ডিজিটাল দুনিয়ায় এখন এক অদ্ভুত সময় চলছে। আপনার সোশ্যাল মিডিয়া টাইমলাইনে ভেসে ওঠা চমৎকার হাসিমুখের কোনো মানুষ কি আসলেই রক্ত-মাংসের, নাকি কোনো কম্পিউটারের সৃষ্টি, তা চট করে বোঝার উপায় নেই। এআইয়ের তৈরি ডিপফেক মুখগুলো এখন এতটাই বাস্তবসম্মত হয়ে উঠেছে যে সাধারণ মানুষের পক্ষে সেগুলোকে আসল মানুষের ছবি থেকে আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। স্টাইলজ্যান-৩-এর মতো অত্যাধুনিক এআই টুলগুলো এখন এতটাই নিখুঁত ছবি তৈরি করছে, খালি চোখে যেগুলোর আসল-নকলের পার্থক্য করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আগে এআইয়ের তৈরি ছবিতে বাড়তি আঙুল কিংবা অদ্ভুত কানের দুলের মতো ভুল বা ‘ভিজ্যুয়াল আর্টফ্যাক্ট’ দেখে নকল চেনা যেত। কিন্তু এআই এখন নিজের ভুল থেকে শিখে আরও নিখুঁত হয়ে উঠেছে। এই এআই-প্রতারণা চেনার উপায় কী—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সম্প্রতি এক গবেষণা চালিয়েছেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব অ্যাবারডিনের ড. ক্লেয়ার সাদারল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইমোশনস অ্যান্ড ফেসেস ল্যাবের পরিচালক অধ্যাপক অ্যামি ডাওয়েল। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও যুক্তরাজ্যের গবেষকদের নিয়ে গঠিত এই যৌথ দল একটি আশাবাদী তথ্য সামনে এনেছেন। তাঁরা বলছেন, সঠিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানুষের মস্তিষ্ককে এআইয়ের ফাঁদ ধরতে পারদর্শী করে তোলা সম্ভব। প্রধান গবেষক এবং সহযোগী অধ্যাপক অ্যামি ডাওয়েল বলেন, ‘আমাদের প্রশিক্ষণটি মানুষের মনোযোগ এমন কিছু সার্বিক বৈশিষ্ট্যের দিকে চালিত করে, যা এআই এবং মানুষের মুখের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয়। এআইয়ের তৈরি মুখগুলো সাধারণত বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ, সমানুপাতিক এবং আকর্ষণীয় হয়। কিন্তু কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়া আমরা প্রায়ই এগুলোকে আসল মানুষ হওয়ার লক্ষণ বলে মনে করি।’
কোনো ছবি এআই দিয়ে তৈরি কি না, তা বুঝতে হলে সস্তা কোনো খুঁত খুঁজলে চলবে না। আমাদের নজর দিতে হবে মানুষের চিরন্তন কিছু অপূর্ণতা ও সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্যের ওপর। গবেষকেরা মূলত ৬টি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন। এগুলো হলো—
এই সক্ষমতা অর্জন করা এখন সময়ের দাবি। বিশ্বখ্যাত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডেলয়েট সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, এআই ডিপফেক স্ক্যামের কারণে শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই আগামী বছর ক্ষতির পরিমাণ ৪০ বিলিয়ন পাউন্ডে পৌঁছাতে পারে। হংকংয়ের এক সংস্থায় বসের ডিপফেক ভিডিও ক্লিপ দেখিয়ে ২৫ মিলিয়ন পাউন্ড হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। মার্কিন রাজনীতিতে ‘কেটি জোন্স’ নামের কাল্পনিক এআই নারী প্রোফাইল ব্যবহার করে গুপ্তচরবৃত্তির চেষ্টা করেছে। এই প্রযুক্তি যে কতটা বিপজ্জনক, এই ঘটনাগুলো তার প্রমাণ।
তবে আশার কথা হলো, জেনারেটিভ এআই প্রচুর ডেটা দেখে যেভাবে নিজে নিজে শেখে, সেভাবেই মানুষের মস্তিষ্কও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এই ফেক বা নকলের অনুভূতিটি নিজের ভেতর তৈরি করে নিতে পারে। এআই প্রতিনিয়ত শিখছে ঠিকই, তবে মানুষের সচেতনতা আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিই পারে এই কৃত্রিম ফাঁদ রুখে দিতে।
সূত্র: বিবিসি, অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি






