জীবিকার সন্ধানে আট মাস আগে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে নীলফামারী থেকে কুমিল্লা নগরীতে আসেন রিকশাচালক শরীফুল ইসলাম। মঙ্গলবার রাতে চলমান ফুটবল বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচ ঘিরে দ্বন্দ্বে তাকে স্ত্রী এবং দুই মেয়ের সামনে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ওই ম্যাচে মিসরকে সমর্থন দেওয়ায় তাকে আর্জেন্টিনা সমর্থকরা ক্ষুব্ধ হয়ে হত্যা করে বলে জানা গেছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দুই মেয়েকে নিয়ে ঘোর অন্ধকারে পড়েছেন শরীফুলের স্ত্রী বিউটি বানু।

ঘটনার প্রায় তিন দিন পার হলেও হলেও মামলা করতে পারেনি দরিদ্র পরিবারটি। দুই বেলা ভাতের জোগাড় দিতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে পরিবারটির। ভুক্তভোগীর পরিবারের দারিদ্র্যতার সুযোগে ঘাতকরা পার পেয়ে যেতে পারে বলে শঙ্কা রয়েছে।

বিউটি বানু বলেন, কী নিয়ে কোথায় গিয়ে বিচার চাইব? আমার তো সন্তানদের নিয়ে দুই বেলা ভাত খাওয়াই কঠিন হয়ে পড়বে। এখানে শত শত মানুষ উল্লাস করল। মাঝখানে আমার নিরীহ স্বামীকে তারা পিটিয়ে হত্যা করল। এর বিচার পাব বলে আমার মনে হয় না। তিন দিন হয়ে গেল পুলিশও আমাদের কোনো খোঁজখবর নেয়নি।

শরীফুলের আত্মীয় আবুল কালাম বলেন, এমন ঘটনায় হতবাক সবাই। আমরা গরিব বলে আমাদের সঙ্গে এমন ঘটনা হলো। অনেক মানুষ দেখেছে কেউ বাধা দেয়নি। মানুষের অবয়বে আমাদের মধ্যে অনেক হায়েনারা বাস করে।

জানা গেছে, নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার উত্তর চেরাংগা এলাকার মতিউর রহমানের ছেলে শরীফুল। এলাকায় কাজ না পেয়ে স্ত্রী বিউটি, দুই মেয়ে শরীফা আক্তার ও আকলিমা আক্তারকে নিয়ে ৪৬০ কিলোমিটার দূরত্বের কুমিল্লা নগরীতে আসেন। রিকশা চালিয়ে মটপুষ্কুরনী এলাকায় দুই কক্ষের বাসায় ভাড়া থাকতেন।

স্থানীয়রা জানান, মঙ্গলবার রাতে শহরতলীর ধনপুর এলাকায় বড় পর্দায় আর্জেন্টিনা-মিসরের ম্যাচ দেখতে ভিড় জমে শতাধিক মানুষের। বাসার পাশে হওয়ায় সবার মতো শরীফুলও সেখানে খেলা দেখতে যান। খেলার উত্তেজনায় সেও উল্লসিত হয়। মিসরকে সমর্থন করায় শরীফুলের উল্লাস ভালো লাগেনি গুটিকয়েক আর্জেন্টিনা সমর্থকের। মিসর এক গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর কতিপয় আর্জেন্টিনার সমর্থক নিরীহ রিকশাচালককেই টার্গেট করে। তারা পিটিয়ে আহত করে শরীফুলকে। চিৎকার শুনে স্ত্রী-সন্তানরা দৌড়ে আসে তাকে রক্ষা করতে। তারা স্ত্রী-সন্তানদের সামনেই তাকে পিটিয়ে গুরুতর জখম করে। স্ত্রী-সন্তানরা তাকে উদ্ধার করে বাসায় নিয়ে যান। গুরুতর আহত হওয়ার পরও বিক্ষুব্ধ কয়েকজন আবারও মারতে তেড়ে যায় তার বাসায়। একপর্যায়ে সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, ভুক্তভোগীর পরিবার হয়তো লাশ দাফনের কাজে ব্যস্ত। তারা এখনো থানায় আসেননি। যখন আসবে, তখনই মামলা নেওয়া হবে। এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।