উড়ে যাওয়া শুকনো পাতা মাড়িয়ে রেলস্টেশনের পাশে শিরীষগাছের ছায়ায় লুকিয়ে দেখা করত কিশোর-কিশোরী। হাতে লেখা চিঠি টুক করে ছুড়ে ফেলে, কিশোর হাওয়ায় মিলিয়ে যেত লাল বাইসাইকেল চালিয়ে। দুই দশকে গত হয়েছে অনেক কিছুই। কিন্তু স্থির দাঁড়িয়ে আছে শুধু শাহজীবাজার রেলস্টেশনের জরাজীর্ণ লাল ঘর দুটি।

বছরের অন্য সময়ে স্টেশনটি নিছক একটি স্টেশন। কয়েকটি ট্রেন আসে, কয়েকটি ট্রেন চলে যায়। মানুষের পায়ের শব্দ জমে, আবার মিলিয়ে যায়। কিন্তু আষাঢ় নামলেই জায়গাটি অন্য এক অস্তিত্ব ধারণ করে। মনে হয়, সময় এখানে সোজা পথে হাঁটে না; বৃষ্টির জলে ভিজে দুই দশক আগেকার দিনে ফিরে যায়।

আজও আকাশের মুখ ভার। দুপুর থেকেই মেঘ জমেছিল। তারপর হঠাৎ একসময় বাতাস বদলে গেল। শিরীষ পাতাগুলো কেঁপে উঠল। দূরের বাঁশঝাড় অকারণে গাঢ় হয়ে এল। ঠিক তখনই প্রথম ফোঁটাটি পড়ল লাল ঘরের টিনের চালে।

একটি।

তারপর আরেকটি।

তারপর অসংখ্য...

বৃষ্টি যখন নেমে আসে, তখন পৃথিবীর সব শব্দের ওপর তার একধরনের অধিকার জন্মায়। মানুষের কথাবার্তা, ট্রেনের হুইসেল, বাজারের কোলাহল—সবকিছুকে আড়াল করে সে নিজের ভাষায় কথা বলে।

শাহজীবাজার স্টেশন সেই ভাষা বহু বছর ধরে শুনে আসছে।

হয়তো সে এখনো মনে রেখেছে সেই কিশোরটিকে, যে চিঠি লেখার আগে বহুক্ষণ কাগজের দিকে তাকিয়ে থাকত। কিংবা সেই কিশোরীকে, যে চিঠি হাতে পেয়েও সঙ্গে সঙ্গে খুলত না, বাড়ি ফেরার পথটুকু অপেক্ষা করত। কিশোরী জানত; কিছু অপেক্ষা আছে, যাদের আনন্দ প্রাপ্তিতে নয়, বিলম্বে।

আষাঢ় সেই বিলম্বের ঋতু।

বৃষ্টি আরও ঘন হলে রেললাইন দুটো ঝাপসা হয়ে যায়। দূর থেকে মনে হয়, তারা কোথাও যাচ্ছে না; শুধু পাশাপাশি শুয়ে আছে। অথচ তাদের কাজই হলো দূরে চলে যাওয়া।

মানুষের জীবনও কি তেমন নয়? পাশাপাশি থাকা আর একসঙ্গে পৌঁছানো এক জিনিস নয়। রেলস্টেশনের সেই শিরীষগাছের নিচে আজ কেউ নেই। তবু বিকেলের শেষ আলো নিভে আসার মুহূর্তে মনে হয়, কেউ যেন দাঁড়িয়ে আছে। কোনো মুখ দেখা যায় না, কোনো শব্দ শোনা যায় না। শুধু একটি অনুভূতি ভেসে ওঠে, যেন বহু বছর আগে অসমাপ্ত থেকে যাওয়া একটি বাক্য এখনও বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

সময়ের একটি অদ্ভূত স্বভাব আছে। সে মানুষকে বদলে দেয়, অথচ কিছু অনুভূতিকে স্পর্শ করে না। বিশ বছর আগের একটি বিকেল কখনো কখনো আজকের দিনের চেয়েও বেশি জীবন্ত হয়ে ওঠে। একটি ভেজা চিঠি, একটি অকারণ হাসি, একটি লাল বাইসাইকেলের দ্রুত দূরে চলে যাওয়া—এসবের বয়স বাড়ে না।

বৃষ্টি থামার দিকে এলে আকাশের রং বদলে যায়। পশ্চিমে সামান্য আলো ফুটে ওঠে। জমে থাকা জলে সেই আলো কাঁপতে থাকে।

স্টেশন তখন আরও নির্জন।

মনে হয়, পৃথিবী তার সব ব্যস্ততা সরিয়ে রেখে কিছুক্ষণের জন্য কেবল স্মৃতির কাছে ফিরে এসেছে।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

শাহজীবাজারের লাল ঘর দুটি সেই স্মৃতির প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তারা জানে, পৃথিবীর অধিকাংশ গল্পের কোনো পরিণতি নেই। অধিকাংশ চিঠির শেষ লাইন লেখা হয় না। অধিকাংশ অনুভূতির কোনো নামও থাকে না।

তবু আষাঢ় প্রতিবছর ফিরে আসে।

মেঘ আসে, বৃষ্টি নামে।

আর কোনো এক অদৃশ্য পথে, অজানা দুটি জীবনের মাঝখানে, বহুদিন আগে হারিয়ে যাওয়া একটি বিকেল আবার নীরবে হেঁটে যায়। তখন মনে হয়, পৃথিবীতে ভালোবাসার চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হয়তো কিছু আছে, সেটি হলো এমন এক স্মৃতি, যা কখনো দাবি করে না, তবু সারা জীবন পাশে থাকে; আষাঢ়ের বৃষ্টির মতো, জানালায় এসে নিঃশব্দে হাত রাখে।

লেখক: অনজন কুমার রায়