ইরানের মরহুম আধ্যাত্মিক নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন ৯ জুলাই শেষ হয়েছে। প্রায় ৪ কোটি মানুষ অর্থাৎ ইরানের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক তাকে শেষ বিদায় জানাতে সমবেত হয়েছিল। বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধি তেহরানে মিলিত হয়। তারা তার প্রতি সম্মান জানাতে সেখানে উপস্থিত হয়। এ থেকে বোধগম্য, ইরানের ইসলামি শাসনের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্য দুনিয়া এতকাল ধরে যে মিথ্যাচার করে এসেছে, তা মূলত ইরানকে হেয় করার লক্ষ্যে। বস্তুত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা এবং ইসরাইল যে সামরিক অভিযান শুরু করে, সেখানে আমেরিকা অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল এ বিশ্বাস নিয়ে যে, ইরানের ইসলামি সরকার জনসমর্থনহীন। ইরান তাসের দেশ। একটু ধাক্কা দিলেই সে ধসে পড়বে। এরপর মোল্লাশাসিত সরকারের বিরুদ্ধে জনগণ বিদ্রোহ করবে। এভাবে সরকারের আকাঙ্ক্ষিত পতন নিশ্চিত হবে। অথচ ঘটল এর বিপরীত। মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় ইরান ভেঙে পড়েনি। গোটা জাতি ওই অযাচিত এবং অতর্কিত হামলাকে দৃঢ়তার সঙ্গে প্রতিরোধ করে। আজ ইরান অনেক বেশি আত্মপ্রত্যয়ী এবং শক্তিশালী।
আলী খামেনির মৃত্যুকে ঘিরে শোকার্ত পরিবেশ শেষ না হতেই আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করা তিনটি জাহাজের ওপর ইরানের বিপ্লবী ইসলামিক গার্ড ড্রোন হামলা চালায়। ওই জাহাজগুলোর একটি সৌদি তেলবাহী জাহাজ। অন্য দুটির মধ্যে একটি কাতারের তরলীকৃত গ্যাসবাহী জাহাজ। বাকিটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের মালিকানাধীন। এ ঘটনার পর আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ আনে। তারপর ইরানের খারগ দ্বীপসহ অন্য ৮০টি লক্ষ্যবস্তুর ওপর আঘাত হানে। একইসঙ্গে আমেরিকা ইরানের তেল রপ্তানির ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এ নিষেধাজ্ঞা আমেরিকা তুলে নিয়েছিল যুদ্ধবিরতির পর স্বাক্ষরিত ‘মেমোরেন্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ে’র শর্ত মেনে নিয়ে।
সব মিলিয়ে পারস্য উপসাগর আবার অশান্ত হয়ে উঠেছে। সেখানে পুরো মাত্রায় যুদ্ধের আশঙ্কা বেড়ে গেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের খবরে প্রকাশ, ইরান বাহরাইন ও কুয়েতে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। বাহরাইনের ৫ম নৌবহরের ঘাঁটি এবং কুয়েতের আলী আল সালেম বিমান ঘাঁটি আক্রমণ করেছে। এতে করে সেখানকার মার্কিন সামরিক প্রতিস্থাপনার প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রত্যুত্তরে আমেরিকা কোনো তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়নি। কিন্তু সে যদি ইরানের বিরুদ্ধে আরও জোরাল আক্রমণ চালায়, তাহলে ইরান হয়তোবা বাধ্য হবে জর্ডানের সামরিক বিমানঘাঁটিতে হামলা চালাবে। স্মরণ করতে পারি, জর্ডানের বিমানবন্দরে হামলা চালিয়ে ইরান আমেরিকার বেশ কয়েকটি বি-৩৫ যুদ্ধবিমান ধ্বংস করে দিয়েছিল। পারস্য উপসাগরের উত্তেজনাকর এ পরিস্থিতির বাইরে সবচেয়ে উদ্বেগকর পরিস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে দক্ষিণ লেবাননে। সেখানে ইসরাইল যুদ্ধবিরতির কোনো শর্ত পালন করছে না। আমেরিকাও ইসরাইলকে শর্ত পালনে বাধ্য করছে না। অথচ মার্কিন-ইরানি স্বাক্ষরিত ‘মেমোরেন্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ে’ সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ আছে, ইসরাইল দক্ষিণ লেবানন থেকে তার সৈন্য প্রত্যাহার করবে। সবকিছু মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এবং সেই অর্থে বিশ্ব রাজনীতি এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে ধারণা করি। এটি এখন অনেকটা সুস্পষ্ট, ইরান আমেরিকা স্বাক্ষরিত ‘মেমোরেন্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ এখন মৃতপ্রায়।
তবে এ পরিস্থিতির জন্য এককভাবে দায়ী আমেরিকা। আমেরিকা যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল অনেকটা বাধ্য হয়ে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নানা কারণে তার অবস্থা নাজুক প্রমাণিত হয়। যুদ্ধবিরতির পর ইরানের সঙ্গে আমেরিকা ‘মেমোরেন্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ স্বাক্ষর করে। তবে ‘মেমোরেন্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ে’র অনুচ্ছেদগুলো নিয়ে সে স্বস্তি অনুভব করেনি। সে কারণে নানাভাবে ওই দলিলকে সে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করতে শুরু করে। ওই মেমোরেন্ডামের পঞ্চম অনুচ্ছেদে সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কীভাবে সম্পন্ন হবে, তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে ইরান, অন্য কোনো দেশ নয়। অথচ এ শর্ত ভঙ্গ করে আমেরিকা হরমুজ প্রণালি দিয়ে তার জাহাজ চালিয়েছে। উল্লেখিত ওই তিনটি জাহাজ ইরানের অনুমতি না নিয়েই হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করছিল।
এ থেকে সুস্পষ্ট, ‘মেমোরেন্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ স্বাক্ষর করা সত্ত্বেও আমেরিকা হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের পূর্ণ কর্তৃত্ব মেনে নেয়নি। আমেরিকা বর্তমানে যে কৌশল অনুসরণ করছে, সেটি হচ্ছে ভবিষ্যৎ কোনো সংঘর্ষে ইরান যেন হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে আমেরিকার ওপর কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করতে না পারে। সে কারণে আমেরিকা ওমান উপকূলঘেঁষে বিকল্প পথ তৈরি করে জাহাজ চলাচলের সুযোগ তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তুরস্কে অনুষ্ঠিত ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলন থেকে ইতোমধ্যে একটি ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি ইরানকে যুদ্ধবিরতির শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ তুলেছেন। তিনি জানাচ্ছেন, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি এখন অকার্যকর। তবে তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা বন্ধ হবে না।
হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য আমেরিকার ইচ্ছা অনুযায়ী উন্মুক্ত রাখা তার জন্য অত্যন্ত জরুরি। আমেরিকা পছন্দ করছে না ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এ নিয়ন্ত্রণ ইরানকে যে কৌশলগত সুবিধা এনে দিয়েছে, সে সম্পর্কে ইতোমধ্যে উল্লেখ করেছি। কিন্তু তার পাশাপাশি আরও যে ব্যাপারে আমেরিকা উদ্বিগ্ন, সেটি হচ্ছে, তার তেল সংকট। এটি এখন সুবিদিত যে, আমেরিকার তেল রিজার্ভ প্রায় নিঃশেষ হওয়ার পথে। তার অস্ত্র ভান্ডারও শেষ হওয়ার পথে। হরমুজ প্রণালি পূর্ণ অর্থে খোলা না থাকার কারণে আমেরিকায় মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছে। শ্রমিক ছাঁটাই চলছে। মধ্য আমেরিকার কৃষি খামারের মালিকরা পর্যাপ্ত সার এবং অন্যান্য কৃষিপণ্য সস্তা দামে না পেয়ে ট্রাম্পের প্রতি তাদের উষ্মা প্রকাশ করছে। এতে করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ভাটা নেমেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য এসবই উদ্বেগকর বিষয়, যদি নভেম্বর মাসের অন্তর্বর্তী নির্বাচনের কথা মাথায় রাখি।
তবে এসবের বাইরে আমি অন্য একটি দিকের ওপর আলোকপাত করতে চাই। সন্দেহ নেই মরহুম আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফনকে কেন্দ্র করে ইরানের প্রতি বিশ্বব্যাপীর অভূতপূর্ব সমবেদনার বহিঃপ্রকাশ লক্ষ করা গেছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয়, ইরানের প্রতি গ্লোবাল সাউথের সমর্থন বৃদ্ধি পেয়েছে। ভূরাজনীতি অত্যন্ত জটিল একটি বিষয়। সেই জটিলতার দিক থেকে যদি বিচার করি, তাহলে কয়েকটি দিক এখানে আলোচনার অপেক্ষা রাখে। লক্ষণীয়, যেসব দেশ তেহরানে তাদের প্রতিনিধি পাঠিয়েছে, তাদের মধ্যে বিশেষ করে পাকিস্তান এবং রাশিয়ার কথা উল্লেখ করা জরুরি। রাশিয়া দিমিত্রি মেদভেদেভকে পাঠিয়ে ইরানের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা আবারও জানিয়ে দিয়েছে। মেদভেদেভ রাশিয়ার শক্তিশালী সিকিউরিটি কাউন্সিলের ডেপুটি চেয়ারম্যান, রাশিয়ার এক সময়কার প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রী। অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং সামরিক বাহিনীর প্রধান আসিফ মুনির এ দাফন প্রক্রিয়ায় যোগ দিয়েছেন। অন্যদিকে চীন কোনো শক্তিশালী প্রতিনিধি পাঠায়নি। চীনের প্রতিনিধিত্ব করেছে চীনা পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার।
চীনের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক যথেষ্ট ঘনিষ্ঠ। কিন্তু তারপরও সেখানে উত্তেজনা বা ভুল বোঝাবুঝি যে নেই, তা নয়। ২০২১ সালের মার্চ মাসে ইরান ও চীন ২৫ বছরমেয়াদি একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। সেই চুক্তি অনুযায়ী, ইরান চীনকে ভর্তুকি মূল্যে তেল সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দেয়। অন্যদিকে, চীন ইরানের অবকাঠামো নির্মাণে, বিশেষ করে টেলিযোগাযোগ, ব্যাংকিং খাত, নৌবন্দর এবং রেললাইন তৈরিতে ৪০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার অঙ্গীকার করে। এ পর্যন্ত চীন মাত্র ২৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। বাকিটা বিনিয়োগের অপেক্ষায় আছে। কী কারণে এ পরিস্থিতির উদ্ভব হলো, সেখানে কোনো ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছিল কিনা, জানা কঠিন। কিন্তু সাম্প্রতিককালের যুদ্ধে ইরানের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম নয়। সে কারণে তার অবকাঠামো গড়ে তোলা, ব্যাংক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে স্থায়িত্ব আনা এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা ইরানের ভবিষ্যৎ অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য।
আগামী দিনগুলো ইরানের অর্থনীতির পুনর্গঠনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। প্রতিরক্ষার দিক থেকে ইরান রাশিয়া থেকে প্রচুর সাহায্য পেয়েছে। বস্তুত রাশিয়া ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে উন্নত করার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ৫০টি অত্যাধুনিক সুখোই ৩০ পাঠানোর চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। তবে যেটি বাকি আছে, সেটি হচ্ছে, ইরানের অর্থনীতির পুনর্গঠন। পশ্চিমা বিশ্ব আরোপিত নিষেধাজ্ঞা থেকে বের করে আনা এবং অর্থনীতিকে চাঙা করা ইরানের জন্য একটি আশু সমস্যা। এ ক্ষেত্রে রাশিয়ার চেয়ে চীন অনেক বেশি সক্ষমতা রাখে বলে ধারণা করি। মোট কথা, ইরানকে আরও বেশি করে রুশ-চীন ব্রিকস বলয়ে অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। সে ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে যদি কোনো দোদুল্যমানতা দেখা দেয়, তাহলে সেটি কেবল অনভিপ্রেত নয়, বরং অত্যন্ত আত্মঘাতী বলে প্রমাণিত হতে পারে।
সবশেষে, হরমুজ প্রণালি বর্তমানে অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি ভৌগোলিক জায়গা। গোটা পৃথিবী এর ওপর নির্ভরশীল। ফলে, ইরান যদি অযাচিতভাবে তাকে তার মর্জি অনুযায়ী কখনো খোলা, কখনো বন্ধ রাখে, তাহলে বিশ্ব জনমত ইরানের বিরুদ্ধে গেলেও যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে যে কৌশলগত সুবিধাজনক অবস্থানে ইরান বর্তমানে আছে, সেই অবস্থান সে হারাতে পারে। আগামী দিনগুলোতে ইরানকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে হরমুজ কার্ড ব্যবহার করতে হবে বলে ধারণা করি।
ড. বদরুল আলম খান : অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক








