• ১০-১৫ মিনিট পরপর বাস চান যাত্রীরা
  • প্রবাসীদের জন্য আরও প্রচারণা দরকার
  • শাটল সার্ভিস আরও জনপ্রিয় করার ইচ্ছা

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আগত ও প্রস্থানকারী যাত্রীদের যাতায়াত সহজ করতে চালু করা হয়েছে ফ্রি শাটল বাস সার্ভিস। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, এই সেবা বয়স্ক, শিশু নিয়ে ভ্রমণকারী পরিবার, শারীরিকভাবে অসুস্থ এবং ভারী লাগেজ বহনকারী যাত্রীদের জন্য বিশেষভাবে সহায়ক হবে।

তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। চালুর কয়েক দিনের মধ্যেই অনুপযোগী বাস, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং প্রচারণার অভাবে প্রত্যাশিত সাড়া মিলছে না। ফলে আগের মতোই কাঁধে-মাথায় লাগেজ নিয়ে অনেক যাত্রী বিমানবন্দর থেকে বের হচ্ছেন।

যাত্রীদের অভিযোগ, সময়মতো শাটল বাস পাওয়া যায় না। বাস পাওয়া গেলেও সেটি প্রবাসী যাত্রীদের ব্যবহার উপযোগী নয়। অর্থাৎ, এ বাসে লাগেজ রাখার কোনো ব্যবস্থা নেই। আর প্রচারণার অভাবে অনেক যাত্রী এই শাটল বাসের তথ্যই জানেন না।

jagonews24

বিমানবন্দরের বিনামূল্যের শাটল বাস সার্ভিস: ছবি জাগো নিউজ

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, শাটল বাসের প্রচার-প্রচারণা তারা অব্যাহত রেখেছেন। বিমানবন্দরের বিভিন্ন স্থানে ব্যানার-ফেস্টুন টানানো হয়েছে। ক্রমেই শাটলে যাত্রী পরিবহন বাড়ছে।

প্রবাসী যাত্রীদের জন্য শাটল সেবা খুবই ভালো উদ্যোগ। কিন্তু এ সেবা চালুর পর তেমন সাড়া মিলেনি। আধা ঘণ্টায় বাসে দু-চারজনের বেশি যাত্রী হয় না। আবার যারা আসেন, তাদের লাগেজ রাখারও ব্যবস্থা নেই। সাধারণত এ ধরনের বাস সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে স্টাফ বাস হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

আরও পড়ুন

ফিটস এয়ার / শাহজালালে বদ্ধ বিমানে ১৮২ যাত্রীর দুর্বিষহ ৫ ঘণ্টা

গত ৮ জুলাই ফ্রি শাটল সার্ভিসের উদ্বোধন করেন বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ। তিনি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, দুটি বাস টার্মিনাল-১ ও টার্মিনাল-২-এর ক্যানোপির মাঝামাঝি স্থান থেকে প্রতি ৩০ মিনিট পরপর ছেড়ে বিমানবন্দর বাসস্টেশন, জসিম উদ্দিন সড়ক, বিমানবন্দর রেলস্টেশন ও কাওলা ঘুরে আবার বিমানবন্দরে ফিরে আসবে। পুরো সেবাটি বিনামূল্যে।

বিদেশফেরত কিংবা বিদেশগামী অধিকাংশ যাত্রীর সঙ্গে একাধিক বড় লাগেজ থাকে। কিন্তু বাসে সেগুলো রাখার আলাদা ব্যবস্থা না থাকায় যাত্রীদের লাগেজ কোলে কিংবা বাসের চলাচলের পথেই রাখতে হয়। 

রোববার (১৯ জুলাই) সরেজমিনে দেখা যায়, যাত্রী পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত বাস দুটির দরজা, ওঠানামার ব্যবস্থা এবং অভ্যন্তরীণ নকশা অনেকটা সাধারণ পাবলিক বাসের মতো। অথচ বিমানবন্দরের ভেতরে টার্মিনাল থেকে উড়োজাহাজে যাত্রী পরিবহনের জন্য যে ধরনের প্রশস্ত দরজা ও লাগেজ রাখার সুবিধাসম্পন্ন বাস ব্যবহৃত হয়, এই শাটল সার্ভিসে তার কোনো বৈশিষ্ট্য নেই। ফলে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে লাগেজ বহনে।

jagonews24আগের মতোই কাঁধে-মাথায় লাগেজ বের হচ্ছেন যাত্রীরা: ছবি এআই

যাত্রীরা জানিয়েছেন, বিদেশফেরত কিংবা বিদেশগামী অধিকাংশ যাত্রীর সঙ্গে একাধিক বড় লাগেজ থাকে। কিন্তু বাসে সেগুলো রাখার আলাদা ব্যবস্থা না থাকায় যাত্রীদের লাগেজ কোলে কিংবা বাসের চলাচলের পথেই রাখতে হয়। এতে ওঠানামা যেমন কঠিন হয়ে পড়ে, তেমনি নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।

রোববার (১৯ জুলাই) সকাল সাড়ে ৮টায় দেখা যায়, শাটল বাসের ভেতরে একজন মাত্র যাত্রী উঠে বসে আছেন। সকাল ৮টা ৫৬ মিনিটে ওই যাত্রীকে নিয়েই বাসটি ছেড়ে যান চালক। এরপর সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত টার্মিনাল-১ ও টার্মিনাল-২-এর ক্যানোপিতে কোনো বাস ছিল না। এ সময় অসংখ্য যাত্রীকে কাঁধে ও মাথায় লাগেজ নিয়ে বিমানবন্দর থেকে বের হতে দেখা গেছে। এসব যাত্রীর অধিকাংশই বিমানবন্দর সড়ক ও বিমানবন্দর রেলস্টেশনের দিকে যাচ্ছিলেন।

শাটল বাসের প্রচারে বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে বিভিন্ন পয়েন্টে সাইনেজ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন গণমাধ্যমে শাটল সার্ভিসের প্রচারের পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমেও প্রচার করা হয়েছে। এটিকে আরও জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

শাহজালাল বিমানবন্দরে ফ্রি শাটল সার্ভিস চালু

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শাটল বাসচালক বলেন, প্রবাসী যাত্রীদের জন্য শাটল সেবা খুবই ভালো উদ্যোগ। কিন্তু এ সেবা চালুর পর তেমন সাড়া মিলেনি। আধা ঘণ্টায় বাসে দু-চারজনের বেশি যাত্রী হয় না। আবার যারা আসেন, তাদের লাগেজ রাখারও ব্যবস্থা নেই। সাধারণত এ ধরনের বাস সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে স্টাফ বাস হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

সকাল ৮টায় কাতার থেকে দেশে ফেরেন প্রবাসী আবির হোসেন। এরপর সকাল ৯টায় টার্মিনাল-১-এর ক্যানোপি দিয়ে তিনি কাঁধে লাগেজ নিয়ে বের হন। কিন্তু তিনি শাটল বাস সেবা সম্পর্কে জানতেন না।

তখন তাকে এ সেবা সম্পর্কে জানালে আবির হোসেন বলেন, ‘বাসের জন্য আধা ঘণ্টা দাঁড়িয়ে না থেকে হেঁটে পাঁচ মিনিটেই বিমানবন্দর সড়কে যাওয়া যায়। এ ধরনের সেবায় ৫ থেকে ১০ মিনিট পরপর বাস ছাড়লে যাত্রী উঠবে।’

jagonews24শাহজালাল বিমানবন্দর: ছবি জাগো নিউজ

শাহজালাল বিমানবন্দরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, শাটল বাসের শুধু নকশাই নয়, সময়সূচিও যাত্রীদের জন্য ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি ৩০ মিনিট পরপর বাস ছাড়ার কারণে অনেক যাত্রী দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে চান না। বিশেষ করে দুপুরের প্রচণ্ড গরম বা বৃষ্টির মধ্যেও অনেককে মাথায় কিংবা হাতে ভারী লাগেজ বহন করে বিমানবন্দর সড়ক, বিমানবন্দর রেলস্টেশন কিংবা বাসস্টেশনের দিকে হেঁটে যেতে দেখা যায়। বয়স্ক যাত্রী, নারী ও শিশুদের জন্য এটি আরও কষ্টকর হয়ে ওঠে।

এ ছাড়া আরেকটি বড় সমস্যা হলো প্রচারণার অভাব। বিমানবন্দরে প্রবেশ বা বের হওয়ার সময় অধিকাংশ যাত্রীই জানেন না যে বিনামূল্যে শাটল বাস চালু হয়েছে। কোথা থেকে বাস ছাড়ে, কোন কোন স্থানে যায় কিংবা কতক্ষণ পরপর চলাচল করে—এসব বিষয়ে দৃশ্যমান কিছু নির্দেশনা বা ফেস্টুন রয়েছে। তবে প্রবাসীদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন, যারা বাংলা পড়তে পারেন না। তাদের জন্য হ্যান্ডমাইকে প্রচার আরও কার্যকর হতে পারে।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তব প্রয়োগের সমন্বয় না হলে বিনামূল্যের এই সেবাও প্রবাসী যাত্রীদের কাছে কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি এনে দিতে পারবে না। বরং যাত্রীবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার পরিবর্তে এটি কেবল আরেকটি অপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবেই থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আরও পড়ুন

শাহজালাল বিমানবন্দর / জাল ভিসা-বডি কন্ট্রাক্ট: বোর্ডিং পাস কীভাবে দিলো বিমান?

বিমানবন্দর-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু বাস চালু করলেই হবে না, যাত্রীবান্ধব পরিকল্পনা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশফেরত যাত্রীদের বড় লাগেজের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাসের ভেতরে আলাদা লাগেজ সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাসের ফ্রিকোয়েন্সি বাড়িয়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিট পরপর চালানো হলে অপেক্ষার সময় কমবে এবং যাত্রীদের আগ্রহও বাড়বে।

এটি অবশ্য বিমানবন্দরে প্রথম শাটল বাস উদ্যোগ নয়। এর আগে ২০২৪ সালের ২৬ জুন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) প্রবাসী যাত্রীদের সুবিধার জন্য বিশেষায়িত শাটল বাস সার্ভিস চালু করেছিল। সে সময় জানানো হয়েছিল, বিমানবন্দর টার্মিনাল-২, উত্তরা জসিম উদ্দিন সড়ক, বিমানবন্দর রেলস্টেশন ও টার্মিনাল-৩ চক্রাকারে দুটি বাস চলাচল করবে। কিন্তু বিআরটিসির তৈরি সেই বাসগুলোও সাধারণ বাসের মতোই ছিল। পরে যাত্রী না পেয়ে কিছুদিনের মধ্যেই সেবাটি বন্ধ হয়ে যায়।

jagonews24

সকালের একটি ফ্লাইটে ইতালির রোম থেকে ঢাকায় ফেরেন ফেনীর আকরাম হোসেন। তিনি বলেন, বিশ্বের অধিকাংশ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে টার্মিনাল ও গণপরিবহনের সংযোগব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে তোলা হয়, যাতে একজন যাত্রীকে ভারী লাগেজ হাতে দীর্ঘ পথ হাঁটতে না হয়। বিমানবন্দরের শাটল বাসে সাধারণত প্রশস্ত দরজা, নিচু ফ্লোর, লাগেজ রাখার নির্দিষ্ট স্থান এবং ঘন ঘন চলাচলের ব্যবস্থা থাকে। একই সঙ্গে যাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট সাইনেজ, তথ্যকেন্দ্র ও ডিজিটাল নির্দেশনা দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন

শাহজালালে হারানো ব্যাগ উদ্ধার, প্রবাসীর মুখে হাসি ফেরালেন আনসার সদস্য

তিনি বলেন, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তব প্রয়োগের সমন্বয় না হলে বিনামূল্যের এই সেবাও প্রবাসী যাত্রীদের কাছে কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি এনে দিতে পারবে না। বরং যাত্রীবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার পরিবর্তে এটি কেবল আরেকটি অপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবেই থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘শাটল বাসের প্রচারে বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে বিভিন্ন পয়েন্টে সাইনেজ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন গণমাধ্যমে শাটল সার্ভিসের প্রচারের পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমেও প্রচার করা হয়েছে। এটিকে আরও জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

এমএমএ/এসএইচএস