দেশে কিশোরী মাতৃত্বের হার আবারও ঊর্ধ্বমুখী। পাঁচ বছরের ব্যবধানে ১৫-১৯ বছর বয়সী প্রতি হাজার কিশোরীর মধ্যে জীবিত সন্তান জন্মদানকারী মেয়ের হার ৮৩ থেকে বেড়ে ৯২-এ পৌঁছেছে। বাল্যবিবাহের ধারাবাহিকতায় দ্রুত সন্তান নেওয়ার পারিবারিক ও সামাজিক প্রত্যাশা এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার সীমিত সুযোগ তাদের উচ্চঝুঁকির মাতৃত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে বাড়ছে মৃত বা অপরিণত শিশু প্রসব, মা ও শিশুর অসুস্থতা, অপুষ্টি ও মৃত্যুঝুঁকি।
কিশোরী জন্মহার বলতে এক বছরে ১৫-১৯ বছর বয়সী প্রতি ১ হাজার কিশোরীর মধ্যে কতজন মেয়ে জীবিত সন্তানের জন্ম দিয়েছে, সেই সংখ্যাকে বোঝায়।
বাংলাদেশের শিশু ও নারীদের ওপর পরিচালিত নিয়মিত জরিপ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫-এর প্রাথমিক ফলাফল গত নভেম্বরে প্রকাশ করে জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। জরিপে দেখা গেছে, দেশে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী ২৩ দশমিক ২ শতাংশ কিশোরী এরই মধ্যে সন্তানের জন্ম দিয়েছে। তাদের মধ্যে ১ দশমিক ২ শতাংশ ১৫ বছর বয়সের আগেই মা হয়েছে। আর ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ২২ শতাংশই ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে প্রথম সন্তানের জন্ম দিয়েছে।
বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৮ বছর বয়সের আগে জীবিত সন্তানের জন্মদানের হার সবচেয়ে বেশি রাজশাহী বিভাগে, ২৯ শতাংশ। এরপর রংপুরে ২৮, খুলনায় ২৭, ময়মনসিংহে ২৪, বরিশালে ২৩, ঢাকায় ২২, চট্টগ্রামে ১৯ এবং সিলেটে ৯ শতাংশ। ১৫ বছর বয়সের আগেই মাতৃত্বের হারও সর্বোচ্চ রংপুর ও রাজশাহীতে, ২ শতাংশ।
১৫-১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের সন্তান জন্মদানের হার ২০১৯ সালেও ছিল প্রতি হাজারে ৮৩, বর্তমানে তা ৯২। অর্থাৎ প্রতি ১ হাজার কিশোরী মায়ের মধ্যে ৯২ জন জীবিত সন্তান প্রসব করছে।
বিভাগভেদে রংপুরে এ হার সর্বোচ্চ প্রতি হাজারে ১১১ এবং সিলেটে সর্বনিম্ন প্রতি হাজারে ৫০।
প্রজনন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিশোরী মাতৃত্ব শুধু জনস্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়; এটি শিক্ষা, দারিদ্র্য, লৈঙ্গিক বৈষম্য ও সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। অল্প বয়সে মাতৃত্ব প্রসবজনিত জটিলতা, মৃত প্রসব, অপরিণত ও কম ওজনের শিশুর জন্ম এবং মা ও নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়।
বাল্যবিবাহের চক্র
জরিপে কিশোরী মাতৃত্বের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বাল্যবিবাহ। এমআইসিএস ২০২৫ অনুযায়ী, দেশে এখনো ৫৬ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হচ্ছে ১৮ বছরের আগে। বিভাগভিত্তিক হিসাবে রাজশাহীতে বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি, ৬৭ শতাংশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, ‘বাল্যবিবাহের পর আমাদের সমাজে দ্রুত মা হওয়ার জন্য পারিবারিক ও সামাজিক চাপ তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে কিশোরীকে সন্তান জন্মদানের সক্ষমতা প্রমাণ করতে হয়। একজন নারীর কখন সন্তান নেওয়া উচিত, এ জন্য শারীরিকভাবে সে প্রস্তুত কি না, এসব বিষয়ে যথাযথ পরামর্শ বা সহায়তার ব্যবস্থা নেই।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোভিড-১৯ মহামারির পর অনেক পরিবারের অর্থনৈতিক সংকট তীব্রতর হওয়ায় কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।
কিশোরী মাতৃত্বের পেছনে বাল্যবিবাহ ছাড়াও জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারে সীমিত প্রবেশাধিকার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার অভাবও বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। প্রতি চার-পাঁচ বছর পর প্রকাশিত স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে বড় জরিপ বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস) ২০২২-এ বলা হয়েছে, দেশে পরিবার পরিকল্পনার মোট চাহিদা প্রায় ৭৪ শতাংশ। এর মধ্যে ৬৪ শতাংশ জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে পূরণ হচ্ছে। ১০ শতাংশ চাহিদা এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে। এর মধ্যে ১৫-১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের ক্ষেত্রে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির মোট চাহিদা ৬৭ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ কিশোরীর মধ্যে ৩৩ জনের জন্মনিয়ন্ত্রণের কোনো চাহিদা নেই। চাহিদা থাকা ৬৭ শতাংশের মধ্যেও প্রায় ১৩ শতাংশের চাহিদা অপূর্ণ। অর্থাৎ তারা জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি চাইলেও পাচ্ছে না বা ব্যবহার করতে পারছে না। ফলে কার্যত ৫৪ শতাংশ কিশোরী এ পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারছে। প্রায় ৪৬ শতাংশ এর বাইরে রয়ে গেছে।
জনসংখ্যাবিদেরা বলছেন, এই পরিসংখ্যান শুধু স্বাস্থ্যসেবার সীমিত প্রাপ্যতার বিষয় নয়, বরং সামাজিক ও পারিবারিক ক্ষমতার কাঠামোর প্রতিফলনও বটে। গর্ভধারণের সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রে কিশোরীদের স্বামী বা পরিবারের অন্য সদস্যরাই নেন। গত বছর তিনেক সময়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর মজুত সংকটও কিশোরীসহ অনেক নারীর জন্য পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারে বাড়তি বাধা তৈরি করেছে।
ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, ‘অল্প বয়সে বিয়ে হওয়া মেয়েরা সাধারণত পরিবার ও স্বামীর সিদ্ধান্তে গর্ভধারণ করে। মাতৃত্বের ঝুঁকি, নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকি কিংবা অপুষ্টির প্রভাব সম্পর্কে তাদের পর্যাপ্ত ধারণা থাকে না।’
বিডিএইচএস ২০২২ জরিপ অনুযায়ী, সব বয়সী নারীর মধ্যে ৩ শতাংশ গর্ভধারণের জন্য চাপ অনুভব করেছে। কিশোরীদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় দ্বিগুণ, ৬ শতাংশ।
মাঠপর্যায়ের পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক পরিবারে বিয়ের পরপরই সন্তান নেওয়াকে নারীর গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ড হিসেবে দেখা হয়। অনেক কিশোরী স্ত্রী জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে জানলেও স্বামীর অনুমতি, পারিবারিক বাধা এবং সামাজিক প্রত্যাশার কারণে তা ব্যবহার করতে পারে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোরী গর্ভধারণ শুধু ব্যক্তিগত বা স্বাস্থ্যগত বিষয় নয়; এটি সামাজিক প্রত্যাশা, পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ, বাল্যবিবাহ, লৈঙ্গিক বৈষম্য এবং নারীর সীমিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার সম্মিলিত ফল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক হাসান এ শাফি বলেন, ‘বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় বিয়ের পরপরই সন্তান নেওয়ার চাপ অল্পবয়সী মেয়েদের ক্ষেত্রে আরও তীব্র। তাদের শরীর মাতৃত্বের জন্য প্রস্তুত কি না, সেটি অনেক ক্ষেত্রে বিবেচনায় আসে না। পাশাপাশি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও অনেক কিশোরীর থাকে না।’
বিশেষজ্ঞরা বলেন, কিশোরী বয়সে গর্ভধারণ দীর্ঘ মেয়াদে নারীর শারীরিক, মানসিক ও প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। সাধারণত ২০ বছর বয়সের আগে নারীর শরীর সম্পূর্ণভাবে প্রজনন ও প্রসবের জন্য প্রস্তুত হয় না। এ বয়সে তলপেট থেকে ঊরুর ওপর পর্যন্ত অংশের কাঠামো পুরোপুরি বিকশিত না হওয়ায় গর্ভধারণ ও প্রসবকালীন জটিলতার ঝুঁকি বেশি থাকে। ফলে কিশোরী মায়েদের মধ্যে প্রসব-বাধা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও জরুরি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয়তা তুলনামূলকভাবে বেশি।
ডব্লিউএইচও বলছে, ১৫-১৯ বছর বয়সে গর্ভধারণের ফলে এক্লাম্পসিয়া (খিঁচুনি), প্রসব-পরবর্তী জরায়ু সংক্রমণসহ অন্যান্য প্রসবজনিত জটিলতার ঝুঁকি ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের তুলনায় বেশি। একই সঙ্গে কিশোরী মায়েদের সন্তানদের ক্ষেত্রে কম ওজন নিয়ে জন্ম, সময়ের আগে জন্ম, নবজাতকের গুরুতর জটিলতা এবং মৃত প্রসবের আশঙ্কাও বেশি থাকে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিজ্ঞান সাময়িকী জার্নাল অব গ্লোবাল হেলথে গত মার্চে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বাংলাদেশের আটটি জেলা হাসপাতালের চিত্র তুলে ধরা হয়। এতে হাসপাতালগুলোতে হওয়া ১৫ হাজার ৫২৯টি প্রসব বিশ্লেষণ করা হয়, যার ৪ শতাংশ ছিল মৃত প্রসব। মায়ের বয়স ও প্রসব-পূর্ব সেবার ঘাটতিকে মৃত প্রসবের অন্যতম প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ব্রিটিশ গবেষণাটিতে।
বাংলাদেশ পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ‘প্রসব-পূর্ব সেবার ঘাটতি, অপুষ্টি, অপ্রাতিষ্ঠানিক, অদক্ষ হাতে প্রসবসহ বিভিন্ন সূচক কিশোরী গর্ভধারণকে এখনো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ করে রেখেছে। বাংলাদেশ এই ঝুঁকির চক্র থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি। সামাজিক কাঠামোর মধ্যেও নারীর যথাযথ মূল্যায়নের ঘাটতি রয়েছে। বিয়ে, গর্ভধারণ এবং জন্মনিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে নারীর মতামত যথাযথ গুরুত্ব পায় না।’








