দেশে ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। সরকারি গুদামেও গড়ে তোলা হয়েছে পর্যাপ্ত মজুত। মূল্য সহনীয় রাখতে বাজেটে চালের শুল্ক-কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবু বাজারে কমছে না চালের দাম। বছরের পর বছর দৃশ্যমান মিলার সিন্ডিকেটে এক প্রকার অস্বস্তিকর অবস্থা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি এমন-হাড়ভাঙা পরিশ্রম ও ঘাম ঝরিয়েও ধানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না কৃষক। অথচ সেই ধান থেকেই চাল বিক্রিতে মোটা অঙ্কের মুনাফা করছেন অসাধু চক্র। মিলগেট থেকে পাইকারি হয়ে খুচরা বাজারে চালে দামের ব্যবধান করা হচ্ছে দ্বিগুণ। এতে দেশের মানুষ চড়ামূল্যে চাল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। অথচ সেই অর্থের ভাগ মিলছে না কৃষকের কপালে। যুগান্তরের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমন চিত্র।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, ধান থেকে উৎপাদিত চালের পাশাপাশি কুঁড়া, তুষ, খুদ ও ভাঙা চাল বিক্রি করেও বিপুল পরিমাণে অর্থ আয় করছেন মিলাররা। অথচ বাজারে চালের দামে তার কোনো প্রভাব নেই। এতে মাঠে কৃষক ও বাজারে ঠকছেন ভোক্তা। মাঝখানে ফুলেফেঁপে উঠছে সেই অতিমুনাফালোভী চক্র। এসবের অভিযোগ থাকলেও যেন কার্যকর কোনো পদক্ষেপে নেই।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য মতে (৫ জুলাই), বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকারিভাবে দেশে ধান, চাল ও গমের নিরাপদ মজুত গড়ে তোলা হয়েছে। সরকারি গুদামে মোট মজুত ২২ লাখ ৫২ হাজার ৮১৫ টন খাদ্যশস্য। এর মধ্যে ফ্লোটিং চাল ৪ হাজার ৭৭২ টনসহ মোট চালের মজুত গড়ে তোলা হয়েছে ১৭ লাখ ৯৫ হাজার ৯৬৯ টন। পাশাপাশি ধানের মজুত ৩ লাখ ৩১ হাজার ১৮৩ টন। সঙ্গে গম ১ লাখ ৯৩ হাজার ৩২৭ টন মজুত রাখা হয়েছে। এর পরও দেশের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে মিলাররা।
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ অঞ্চলের কৃষক আব্দুল আলিম যুগান্তরকে বলেন, এক বিঘা জমিতে ধান আবাদে বর্গাসহ ২৫ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়। সেখানে বর্গা খরচই দিতে হয় বছরে ১৫ হাজার টাকা। কীটনাশক কিনতে ব্যয় হয় ৩-৪ হাজার টাকা।
দিনমজুরদের দিতে হয় ৫০০০ টাকা। সেচে খরচ পড়ে ৩ হাজার টাকা। সবমিলে এক বিঘা জমিতে ধান আবাদে খরচ পড়ে যায় ২৫-২৭ হাজার টাকা। তবে বর্তমান বাজারে এক মন ধানে ২০০-৩০০ টাকা লোকসান দিয়ে ১১০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। মিলাররা সিন্ডিকেট করে ধানের বাজারে নৈরাজ্য করছে। আমরা কৃষকরা কষ্ট করে ঘাম ঝরিয়ে ধান আবাদ করলেও লাভ হচ্ছে না। আর সেখানে মিলাররা ধান নিয়ে চাল তৈরি করে অতিমুনাফা করছে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) তথ্য মতে, কৃষকরা এক মন ধান বিক্রি করছে ১০০০-১১০০ টাকা। এই এক মন ধান দিয়ে ২৫ কেজি চাল হয়। ৫০ কেজির ধানের মূল্য দাঁড়ায় ২২০০ টাকা। সেক্ষেত্রে মিল পর্যায়ে মিনিকেট নামের অবৈধ চাল বিক্রি হচ্ছে ৫০ কেজির বস্তা ৩৩০০ টাকা। দেখা যায় মিলাররা আনুসাঙ্গিক খরচ ও লাভ রেখে ৫০ কেজির বস্তায় ১১০০ টাকা বেশি দরে বিক্রি করছে। আর মিল পর্যায়ে ৩৩০০ টাকা বস্তা মিনিকেট পাইকারিতে ৩৪০০ ও খুচরায় ৪০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সেক্ষেত্রে কৃষক পর্যায়ের ধান থেকে মিলের চাল পাইকারি ও খুচরা পর্যায় হয়ে ক্রেতার কাছে প্রায় দ্বিগুণ দাম হয়ে যাচ্ছে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, কৃষক থেকে শুরু করে মিল, পাইকারি ও খুচরা মোট ৪ হাত ঘুরে ক্রেতার কাছে চাল পৌঁছায়। সেখানে ধান থেকে চাল উৎপাদন খরচ, পরিবহণ খরচ মিলে ২২০০ টাকার চাল সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকা বিক্রি করলে ক্রেতার ভোগান্তি পোহাতে হয় না। তবে মিল থেকেই বড় ব্যবধানে চাল বিক্রি হচ্ছে, আর পাইকারি ও খুচরায় এই দাম আরও বেড়ে যাচ্ছে। আর এই বাড়তি ব্যয়ের বোঝা ভোক্তাকেই বহন করতে হচ্ছে। যা নজরদারি করা দরকার।
তিনি জানান, চলতি অর্থবছরের বাজেটে চালসহ ৬৩টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর কমানো হলেও তার কোনো ইতিবাচক প্রভাব বাজারে দেখা যায়নি। বাজার তদারকি সংস্থাগুলোর কার্যকর নজরদারির অভাবে নিত্যপণ্যের বাজারে চালসহ অন্য পণ্যের মূল্য সহনীয় করা যাচ্ছে না। তাই অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
নওগাঁ, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলের মিল পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মিল পর্যায়ে নাজিরশাইল ২৫ কেজির বস্তা মাসের ব্যবধানে ২০০ টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা পাইকারি পর্যায়ে ২১০০ টাকা ও খুচরায় ২৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিআর ২৮ জাতের চাল মিল পর্যায়ে ৫০ কেজির বস্তায় ১০০ টাকা বাড়িয়ে বিক্রি হচ্ছে ২৬০০ টাকায়। পাইকারি পর্যায় এই চাল ২৭০০ ও খুচরায় বিক্রি হচ্ছে ৩২০০ টাকা।
কাওরান বাজারের আল্লাহর দান রাইস এজেন্সির মালিক সিদ্দিকুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, মিল পর্যায়ে সব ধরনের চালের দাম বেশি। মিল মালিক সিন্ডিকেট করে চালের দাম বাড়িয়ে রেখেছে। কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনলেও মিলাররা বাড়তি মুনাফা করে। মিল থেকে সেই চাল পাইকারি ও খুচরা পর্যায় যেতে প্রায় দ্বিগুণ দাম হয়ে যায়। যা দেশের সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হচ্ছে। তিনি জানান, হঠাৎ করেই মিল মালিকরা এক মাস ধরে পোলাও চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়েছে। ৫০ কেজির বস্তা পোলাও চাল মিলে বিক্রি হচ্ছে ৮ হাজার ৩০০ টাকা। যা এক মাস আগেও মিলে ৬৬০০ টাকা ছিল। যার ফলে এই চাল খুচরা পর্যায়ে ১৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। যা আগে ১৫০ টাকা ছিল। দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ৪০ টাকা।
জানতে চাইলে তদারকি সংস্থা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক পর্যায়ের এক ডজন কমকর্তা যুগান্তরকে বলেন, চালের বাজারে মূল্য সহনীয় রাখতে তদারকি অব্যাহত আছে। আমরা খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় রেখেও অভিযান পরিচালনা করি। সব মিলে মিল থেকে শুরু করে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে সমন্বিতভাবে অভিযান পরিচালনা করা হবে। অনিয়ম পেলে সঙ্গে সঙ্গে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।








