস্তবতা তুলে ধরেছে এবং কিছু সামাধানও বাতলে দিয়েছে।
এই যে সমস্যা তুলে ধরেছে এবং যে সমাধান বাতলে দিয়েছে, সেগুলোই এখানে তুলে ধরা হলো-
‘প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলেছে কেপ ভার্দে, আর কুরাসাও ও ডিআর কঙ্গোর মতো তুলনামূলক ছোট বা অর্থনৈতিকভাবে সীমিত দেশও জায়গা করে নিয়েছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে। প্রশ্নটা তাই স্বাভাবিক- যে দেশগুলোর জনসংখ্যা বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম, তারাও যখন বিশ্বকাপে পৌঁছাতে পারে, তখন ১৮ কোটির বেশি মানুষের বাংলাদেশ এখনও কেন সেই স্বপ্ন থেকে অনেক দূরে?
এর উত্তর শুধু একটি কারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, অবকাঠামো, খেলোয়াড় তৈরির প্রক্রিয়া, লিগের মান এবং প্রশাসনিক ধারাবাহিকতার সমন্বয়েই গড়ে ওঠে একটি বিশ্বকাপগামী দল।

এ ক্ষেত্রে ছোট দেশ হলেও কেপ ভার্দে, কুরাসাওয়ের মতো দেশগুলোর বড় পরিকল্পনাই মূলত নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে-
কেপ ভার্দের অবিশ্বাস্য উত্থান
প্রথমেই কেপ ভার্দের কথাই ধরা যাক। আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের ছোট দ্বীপরাষ্ট্রটির জনসংখ্যা মাত্র ৫ থেকে সাড়ে ৫ লাখের কাছাকাছি। কিন্তু দেশটি অনেক আগেই বুঝেছিল, নিজেদের সীমিত জনসংখ্যা দিয়ে প্রতিযোগিতা করা কঠিন। তাই তারা ইউরোপে বসবাসকারী কেপ ভার্দিয়ান বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের খুঁজে বের করে জাতীয় দলে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেয়।
ফ্রান্স, পর্তুগাল, নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়ামের বিভিন্ন ক্লাবে বেড়ে ওঠা অসংখ্য ফুটবলার কেপ ভার্দের হয়ে খেলতে শুরু করেন। একই সঙ্গে স্থানীয় ফুটবল উন্নয়নও চলতে থাকে।
ফলাফল? একসময় ১৮০-এর নিচে নেমে যাওয়া দলটি ২০১৪ সালে ফিফা র্যাংকিংয়ে উঠে আসে ২৭ নম্বরে। এরপর ২০২৬ সালে ইতিহাস গড়ে প্রথমবার বিশ্বকাপে অংশ নেয়। এই দেশটির কোনো ফুটবলার নিজ দেশের লিগে খেলেন না।
কুরাসাওয়ের ভিন্ন পথ
ক্যারিবীয় দ্বীপ কুরাসাওয়ের জনসংখ্যা মাত্র দেড় লাখের মতো। কিন্তু তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক। অসংখ্য ডাচ লিগে খেলা ফুটবলার কুরাসাওয়ের হয়ে খেলতে সম্মত হয়েছেন।

জাতীয় দল গঠনের সময় তারা ইউরোপের একাডেমিতে বেড়ে ওঠা খেলোয়াড়দের অগ্রাধিকার দিয়েছে। পাশাপাশি ডাচ কোচিং দর্শন ও আধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এবারের বিশ্বকাপ খেলা কুরাসাও দলটিতে একজন ফুটবলারও নেই যারা তাদের ঘরোয়া লিগে খেলে।
ডিআর কঙ্গো: প্রতিভার ভাণ্ডার
ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (ডিআর কঙ্গো) আফ্রিকার অন্যতম বড় প্রতিভার উৎস। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইংল্যান্ড ও জার্মানির অসংখ্য ক্লাবে কঙ্গো বংশোদ্ভূত ফুটবলার খেলেন। জাতীয় দল সেই প্রতিভাকে কাজে লাগাতে পেরেছে। তাদের অনেক খেলোয়াড় ইউরোপের শীর্ষ লিগে নিয়মিত খেলেন। ফলে জাতীয় দলের মানও স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে।
বাংলাদেশের বাস্তবতা
বাংলাদেশের সমস্যা শুধু মাঠেরই নয়; পুরো ফুটবল ইকোসিস্টেমের। ধারাবাহিকভাবে বলতে গেলে-
১. শক্তিশালী ঘরোয়া লিগের অভাব
বিশ্বকাপে খেলা প্রায় প্রতিটি দেশের একটি প্রতিযোগিতামূলক ঘরোয়া লিগ রয়েছে। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ নিয়মিত হলেও—
- দর্শক কম
- প্রতিযোগিতার গভীরতা সীমিত
- ক্লাবগুলোর আর্থিক স্থায়িত্ব দুর্বল
- বয়সভিত্তিক দল পরিচালনায় ধারাবাহিকতা নেই
ফলে খেলোয়াড়দের মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত হয় না।
২. বয়সভিত্তিক উন্নয়ন দুর্বল
ফুটবলার তৈরি হয় ৮-১৬ বছর বয়সে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, উজবেকিস্তান, কেপ ভার্দে কিংবা মরক্কো- সব দেশই দীর্ঘদিন ধরে বয়সভিত্তিক উন্নয়নে বিনিয়োগ করেছে। বাংলাদেশে অনেক প্রতিভাবান ফুটবলার উঠে এলেও নিয়মিত প্রশিক্ষণ, বিজ্ঞানভিত্তিক ফিটনেস, পুষ্টি ও ম্যাচ অভিজ্ঞতার ঘাটতি থেকে যায়।
৩. আন্তর্জাতিক মানের ম্যাচের অভাব
একটি জাতীয় দল উন্নতি করে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নিয়মিত খেললে। বাংলাদেশ বছরে খুব সীমিতসংখ্যক আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে। অন্যদিকে কেপ ভার্দে বা ডিআর কঙ্গো আফ্রিকার শক্তিশালী দেশগুলোর বিপক্ষে প্রায় প্রতি আন্তর্জাতিক উইন্ডোতেই খেলার সুযোগ পায়।
৪. বিদেশে খেলা ফুটবলারের সংকট
বর্তমান বিশ্ব ফুটবলে জাতীয় দলের সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি ইউরোপে খেলা ফুটবলার। কেপ ভার্দে, কুরাসাও, ডিআর কঙ্গো- তিন দেশই ইউরোপভিত্তিক খেলোয়াড়দের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। শুধু এই তিন দেশই নয়- মরক্কোর মত ফুটবল দেশটির বিশ্বকাপ স্কোয়াডে নেই ঘরোয়া ফুটবল খেলা কোনো খেলোয়াড়। এমনকি প্রায় পুরোটা দলই প্রবাসী ফুটবলার নির্ভর। আফ্রিকার অন্যান্য দেশ, যেমন- ঘানা, সেনেগাল, আইভরি কোস্ট, এশিয়ার দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান- এসব দেশের ফুটবলারদের অধিকাংশই খেলে বিদেশি লিগে। অনেকেরই জন্ম বিদেশে, কিন্তু খেলেন দেশের হয়ে।
বাংলাদেশের খুব কম ফুটবলারই বিদেশি লিগে নিয়মিত খেলেন। ফলে আন্তর্জাতিক মানের অভিজ্ঞতা জাতীয় দলে আসে না। আর প্রবাসী ফুটবলারও কম। সাম্প্রতিক সময়ে হামজা চৌধুরী, সামিত সোমদের মত প্রবাসী ফুটবলারকে নিয়ে আসায় বাংলাদেশে ফুটবল উন্মাদনা কিছুটা বেড়েছে। দর্শকও বেড়েছে গ্যালারিতে।

যদিও বিদেশী ফুটবলারদের নিয়ে এসে জাতীয় দল গঠন করতে গিয়ে বাফুফের বর্তমান কমিটিকে তুমুল সমালোচনার শিকারও হতে হচ্ছে। সাবেক ফুটবলার, কোচ এমনকি কিছু সংগঠকও, ‘প্রবাসী ফুটবলার এনে দেশের ফুটবলকে ধ্বংস করা হচ্ছে’ বলে সমালোচনা করছেন। যদিও তারা মরক্কো, কুরাসাও, কেপ ভার্দের মত দলগুলোর দিকে তাকাচ্ছেন না।
৫. দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব
ফুটবলে সফল দেশগুলো ১০-২০ বছরের পরিকল্পনা নিয়ে সামনে এগোয়। বাংলাদেশে প্রায়ই কোচ, পরিকল্পনা ও নীতিমালা বদলে যায়। ফলে একটি প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি শুরু হয়। ধারাবাহিকতা তৈরি হয় না।
৬. অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা
বিশ্বমানের অনুশীলন কেন্দ্র, স্পোর্টস সায়েন্স, ভিডিও বিশ্লেষণ, পুনর্বাসন ব্যবস্থা- এসব এখন আধুনিক ফুটবলের অপরিহার্য অংশ। বাংলাদেশে কিছু উন্নয়ন হলেও জাতীয় পর্যায়ে এখনও পর্যাপ্ত নয়।
জনসংখ্যা বড় হলেই সাফল্য আসে না
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো- জনসংখ্যা বেশি মানেই ভালো দল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বাস্তবতা বলছে, বিষয়টি ঠিক উল্টোও হতে পারে।
- কেপ ভার্দে: প্রায় ৬ লাখ মানুষ
- কুরাসাও: প্রায় ১.৫ লাখ
- আইসল্যান্ড: প্রায় ৪ লাখ
- ক্রোয়েশিয়া: প্রায় ৪০ লাখ
এই দেশগুলো বিশ্বমঞ্চে সফল হয়েছে পরিকল্পনার কারণে, জনসংখ্যার কারণে নয়।
বাংলাদেশের সামনে সুযোগ কী আছে?
বাংলাদেশের সম্ভাবনা একেবারে নেই- এ কথা বলা ভুল হবে। বরং প্রয়োজন কয়েকটি বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ-
- বয়সভিত্তিক ফুটবলে ধারাবাহিক বিনিয়োগ
- স্কুল ও একাডেমিভিত্তিক প্রতিভা খোঁজা
- ঘরোয়া লিগের মান বাড়ানো
- বিদেশে খেলার সুযোগ তৈরি করা
- প্রবাসী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের জাতীয় দলে আনার উদ্যোগ
- দীর্ঘমেয়াদি কারিগরি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন
- প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা
কেপ ভার্দে, কুরাসাও কিংবা ডিআর কঙ্গো বিশ্বকাপে উঠেছে কোনো অলৌকিক কারণে নয়। তারা বছরের পর বছর ধরে পরিকল্পনা করেছে, প্রবাসী ফুটবলারদের কাজে লাগিয়েছে, বয়সভিত্তিক উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতায় নিজেদের অভ্যস্ত করেছে।
বাংলাদেশেরও জনসংখ্যা, ফুটবলের প্রতি আবেগ এবং তরুণ প্রতিভার অভাব নেই। যে জায়গাটিতে পিছিয়ে রয়েছে, তা হলো পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা, উন্নয়ন কাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।
বিশ্বকাপে ওঠা কোনো এক বা দুই বছরের প্রকল্প নয়। এটি এক দশক বা তারও বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা একটি প্রক্রিয়া। কেপ ভার্দে ও কুরাসাও দেখিয়ে দিয়েছে- ছোট দেশ হওয়া বাধা নয়; সঠিক পরিকল্পনা না থাকাই সবচেয়ে বড় বাধা।
আইএইচএস/







