নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলওয়ে হাসপাতালকে পূর্ণাঙ্গ জেনারেল হাসপাতালে রূপান্তর করা হয়নি আজও। রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রায় এক বছর আগে হাসপাতালটি আধুনিকায়নের জন্য একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। তবে এ কাজের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। এজন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে দায়ী করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, রেলওয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন এ হাসপাতাল যৌথ ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার জন্য ২০২৫ সালের ২১ এপ্রিল রেলপথ মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে হাসপাতাল পরিচালনার জন্য একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক হাসপাতালটি সুষ্ঠু ও কার্যকর স্বাস্থ্য সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে পরবর্তীতে অর্থ বিভাগ, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি ত্রিপক্ষীয় সভাও অনুষ্ঠিত হয়। সে সময় প্রকল্পটির গুরুত্ব বিবেচনা করে খোদ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব হাসপাতালটি সরজমিনে পরিদর্শনও করেছিলেন। ৬৮ লাখ টাকা ব্যায়ে অবকাঠামো সংস্কার কাজ করা হয়। তবে হাসপাতালটিকে হাসপাতাল জেনারেলে রূপান্তর করা হয়নি আজও।

‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রেলওয়ের চারটি হাসপাতালকে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত ও আধুনিকায়ন করার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এরইমধ্যে চট্রগ্রাম ও রাজশাহীর রেলওয়ে হাসপাতালটি জেনারেলে রূপান্তর করা হয়েছে। সৈয়দপুরেরটি প্রক্রিয়াধীন’

আরও পড়ুন

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশের দেড় মাসেও চালু হয়নি খুমেক হাসপাতালের ওটি

মূলত দেশের বৃহত্তর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চিকিৎসাসেবা দিতে ১৮৭২ সালে ৮২ শয্যার এ হাসপাতালটি নির্মাণ করা হয়। তবে নানান কারণে হাসপাতালের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। জনবল সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশাল এ হাসপাতালে মঞ্জুরিকৃত চিকিৎসকের পদের বিপরীতে বর্তমানে মাত্র একজন চিকিৎসক কর্মরত আছেন। ফলে একজন চিকিৎসকের পক্ষে বিপুলসংখ্যক রোগীকে প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। নার্স ও টেকনিশিয়ানের বেশিরভাগ পদ শূন্য থাকায় এক্স-রেসহ মূল্যবান যন্ত্রপাতিগুলো দীর্ঘদিন ধরে অকেজো হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত জরুরি ওষুধেরও চরম সংকট রয়েছে এখানে।

‘লাল ফিতায়’ আটকা জেনারেলে রূপান্তর

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাসপাতালটির বেহাল অবস্থার পেছনে রয়েছে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্থবিরতা। ২০২০ সালে চিকিৎসক ও কারিগরি পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত হওয়ার পর থেকেই হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম ধীরে ধীরে স্থবির হয়ে পড়ে। বর্তমানে শুধু ভবনটি দাঁড়িয়ে থাকলেও কার্যত এটি একটি সেবাহীন প্রতিষ্ঠান। এতে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত রেলের প্রায় ১০ হাজার পরিবার। উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পরিদর্শন এবং সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর এক বছর কেটে গেলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। দফায় দফায় ফাইল চালাচালি হলেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যকার সমন্বয়হীনতায় প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখেনি।

‘রেলওয়ের এই হাসপাতালটি জেনারেলে রূপান্তর হলে শুধু সৈয়দপুরের তিন লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হবে তা না; স্বাস্থ্যসেবায় পিছিয়ে পড়া জনপদ নীলফামারীসহ আশপাশের তিন জেলার প্রায় আট লাখ মানুষ স্বল্পমূল্যে উন্নত চিকিৎসা পাবেন। সরকারের উচিত হাসপাতালটিকে জেনারেলে রূপান্তর করে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া’

আরও পড়ুন

গাইবান্ধা / রোগীকে ১৯০ গ্রাম মাংসের জায়গায় দেওয়া হচ্ছে ৪০, হাতেনাতে ধরলেন এমপি

সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার কর্মচারী একরাম উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘রেলওয়ে শ্রমিক-কর্মচারীদের দাবি আমলে নিয়ে রেলওয়ে হাসপাতালকে জেনারেল হাসপাতালে রূপান্তর প্রকল্প সরকার অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় প্রকল্পের কাজের তেমন অগ্রগতি হয়নি। আমরা চাই দ্রুত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হোক।’

সৈয়দপুর নতুন বাবুপাড়া এলাকার বাসিন্দা একরামুল হক, আতিক হাসান ও জুবায়ের আলম বলেন, ‘রেলওয়ের এই হাসপাতালটি জেনারেলে রূপান্তর হলে শুধু সৈয়দপুরের তিন লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হবে তা না; স্বাস্থ্যসেবায় পিছিয়ে পড়া জনপদ নীলফামারীসহ আশপাশের তিন জেলার প্রায় আট লাখ মানুষ স্বল্পমূল্যে উন্নত চিকিৎসা পাবেন। সরকারের উচিত হাসপাতালটিকে জেনারেলে রূপান্তর করে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া।’

আরও পড়ুন

যেখানেই অবহেলা-দুর্নীতি সেখানেই চাকরিচ্যুতি: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

কথা হয় রেলওয়ে শ্রমিক ইউনিয়ন কারখানা শাখার সাধারণ সম্পাদক শেখ রোবায়েতুর রহমানের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে জানান, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা না থাকায় সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে রংপুর বা দিনাজপুরের দূরবর্তী মেডিকেল কলেজগুলোতে যেতে বাধ্য হচ্ছেন রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এতে চিকিৎসা ব্যয় ও ভোগান্তি দুটোই বেড়ে গেছে।

শিগগির হাসপাতালটি জেনারেল হাসপাতালে রূপান্তর কার্যকর হবে বলে জানান রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলীয় চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. আনিছুল হক। তিনি বলেন, সরকারের উচ্চপর্যায়ে ফাইল অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।

আরও পড়ুন

৩০০ কোটির হাসপাতাল, ৪০ বছর পর শুধুই ঝোপঝাড়

তিনি আরও বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রেলওয়ের চারটি হাসপাতালকে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত ও আধুনিকায়ন করার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এরইমধ্যে চট্টগ্রাম ও রাজশাহীর রেলওয়ে হাসপাতালটি জেনারেলে রূপান্তর করা হয়েছে। সৈয়দপুরেরটি প্রক্রিয়াধীন।’

এ বিষয়ে নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম বলেন, সংসদে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে। প্রকল্পটির দ্রুত বাস্তবায়নে তিনি কার্যকর ভূমিকা রাখবেন।

আরও পড়ুন

সাংবাদিক দেখে প্রাইভেট হাসপাতাল থেকে দৌড়ে পালালেন চিকিৎসক

সৈয়দপুর রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী (কারখানা) শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘সরকার বদলসহ নানান কারণে রেলওয়ে হাসপাতালটি জেনারেলে বাস্তবায়নের বিষয়টি স্থবির হয়ে আছে। তবে মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিলে কাজটি দ্রুত শুরু করা সম্ভব হবে।’

এসআর/জেআইএম