• আক্রান্ত প্রায় ২০ হাজার গরু
  • মৃত্যু ৩৬, বাড়ছে আতঙ্ক
  • বরাদ্দ মাত্র ৩৫০ ডোজ
  • প্রয়োজন ৫০ হাজার টিকা

নাটোরের লালপুরে গবাদিপশুর প্রাণঘাতী লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দ্রুত সংক্রমণ, টিকার তীব্র সংকট এবং চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতায় উপজেলার প্রায় ২০ হাজার গরু আক্রান্ত হয়েছে। সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত ৩৬টি গরুর মৃত্যু হয়েছে। তবে স্থানীয় খামারিদের দাবি, প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, লালপুরে মোট গরুর সংখ্যা ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪২২টি। এর মধ্যে প্রায় ২০ হাজার গরু লাম্পি রোগে আক্রান্ত হয়েছে। তবে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উপজেলার জন্য বরাদ্দ এসেছে মাত্র ৩৫০ ডোজ টিকা। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অন্তত ৫০ হাজার ডোজ টিকার প্রয়োজন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, এক মাসের ব্যবধানে মহরাজপুর, নওশারা, সুলতানপুর ও আশপাশের এলাকায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে রোগটি। ইউনিয়নটিতেই প্রায় সাড়ে তিন হাজার গরু আক্রান্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পদ্মা তীরবর্তী বিলমাড়িয়া ইউনিয়ন।

আরও পড়ুন

নেই ভ্যাকসিন, গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ছে গরুর লাম্পি স্কিন-ক্ষুরা রোগ

নওসারা সুলতানপুর গ্রামের ক্ষুদ্র খামারি মো. ফিরোজ আলীর খামারে পাঁচটি গরু ছিল। তিনি জানান, লাম্পি রোগের কারণে লোকসান গুনে অর্ধেক দামে কয়েকটি গরু বিক্রি করতে বাধ্য হন তিনি। পরে নতুন করে তিনটি গরু কিনলেও একটি গাভির তিন মাস বয়সী বাছুর আবারও লাম্পিতে আক্রান্ত হয়। প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে চিকিৎসা করিয়েও সুস্থ হয়নি। সরকারি হাসপাতালে সহযোগিতা না পেয়ে তিনি নিজ খরচে টিকা কিনে অন্য গরুগুলোকে সুরক্ষার চেষ্টা করেছেন।

‘শুধু বিলমাড়িয়া ইউনিয়নেই গত এক মাসে ৪৫ থেকে ৫০টি গরু মারা গেছে। যদিও উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মে মাস থেকে এখন পর্যন্ত ৩৬টি গরুর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে’

একই গ্রামের খামারি নুর নবী ঘোষ জানান, তার খামারের ছয়টি গরু মারা গেছে এবং আরও তিনটি আক্রান্ত রয়েছে। একাধিকবার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে যোগাযোগ করেও কার্যকর সহায়তা পাননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

লাম্পিতে বিপর্যস্ত পুরো উপজেলা, টিকা সংকটে মরছে গরু

টুটুল ইসলাম, শাহানাজ পারভীনসহ আরও অনেক খামারিও একই অভিযোগ করেছেন। পানসিপাড়া গ্রামের দিনমজুর কামরুল ইসলাম ও ফতেপুর গ্রামের জোসনার মতো অনেকেই টিকা না পেয়ে নিমপাতা, ধূপ, ন্যাফথলিন ও হোমিও চিকিৎসার মতো ঘরোয়া পদ্ধতির ওপর নির্ভর করছেন। এতে রোগ নিয়ন্ত্রণে তেমন সুফল মিলছে না।

আরও পড়ুন

গরুর লাম্পি রোগ হলে করণীয়

স্থানীয় পশুপল্লী চিকিৎসক মোসলেম উদ্দিনের দাবি, শুধু বিলমাড়িয়া ইউনিয়নেই গত এক মাসে ৪৫ থেকে ৫০টি গরু মারা গেছে। যদিও উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মে মাস থেকে এখন পর্যন্ত ৩৬টি গরুর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্যমতে, লালপুরে মোট গরুর সংখ্যা ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪২২টি। এর মধ্যে প্রায় ২০ হাজার গরু ইতোমধ্যে লাম্পি রোগে আক্রান্ত হয়েছে। তবে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উপজেলার জন্য বরাদ্দ এসেছে মাত্র ৩৫০ ডোজ টিকা, যা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অন্তত ৫০ হাজার ডোজ টিকার প্রয়োজন।

‘লালপুরে মোট গরুর সংখ্যা ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪২২টি। এর মধ্যে প্রায় ২০ হাজার গরু ইতোমধ্যে লাম্পি রোগে আক্রান্ত হয়েছে। তবে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উপজেলার জন্য বরাদ্দ এসেছে মাত্র ৩৫০ ডোজ টিকা, যা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য’

ভেটেরিনারি চিকিৎসকদের মতে, লাম্পি স্কিন ডিজিজ (Lumpy Skin Disease-LSD) গরুর একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ। এটি ক্যাপ্রিপক্স ভাইরাসের কারণে হয় এবং মশা, মাছি, টিকসহ বিভিন্ন রক্তচোষা পোকামাকড়ের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত গরুর জ্বর, শরীরে গুটি, ক্ষত, দুধ উৎপাদন কমে যাওয়া ও দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। সময়মতো টিকাদান, আক্রান্ত পশুকে আলাদা রাখা এবং পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এ রোগের বিস্তার অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

আরও পড়ুন

গরুর লাম্পি রোগ হলে করণীয়

জেলা ভেটেনারি সার্জন ডা. শুভ কুমার দাস খামারিদের সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আক্রান্ত পশুকে আলাদা রাখা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।’

লালপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুল্লাহ বলেন, জনবল সংকটের কারণে কিছু তথ্যের গরমিল থাকতে পারে। আমরা প্রকৃত তথ্য যাচাই করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছি।

লাম্পিতে বিপর্যস্ত পুরো উপজেলা, টিকা সংকটে মরছে গরু

তিনি বলেন, নতুনভাবে জুলাই মাসের জন্য ২৫ হাজার ডোজ টিকার চাহিদা পাঠানো হলেও এখনো কোনো সরবরাহ আসেনি। কেন আসেনি টিকার কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো সংকট আছে কিনা সে বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

আরও পড়ুন

গাইবান্ধায় ৮০ পয়সার অ্যানথ্রাক্সের ভ্যাকসিনের দাম ২০ টাকা

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. সেলিম উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাংলাদেশে একমাত্র লাইভ স্টক বিভাগ যারা নিজেরাই ভ্যাকসিন তৈরি করে। তাছাড়া বাজারেও টিকা কিনতে পাওয়া যায়। আমরা জেলার জন্য এ বছর ১ লাখ ডোজ টিকার চাহিদা দিয়েছি। আশা করছি, আগামী ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে আমরা টিকা সরবরাহ পেয়ে যাব। তখন আমরা দ্রুত খামারি বা কৃষক পর্যায়ে টিকা দিতে পারব।’

তিনি বলেন, গ্রামের মানুষ সঠিক পর্যায়ে-এ স্কিন ডিজিজের চিকিৎসা না করে হোমিওপ্যাথি বা ভেষজ চিকিৎসা করেন, এটা ঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে লাম্পি স্কিন ডিজিজের তেমন চিকিৎসা নেই। আক্রান্ত গরুকে আলাদা করে রাখাসহ মশা মাছি থেকে দূরে রাখলে এ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

রেজাউল করিম রেজা/কেএইচকে/এএসএম