বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) অধীন সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালটি লিমিটেড প্রতিষ্ঠান হিসাবে পরিচালিত হবে। কোম্পানি আইনের অধীনে একটি করপোরেট প্রতিষ্ঠান হিসাবে রূপান্তর করতে বিদ্যমান আইনের একটি সংশোধনী বিল জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়ানো এবং হাসপাতালটির চিকিৎসা পরিধি বাড়িয়ে স্বায়ত্তশাসিত মডেলে পরিচালনার জন্য এই আইনি সংস্কার করা হচ্ছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

বর্তমান প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে উচ্চশিক্ষা, চিকিৎসা গবেষণা এবং উন্নত স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আইন-১৯৯৮ অনুযায়ী বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তী সময়ে এর অধীনে একটি সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল নির্মাণ করা হলেও পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও সহায়ক জনবলের অভাব এবং সুস্পষ্ট পরিচালন কাঠামো না থাকায় এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে হাসপাতালটি সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর অধীন এটি পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এ কারণে বিদ্যমান আইনে সংশোধন আনা প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

জানতে চাইলে বিএমএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সি মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল পরিচালনা সহজ করতে এবং চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা ও স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (দ্বিতীয় সংশোধন) বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। গত রোববার স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন। পরে বিলটি অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। সংসদীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে অল্প সময়ের মধ্যেই আইনটি চূড়ান্তভাবে কার্যকর হবে।

তিনি জানান, এটি একটি লিমিটেড কোম্পানি হিসাবে পরিচালিত হবে এবং এ লক্ষ্যে জয়েন্ট স্টক অ্যান্ড কোম্পানিতে নিবন্ধন করা হবে। প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার জন্য একটি বোর্ড অব ডিরেক্টরস গঠন করা হবে। বিএমইউর উপাচার্য বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন এবং উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসাবে থাকবেন।

বোর্ড একজন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিয়োগ দেবে, যিনি প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। হাসপাতালটির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে হাসপাতাল পরিচালনার জন্য সরকারের বার্ষিক বাজেট থেকে থোক বরাদ্দ দেওয়া হবে। পরে হাসপাতালটি নিজস্ব আয় থেকে পরিচালিত হবে এবং ধীরে ধীরে স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। এই কর্মকর্তা বলেন, হাসপাতালটি লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত হলেও বর্তমানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ করা হবে। তারা চাইলে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) যোগ দিতে পারবেন অথবা সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালেই দায়িত্ব পালন করে যেতে পারবেন। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ৯০ শতাংশ এবং সরকারের ১০ শতাংশ শেয়ার থাকবে।

প্রস্তাবিত সংশোধনীতে বিশ্ববিদ্যালয়কে চিকিৎসা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে লাভজনক কিংবা অলাভজনক কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান গঠন, সেসব প্রতিষ্ঠানে শেয়ার ক্রয়, ধারণ ও হস্তান্তরের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিল অনুযায়ী, এ কাঠামোর অধীন আন্তর্জাতিক মানের বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়টি চুক্তিভিত্তিক দেশি-বিদেশি খ্যাতনামা চিকিৎসক, শিক্ষক ও গবেষকদের নিয়োজিত করতে পারবে। পর্যায়ক্রমে অবকাঠামো, জনবল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংযোজনের মাধ্যমে সব ইউনিট পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

প্রসঙ্গত, রোগীদের বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা কমাতে ১ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৭৫০ শয্যার সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালটি ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে উদ্বোধন করা হয়। তবে এখন পর্যন্ত এর জন্য নির্দিষ্ট জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বিএমইউর বর্তমান কর্মী ও বাজেট দিয়েই এখানে সীমিত পরিসরে সেবা দেওয়া হচ্ছে। এই হাসপাতালে পাঁচটি বিশেষায়িত কেন্দ্র রয়েছে। এগুলো হলো-কার্ডিও অ্যান্ড সেরিব্রোভাসকুলার সেন্টার, হেপাটোবিলিয়ারি অ্যান্ড লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সেন্টার, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা সেন্টার, কিডনি রোগ ও ইউরোলজি সেন্টার এবং জরুরি ও ট্রমা সেন্টার। বর্তমানে ১০০ শয্যার আইসিইউর মধ্যে মাত্র ১৮টি শয্যা চালু রয়েছে। এছাড়া ১৩টি আধুনিক অপারেশন থিয়েটারের মধ্যে বর্তমানে মাত্র তিনটি চালু আছে।