সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) আবাসিক হলের ক্যান্টিনের খাবার নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে অভিযোগ করায় খাইরুল খন্দকার নামে এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে শাখা ছাত্রদলের দুই নেতার বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের (২০২৩-২৪) শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।
শনিবার (১৮ জুলাই) রাত পৌনে ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। মারধরে অভিযুক্তরা হলেন শাখা ছাত্রদলের যোগাযোগ সম্পাদক হাসিবুর রহমান ও সহদপ্তর সম্পাদক তারেক রহমান। তারা সবাই শাহপরান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী।
সূত্র জানায়, খাইরুল সম্প্রতি হলের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে খাবার নিয়ে হল প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. ইফতেখার আহমেদকে মেনশন করেন। মেসেজে তিনি হল প্রভোস্টকে খাবার উপভোগ করার জন্য বলেন। এর জেরে ছাত্রদল নেতা তারেক খাইরুলকে ডেকে নিয়ে হল প্রভোস্টের কাছে দুঃখ প্রকাশ করতে বলেন। পরবর্তীতে ফের হল প্রভোস্টকে খাবার নিয়ে মেনশন দেওয়ায় খাইরুলকে প্রধান ফটক এলাকায় মারধর করা হয়।
আরও পড়ুন
চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় শিক্ষার্থীকে ছাত্রদল নেতাদের মারধর
প্রত্যক্ষদর্শী অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী আবরার বিন সেলিম বলেন, আমি দেখতে পাই তারেক ভাই ও হাসিব ভাইয়ের সঙ্গে খাইরুলের তর্কাতর্কি হচ্ছে। এসময় তারেক ভাই আমাকে হলের গ্রুপে খাইরুলের খাবারের অভিযোগের বিষয় জানান। যখন খাইরুল কথা বলে, বারবার হাসিব ভাই তার কথার মধ্যে হস্তক্ষেপ করেন। তখন খাইরুল হাসিব ভাইয়ের কাছে দলীয় প্রভাব দেখাচ্ছে কিনা জানতে চান এবং বলেন, যদি কথা বলি হল প্রভোস্টের সঙ্গে কথা বলব। আপনাদের সঙ্গে কেন কথা বলব।
এক পর্যায়ে হাসিব ভাই খাইরুলের বুকে লাথি মারেন। তখন তারেক ভাই খাইরুলের মাথার পিছনে ঘাড়ের উপরের সংবেদনশীল জায়গায় মারা শুরু করেন। পরবর্তীতে তারা দুজন তাকে মারধর করতে থাকেন।
মারধরের পর আহত শিক্ষার্থীকে চিকিৎসার জন্য সিলেট নগরীর মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে নেওয়া হয়। ঘটনার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বরাবর লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন খাইরুল।
অভিযোগপত্রে তিনি জানিয়েছেন, গত ১৬ জুলাই শাহপরান হল ক্যান্টিন থেকে রাতের খাবার আনি এবং খাবারের মাছটি পচা ছিল। এরপর আমি প্রভোস্ট স্যারকে মেনশন করে শাহপরান হলের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে অভিযোগ জানাই। ১৭ জুলাই রাত প্রায় সাড়ে ১১টায় হাসিব ও তারেক অভিযোগের জন্য আমাকে চার্জ করে এবং প্রভোস্ট স্যারের কাছে ‘সরি’ বলতে বলে।
এরপর, ‘১৮ জুলাই খাবার খেতে গেটে আসি, হাসিব আমাকে ডেকে আমি কেন ‘সরি’ বলিনি তা জানতে চান এবং হুমকি দেন। এরপর তারেক বলেন, ‘এই ব্যাটা তুই আমাকে চিনিস? থাপড়িয়ে দাঁত ফেলে দেবো।’ আমি কিছু বলে ওঠার আগেই হাসিব সজোরে বুকে লাথি মারেন এবং তারেক এলোপাথাড়ি আমার মাথায় ও ঘাড়ে মারতে থাকেন। হাসিব পুনরায় লাথি মারেন এবং আমার ফোন ভেঙে দেন’-যোগ করেন খাইরুল।
আরও পড়ুন
চবি শিক্ষার্থীকে তুলে নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে
মারধরে অভিযুক্ত শাখা ছাত্রদলের যোগাযোগ সম্পাদক হাসিবুর রহমানকে কল দিলে তার নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। অন্য অভিযুক্ত শাখা ছাত্রদলের সহদপ্তর সম্পাদক তারেক রহমান বলেন, হলের গ্রুপে খাবারের বিষয়ে কথা বলায় প্রভোস্ট স্যার একটু মন খারাপ করেছেন। তখন আমি এ নিয়ে খাইরুলকে বোঝাচ্ছিলাম। কিন্তু সে জুনিয়র হয়েও খুব বাজে আচরণ করে। যেটা সিনিয়র হিসেবে খুব খারাপ লেগেছে।
তিনি আরও বলেন, তখন এক কথা-দুই কথা হতে হতে বিষয়টা বড় পর্যায়ে চলে গেছে। এক পর্যায়ে সে তেড়ে এসে আমার শরীরে তার হাত স্পর্শ করছে। তখন হাসিব বাধা দিতে গিয়ে হাতাহাতি পর্যায়ে চলে গেছে। এতে হাসিবের চশমা ভেঙে গেছে, তার হাত কেটে গেছে। তার ফোন পুরোটা ডেড হয়ে গেছে।
শাহপরান হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. ইফতেখার আহমেদ বলেন, এখানে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। কাউকে মারার জন্য মদদও দেইনি। হলের সমস্যা নিয়ে কোনো শিক্ষার্থী অভিযোগ করলে আমি আমার রুমে ডেকে তার সঙ্গে কথা বলে সমাধান করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থী আমার কাছে সমান।
এদিকে শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনায় রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক খায়রুল ইসলামের বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। কর্মসূচি থেকে ঘটনার প্রতিবাদ এবং অভিযুক্তদের বিচারের দাবি জানানো হয়। রাত সাড়ে ৩টায় উপাচার্য তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত করে ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন।
ইতোমধ্যে সামাজিক অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিনকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কমিটির বাকি দুই সদস্য হলেন, বিজয় ২৪ হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক আ ফ ম জাকারিয়া ও সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক মো. বেলাল হোসেন সিকদার। কমিটিকে আগামী তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য বলা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক খায়রুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি নিয়ে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। ঘটনার যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা হবে।
এসএইচ জাহিদ/এসজেডএইচ/জেআইএম








