ক্যাডেট কলেজের আদলে দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনে ৬০০ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি আসনে ছেলেদের জন্য একটি এবং মেয়েদের জন্য একটি সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো হবে আবাসিক এবং তাতে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে।
সরকারের নির্দেশনায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) ৬০০টি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে একটি প্রাথমিক খসড়া প্রস্তাব তৈরি করেছে। ‘নির্বাচিত এলাকাসমূহে ৬০০টি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ নির্মাণ প্রকল্প’ নামের এই প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ৬৮ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে হিসাব করা হয়েছে।
দেশে এখন পুরোপুরি আবাসিক সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই। অল্প কিছু পুরোনো স্কুল অ্যান্ড কলেজে ছাত্রাবাস রয়েছে। অন্যদিকে বেসরকারিভাবে অনেক আবাসিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা গড়ে উঠেছে। সেগুলোর সংখ্যা কত, সে হিসাব পাওয়া যায়নি।
আ ন ম এহছানুল হক মিলন, শিক্ষামন্ত্রী সরকারি পর্যায়ে ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ গড়ে তোলাই এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চমানের শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে এসব প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।ক্যাডেট কলেজ আছে ১২টি। তার মধ্যে ৯টি ছেলেদের এবং ৩টি মেয়েদের। ক্যাডেট কলেজ আবাসিক। সেখানে সপ্তম শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। পড়াশোনা হয় এইচএসসি পর্যন্ত।
শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের অনেকে মনে করছেন, সরকারিভাবে আবাসিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তটি ইতিবাচক। এর মাধ্যমে স্বল্প ও সীমিত আয়ের পরিবারের সন্তানদের আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার সুযোগ তৈরি হবে; কিন্তু কোথায় কোথায় এ ধরনের আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, সেটির সমীক্ষা প্রয়োজন। পার্বত্য চট্টগ্রাম, সুনামগঞ্জের মতো হাওরাঞ্চল, চরাঞ্চল কিংবা দুর্গম ও শিক্ষাবঞ্চিত এলাকা এবং জনবহুল এলাকায় পরিকল্পিতভাবে আবাসিক মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হলে তা ইতিবাচক ফল দিতে পারে।
নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দেশের বিদ্যমান প্রাথমিক, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মানোন্নয়ন, শিখনঘাটতি কাটিয়ে ওঠা, শিক্ষকসংকট নিরসন এবং অবকাঠামো উন্নয়নে জোরালো উদ্যোগ নেওয়াও জরুরি বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের অনেকে।
জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি পর্যায়ে ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ গড়ে তোলাই এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চমানের শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে এসব প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে নতুন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিদ্যমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার মান উন্নয়নেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে এবং সে লক্ষ্যেও কাজ করা হবে।
বেসরকারি খাতের কিছু স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদাহরণ দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সরকারি ব্যবস্থাতেও একই ধরনের মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা সরকারি পর্যায়েই উচ্চমানের শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায়।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে পাঁচ বছরে, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে। এ প্রকল্পের প্রশাসনিক খরচ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, মূলধন ব্যয় এবং আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে মোট ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৬৮ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা।কোথায়, কতটি দরকার, ‘স্কুল ম্যাপিং’ জরুরি
জমি ৩ একর, ভবন ১০ তলা
মাউশির প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রায় তিন একর জমি প্রয়োজন হবে। জমি অধিগ্রহণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া ৬০০টি একাডেমিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি ভবন হবে ১০ তলাবিশিষ্ট এবং প্রতিটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৮০ কোটি টাকা। এ খাতে মোট ব্যয় হবে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা।
প্রস্তাবিত প্রকল্পে ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য মোট ৬০০টি হোস্টেল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটির ব্যয় ১০ কোটি টাকা হিসাবে মোট ব্যয় হবে ৬ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি ৬০০টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ল্যাব স্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে পাঁচ বছরে, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে। এ প্রকল্পের প্রশাসনিক খরচ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, মূলধন ব্যয় এবং আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে মোট ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৬৮ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বৈদেশিক ঋণসহায়তা নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ, মহাপরিচালক, মাউশি৬০০টি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য—দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে পিছিয়ে থাকা এলাকায় মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ করা। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রকল্পের ব্যয়, প্রয়োজনীয়তা, সম্ভাব্যতা ও বিদ্যমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নের বিষয়গুলো বিবেচনা করা হবে।মাউশি বলছে, দেশের সব অঞ্চলে, বিশেষ করে গ্রামীণ, অনগ্রসর ও অবকাঠামোগতভাবে পিছিয়ে থাকা এলাকায় এখনো সমমানের আধুনিক শিক্ষাসুবিধা পৌঁছায়নি। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী শিক্ষাক্ষেত্রে সামাজিক ও ভৌগোলিক বৈষম্য কমানো এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, ৬০০টি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য—দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে পিছিয়ে থাকা এলাকায় মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ করা। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রকল্পের ব্যয়, প্রয়োজনীয়তা, সম্ভাব্যতা ও বিদ্যমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নের বিষয়গুলো বিবেচনা করা হবে।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অতীতেও বিভিন্ন সময়ে মডেল স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে সব প্রতিষ্ঠান প্রত্যাশিত মানে পৌঁছাতে পারেনি। কিছু ক্ষেত্রে অবকাঠামো নির্মাণ করা হলেও শিক্ষার গুণগত মান, শিক্ষকসংকট বা ব্যবস্থাপনা দুর্বলতার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি।
মাধ্যমিকে কত শিক্ষার্থী
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী আছে ৯৪ লাখের বেশি। এর মধ্যে ১৯ হাজারের বেশি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রায় ৭৮ লাখ; আর স্কুল অ্যান্ড কলেজের সংখ্যা (এসব প্রতিষ্ঠানেও মাধ্যমিক স্তরে পড়ানো হয়) ১ হাজার ৫১৪। এগুলোতে শিক্ষার্থী আছে ১৫ লাখ ৬৪ হাজারের বেশি।
এর বাইরে মাদ্রাসাগুলোতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। সেই হিসাব সরকারি সংস্থার কাছে নেই। ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করে ২৯ হাজারের মতো শিক্ষার্থী।
দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক-শিক্ষিকার অনুমোদিত পদ ১৫ হাজার ২৯৩টি। এর মধ্যে ২ হাজার ৮৪২টি পদ শূন্য, অর্থাৎ ১৮ শতাংশের বেশি পদে শিক্ষক নেই।
মাউশির পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন শাখার গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা ইংরেজি ও গণিতে দক্ষতা অর্জনে বেশ পিছিয়ে। এমনকি বাংলায়ও শিক্ষার্থীদের অবস্থা কাঙ্ক্ষিত মানের নয়। মূলত বিদ্যালয়গুলোতে ঠিকমতো পড়াশোনা না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা কোচিং ও গৃহশিক্ষকের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হয়।
অনেক অভিভাবকের অভিযোগ, শিক্ষকেরা ক্লাসে ভালোভাবে পড়ানোর বদলে প্রাইভেট পড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগ দেন। ফলে খরচের বোঝা পড়ে পরিবারগুলোর ওপর।
মুহাম্মদ মাহবুব মোর্শেদ, সহযোগী অধ্যাপক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সরকারের উদ্দেশ্য হয়তো ভালো। তবে এখানে মূল প্রশ্ন প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তবতা নিয়ে। দেশের সব এলাকায় আবাসিক মডেল স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন আছে কি না, সেটি আগে বিবেচনা করা দরকার।জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো ২০২৩ সালে এক গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য দিয়ে বলেছিল, বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে ব্যয়ের ৭১ শতাংশই বহন করতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অতীতেও বিভিন্ন সময়ে মডেল স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে সব প্রতিষ্ঠান প্রত্যাশিত মানে পৌঁছাতে পারেনি। কিছু ক্ষেত্রে অবকাঠামো নির্মাণ করা হলেও শিক্ষার গুণগত মান, শিক্ষকসংকট বা ব্যবস্থাপনা দুর্বলতার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। এ কারণে নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে আগের উদ্যোগগুলোর সাফল্য-ব্যর্থতা মূল্যায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়ের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহবুব মোর্শেদ প্রথম আলোকে বলেন, সরকারের উদ্দেশ্য হয়তো ভালো। তবে এখানে মূল প্রশ্ন প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তবতা নিয়ে। দেশের সব এলাকায় আবাসিক মডেল স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন আছে কি না, সেটি আগে বিবেচনা করা দরকার। তাঁর মতে, বর্তমানে বিদ্যমান প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়নেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। অবশ্য প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যেতে পারে।
মুহাম্মদ মাহবুব মোর্শেদ বলেন, বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ না নিয়ে কিছুটা সময় নিয়ে পুরো শিক্ষা খাত সামনে রেখে সমন্বিত পরিকল্পনা করা উচিত। যাতে সীমিত সরকারি সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে বেশি সুফল পাওয়া যায়।








