একসময় বলিউড সিনেমায় খলনায়ক মানেই ছিল ভয়, রোমাঞ্চ আর নাটকীয়তা। অনেক ক্ষেত্রে নায়ককে ছাপিয়ে দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছে এসব চরিত্র। অমরিশ পুরি, প্রেম চোপড়া, আমজাদ খান, শক্তি কাপুর কিংবা গুলশান গ্রোভারের মতো অভিনেতারা উপহার দিয়েছেন অসংখ্য কালজয়ী চরিত্র।

সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে অনেক কিছু। খলনায়কদের মধ্যে কেউ কেউ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, কেউ এখনো অভিনয় করে যাচ্ছেন, আবার কেউ বেছে নিয়েছেন ভিন্ন পথ। ভারতীয় সিনেমার খলনায়কদের নিয়ে এই প্রতিবেদন—

অমরিশ পুরি: মোগাম্বো আজও অমর

ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় খলনায়কদের একজন অমরিশ পুরি। ‘মিস্টার ইন্ডিয়া’ সিনেমায় ‘মোগাম্বো’ চরিত্র তাকে কিংবদন্তির আসনে বসিয়েছে। এছাড়া ‘নাগিনা’, ‘করন অর্জুন’, ‘ঘায়াল’ ও ‘নায়ক’ সিনেমায় তার অভিনয় আজও দর্শক মনে গেঁথে আছে। ২০০৫ সালের ১২ জানুয়ারি, মারা যান তিনি। তবে তার গম্ভীর কণ্ঠ, অভিনয় আর বিখ্যাত সংলাপ ‘মোগাম্বো খুশ হুয়া’ এখনো বলিউডের সবচেয়ে জনপ্রিয় সংলাপগুলোর একটি।

আমজাদ খান: গব্বরের প্রভাব আজও অটুট

‘শোলে’ সিনেমায় ‘গব্বর সিং’ চরিত্রে অভিনয় করে অমর হয়ে আছেন আমজাদ খান। এই একটি চরিত্রই হিন্দি সিনেমার খলনায়ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিল। ১৯৯২ সালের ২৭ জুলাই, তিনি মারা গেলেও গব্বরের জনপ্রিয়তা সময়ের সঙ্গে আরো বেড়েছে। তার ছেলে শাদাব খানও বিভিন্ন সময় বাবার প্রভাব এবং মৃত্যুর পর পরিবারের সংগ্রামের কথা জানিয়েছেন।

প্রেম চোপড়া: বয়স হলেও সম্মান অটুট

মার্জিত কিন্তু ভয়ংকর খলচরিত্রের জন্য পরিচিত প্রেম চোপড়া এখনো বলিউডের অন্যতম স্টাইলিশ ভিলেন হিসেবে সমাদৃত। চরিত্রাভিনেতা হিসেবে ‘অ্যানিম্যাল’ ও ‘শোটাইম’-এর মতো সিনেমায় কাজ করেছেন। ২০২৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘হাম মেঁ শাহেনশাহ কৌন’ সিনেমায়ও অভিনয় করেছেন তিনি। সম্প্রতি শারীরিক অসুস্থতার পর তার পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সফলভাবে হার্টের একটি অস্ত্রোপচার হয়েছে এবং তিনি সুস্থ হয়ে উঠছেন।

রণজিৎ: ভয়ংকর ভিলেন থেকে নস্টালজিয়া মুখ

সত্তর ও আশির দশকে রণজিৎ ছিলেন বলিউডের সবচেয়ে ভয়ংকর মুখগুলোর একটি। এখন তাকে বেশি দেখা যায় বিভিন্ন সাক্ষাৎকার, জনসমাগম কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নস্টালজিক পোস্টে। সম্প্রতি অভিনেত্রী বিন্দুর সঙ্গে কাজের স্মৃতি ভাগ করে নিয়ে নিজের এক ভিন্ন, কোমল দিকও তুলে ধরেন এই তারকা।

গুলশান গ্রোভার: ‘ব্যাড ম্যান’ এখনো সক্রিয়

‘ব্যাড ম্যান’ পরিচয়কে নিজের ব্র্যান্ডে পরিণত করেছেন গুলশান গ্রোভার। ‘রাম লক্ষ্মণ’, ‘অবতার’, ‘আঁখে’ ও ‘রাজা বাবু’সহ অসংখ্য সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে ‘চার্লি চোপড়া’ ও ‘হীর এক্সপ্রেস’-এর মতো সিনেমায় কাজ করেছেন। ২০২৫ সালে তিনি বলেছিলেন, “বিশ্বাসযোগ্য একজন খলনায়ক হয়ে ওঠা মোটেও সহজ নয়।”

শক্তি কাপুর: ভিলেন থেকে কমেডি তারকা

‘কুরবানি’ ও ‘হিরো’-এর মতো সিনেমায় খলনায়ক হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করলেও পরে কমেডি চরিত্রেও সমান জনপ্রিয়তা পান শক্তি কাপুর। এখনো অভিনয়ে সক্রিয় তিনি। ‘শুটিয়াপা’ ও ‘প্রেম কি শাদি’-এর মতো সিনেমায় তার নাম রয়েছে। মেয়ে শ্রদ্ধা কাপুরের সাফল্যের কারণেও কাপুর পরিবার নিয়মিত আলোচনায় থাকে।

ড্যানি, আশুতোষ রানা ও প্রকাশ রাজ

‘অগ্নিপথ’ ও ‘ঘাতক’-এর অভিনেতা ড্যানি ডেনজংপা এখন বেছে বেছে কাজ করেন। তার সাম্প্রতিক কাজের মধ্যে রয়েছে ‘উঁচাই’ ও ‘জয় দেবা’। ‘দুশমন’ ও ‘সংঘর্ষ’খ্যাত আশুতোষ রানা এখনো সিনেমা ও মঞ্চনাটকে অভিনয় করছেন। ‘হামারে রাম’ তার সাম্প্রতিক কাজগুলোর একটি। অন্যদিকে, প্রকাশ রাজ এখনো হিন্দি, তামিল, তেলেগু ও কন্নড় চলচ্চিত্রে সমানভাবে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

প্রাণ: ভদ্রলোক খলনায়কের প্রতীক

গব্বর বা মোগাম্বোর আগেই হিন্দি সিনেমায় ভয়ংকর খলনায়কের প্রতীক ছিলেন প্রাণ। ‘মধুমতী’, ‘রাম আউর শ্যাম’, ‘জঞ্জির’ ও ‘ডন’ সিনেমায় তার অভিনয় আজও অনুকরণীয়। পরে তিনি ইতিবাচক ও চরিত্রাভিনেতার ভূমিকাতেও সফল হন। ২০১৩ সালের ১২ জুলাই মারা যান তিনি। একই বছর ভারতীয় সিনেমায় অসামান্য অবদানের জন্য তাকে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার দেওয়া হয়।

অজিত খান: স্টাইলিশ ভিলেনের নতুন সংজ্ঞা

সত্তর দশকে বলিউডে এক ভিন্ন ধরনের খলনায়ক হিসেবে পরিচিতি পান অজিত খান। তার বিখ্যাত সংলাপ ‘মোনা ডার্লিং’ একসময় সাংস্কৃতিক আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে। হামিদ আলী খান নামে জন্ম নেওয়া এই অভিনেতা ২০০টির বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন। ১৯৯৮ সালের ২২ অক্টোবর মারা যান তিনি।

মুকেশ ঋষি: এখনো ব্যস্ত

‘ঘাতক’, ‘সরফরোশ’ ও ‘সূর্যবংশম’-এর মতো সিনেমায় শক্তিশালী খলচরিত্রে অভিনয় করে পরিচিতি পান মুকেশ ঋষি। তার গম্ভীর কণ্ঠ, সুঠাম গড়ন ও পর্দার উপস্থিতি তাকে খলনায়কের চরিত্রে আলাদা পরিচিতি দেয়। বর্তমানে হিন্দির পাশাপাশি তেলেগু, পাঞ্জাবি, তামিল, কন্নড়, মালায়ালাম ও মারাঠি ভাষার সিনেমায়ও নিয়মিত অভিনয় করছেন। ২০২৫ ও ২০২৬ সালের কয়েকটি নতুন প্রজেক্টেও তার নাম রয়েছে।

আশিস বিদ্যার্থী: ভিন্ন ধারার খলনায়ক

আশিস বিদ্যার্থী তার বুদ্ধিদীপ্ত ও অনিশ্চিত খলচরিত্রের জন্য পরিচিত। ‘দ্রোহকাল’, ‘ইস রাত কি সুবহ নেহি’, ‘সোলজার’ এবং দক্ষিণ ভারতীয় বহু সিনেমায় অভিনয় করে আলাদা অবস্থান তৈরি করেছেন তিনি। বর্তমানে অভিনয়ের পাশাপাশি মোটিভেশনাল বক্তা এবং খাবারবিষয়ক ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা হিসেবেও পরিচিত। খলনায়কের গণ্ডি পেরিয়েও দর্শকের মনে নিজের জায়গা ধরে রাখতে পেরেছেন আশিস।

বদলে গেছে খলনায়কের সংজ্ঞা

সময়ের সঙ্গে বলিউডে খলনায়কের উপস্থাপনাও বদলেছে। একসময় যেসব অভিনেতা পর্দায় দর্শকের মনে ভয় তৈরি করতেন, আজ তারা সম্মানিত কিংবদন্তি। কেউ অবসরে, কেউ প্রয়াত, আবার কেউ এখনো অভিনয়ে সক্রিয়। তবে তাদের বয়স, সময় কিংবা অনুপস্থিতি—কোনোটিই তাদের সৃষ্টি করা চরিত্রগুলোর প্রভাব কমাতে পারেনি।

*মানি কন্ট্রোল অবলম্বনে