বিমানবন্দর থেকে বের হতেই ফুটবল বিশ্বকাপের আঁচ পেলাম। অনেকটা আমাদের দেশের মতোই বিভিন্ন ভবনে উড়ছে আর্জেন্টিনার পতাকা। অন্য কোনো দেশের পতাকা তেমন চোখে পড়ল না। মনে হলো, এখানেও মেসি বাহিনীর একচ্ছত্র আধিপত্য! মেসি বাহিনীর একজন পাগল সমর্থক হিসেবে এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে।

কাতারে তখন ২০২২ বিশ্বকাপ চলছে। ঢাকা থেকে লাল-সবুজের পতাকা ব্যাকপ্যাকে নিয়ে এসেছি কেপ ভার্দেতে। এটি আমার বিশ্বভ্রমণের ১৫৯তম দেশ। বাংলাদেশ থেকে জার্মানি, তারপর ৩ ডিসেম্বর ডুসেলডর্ফ বিমানবন্দর থেকে সাল দ্বীপের পথে উড়াল।

আটলান্টিকের ওপর দীর্ঘক্ষণ উড়ে চলার পর জানালার বাইরে শুধু নীল জলরাশি। হঠাৎ সেই অসীম সমুদ্রের বুক চিরে দেখা দিল ছোট্ট একটুকরো ভূমি। চারদিকে ফেনিল ঢেউ, মাঝখানে আগ্নেয়গিরির জন্ম দেওয়া রুক্ষ পাহাড় আর সোনালি উপকূল। এটাই সাল দ্বীপ, যেখানে এমিলকার কাব্রাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামল বিমান।

কেপ ভার্দের আর্জেন্টিনা সমর্থকদের উল্লাস

সাল ইউরোপীয় পর্যটকদের জনপ্রিয় গন্তব্য। আমার পরিকল্পনা এখান থেকে কেপ ভার্দের আরও কয়েকটি দ্বীপ ঘোরা। তবে শুরু থেকেই চোখে পড়ল ফুটবল উন্মাদনা। খেলা থাকলেই রেস্তোরাঁগুলো দর্শকে ভরে যেত। কোথাও বড় পর্দায়, কোথাও টেলিভিশনে সবাই একসঙ্গে ম্যাচ দেখছে। এমনকি একদিন যে পর্যটকবাহী গাড়িতে ঘুরছিলাম, সেখানেও যাত্রীদের জন্য টেলিভিশনে খেলা দেখানোর ব্যবস্থা ছিল।

এভাবেই চলে এল ১৮ ডিসেম্বর, ফাইনালের দিন। আমার প্রিয় দল আর্জেন্টিনা খেলছে। আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম, সাল দ্বীপের মানুষদের সঙ্গে বসেই ফাইনাল দেখব।

সন্ধ্যার আগে স্থানীয় একটি রেস্তোরাঁয় ঢুকলাম আমরা। অর্ডার করলাম কেপ ভার্দের ঐতিহ্যবাহী খাবার ক্যাচুপা। ভুট্টা, শিম, মিষ্টি আলু, কাসাভা, কাঁচকলা, ইয়াম ও মাংসের সমন্বয়ে তৈরি এই খাবারের স্বাদ অনেকটা আমাদের খিচুড়ির মতো। পৃথিবীর যেখানেই যাই, সেখানকার মানুষের সংস্কৃতিকে জানার প্রথম জানালা আমার কাছে তাদের খাবার। তাই নতুন দেশের প্রথম খাবার সব সময়ই বিশেষ স্মৃতি হয়ে থাকে।

তবে সেদিন খাবারের চেয়েও বড় আকর্ষণ ছিল ফাইনাল ম্যাচ। খেলা শুরু হতেই দর্শকে ভরে গেল রেস্তোরাঁ। ভেতরে-বাইরে মিলিয়ে দুই শতাধিক মানুষ। কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বসে, কেউ জানালার পাশে, কেউ দরজার সামনে। সবার চোখ টেলিভিশনের পর্দায়। বাইরে ক্যাফে, রেস্তোরাঁ, রাস্তার মোড়—যেদিকে তাকাই, মানুষ খেলা দেখছে। কারও গায়ে মেসির জার্সি, কারও এমবাপ্পের।

কেপ ভার্দে সফরে নাজমুন নাহার

বহুদিনের স্বপ্ন ছিল লিওনেল মেসির হাতে বিশ্বকাপ দেখা। আর্জেন্টিনা গোল করলেই একদল আনন্দে লাফিয়ে উঠছে, পতাকা ওড়াচ্ছে। কিছুক্ষণ পর ফ্রান্স সমতা ফেরাতেই আরেক দল একই উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ছে।

খেলার উত্তেজনার এক পর্যায়ে কয়েকজন সমর্থকের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ও শুরু হলো। কিন্তু আশপাশের মানুষ দ্রুত এগিয়ে এসে পরিস্থিতি শান্ত করে দেন। কেউ কাঁধে হাত রাখেন, কেউ অন্য টেবিলে নিয়ে বসান। প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল, কিন্তু বিদ্বেষ ছিল না।

শেষ বাঁশি বাজতেই আনন্দে বিস্ফারিত হলো রেস্তোরাঁ। আর্জেন্টিনা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। মুহূর্তেই মানুষ রাস্তায় নেমে এল। চারদিকে করতালি, গান, গাড়ির হর্ন আর উল্লাস। নীল-সাদা পতাকা উড়ছে, অপরিচিত মানুষ একে অপরকে জড়িয়ে ধরছে। আমিও সেই আনন্দমিছিলে মিশে গেলাম। আটলান্টিকের ছোট্ট একটি দ্বীপে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সব দূরত্ব যেন ঘুচে গেছে।

দক্ষিণ আমেরিকার একটি দেশের জয় উদ্‌যাপন করছে আফ্রিকার উপকূলের ছোট্ট এক দ্বীপরাষ্ট্র, আর সেই উৎসবের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি এক বাংলাদেশি। ভাষা, জাতি, ধর্ম কিংবা মহাদেশের সীমানা পেরিয়ে ফুটবল মানুষকে কী অসাধারণভাবে একসুতোয় বেঁধে ফেলতে পারে, সেদিন খুব কাছ থেকে তা দেখেছিলাম।

সেই কেপ ভার্দেই এবার আমাকে নতুন করে বিস্মিত করেছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নেওয়া ছোট্ট এই আফ্রিকান দেশটি আর্জেন্টিনাসহ প্রতিটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে দারুণ লড়েছে। আগে জানতাম তাদের জাতীয় ফুটবল দল আছে, কিন্তু তারা যে এতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফুটবল খেলতে পারে, তা জানা ছিল না। মাত্র ছয় লাখের কিছু বেশি মানুষের দেশ কেপ ভার্দে বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেল।

ম্যাচের আগে লিওনেল মেসি কী কী করেন