প্রথমে বাবা-মা বিশ্বাসই করতে চান না। এরপর শুরু হয় লুকোচুরি। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী কিংবা পরিচিতজন কী বলবে- এই চিন্তায় সন্তানের মাদকাসক্তির বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা করেন তাঁরা। কিন্তু তত দিনে মাদক আরও বেশি গ্রাস করে ফেলে সন্তানকে। চিকিৎসার সুযোগ থাকলেও লোকলজ্জা ও ভয়ের কারণে অনেক পরিবার সময়মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। ফলে শুধু একজন তরুণ নয়, ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে পুরো পরিবার।
মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাত্র ১৩ শতাংশ মাদক ব্যবহারকারী কখনো না কখনো চিকিৎসা বা পুনর্বাসনসেবা পেয়েছেন। অর্ধেকের বেশি মাদক ছাড়ার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু পর্যাপ্ত সহায়তা না পাওয়ায় বেশির ভাগই সফল হতে পারেননি। দেশে মাদকাসক্তিকে এখনো সামাজিক কলঙ্ক হিসেবে দেখা হয়। অথচ এটি একটি চিকিৎসাযোগ্য রোগ। কিন্তু লোকলজ্জা ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বহু মানুষ চিকিৎসার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। কেউ কেউ মৃত্যুঝুঁকির মুখেও পড়ছেন।
বিষয়টি অস্বীকার করছেন না সরকার সংশ্লিষ্টরাও। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত বৃহস্পতিবার বলেছেন, দেশে বিপুলসংখ্যক তরুণ তরুণী মাদকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তাদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা উদ্বেগজনক হলেও চিকিৎসা গ্রহণকারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে খুবই কম। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের অনেকেই সন্তানের মাদকাসক্তির বিষয়টি স্বীকার করতে চান না। কেউ কেউ সমস্যাটি বুঝতে পারলেও সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কায় চিকিৎসার উদ্যোগ নিতে দেরি করেন।
ডিএনসির সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৮৩ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এদের অধিকাংশই পুরুষ হলেও নারী ও শিশুদের মধ্যেও মাদকাসক্তির প্রবণতা রয়েছে। সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, গাঁজা দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক। প্রায় ৬১ লাখ মানুষ গাঁজা ব্যবহার করেন। এরপর রয়েছে ইয়াবা বা মেথামফেটামিন, অ্যালকোহল, কোডিনযুক্ত কাশির সিরাপ, ঘুমের ওষুধ ও হেরোইন। প্রায় ৩৯ হাজার মানুষ ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ করেন, যা তাদের এইচআইভি, হেপাটাইটিসসহ নানা সংক্রামক রোগের ঝুঁকিতে ফেলছে। বেকারত্ব, বন্ধুমহলের প্রভাব, আর্থিক অনিশ্চয়তা, পারিবারিক অস্থিরতা ও মানসিক চাপ মাদক ব্যবহারের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
ঢাকার একটি সরকারি ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আতিকুল ইসলাম বলেন, তিনি ও তাঁর স্ত্রী দুজনই চাকরিজীবী। তাঁদের কর্মব্যস্ততার সুযোগে বড় ছেলে স্কুল ফাঁকি দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করে এবং একপর্যায়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, কিছুদিন ধরে দেখছিলেন, ছেলে বাসায় দেরিতে ফিরছে। কথাবার্তায় অসংলগ্নতা দেখা যাচ্ছিল। পরে বুঝতে পারেন, সে মাদক নিচ্ছে। তারা অনেকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন ছেলেকে। লোক জানাজানি হবে তাই চিকিৎসা নেননি, রিহ্যাবেও দিতে চাননি। আতিকুল বলেন, এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে বাসায় কিছু রাখা যায় না। সুযোগ পেলেই বিক্রি করে দেয়। কিছু বললে উল্টো হুমকি দেয়।
মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের নার্সিং সুপারভাইজার তহমিনা আক্তার আজকের পত্রিকাকে বলেন, অধিকাংশ পরিবার চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে অনেক দেরি করে ফেলে। তাঁর ভাষ্য, মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা অনেক সময় এতটাই সহিংস হয়ে ওঠে যে পরিবার তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। শেষ পর্যায়ে যখন আর কিছু করার থাকে না, তখন তারা নিরাময় কেন্দ্রে আসে।
ঢাকার একটি বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্রের চিকিৎসক ডা. মো. শাহেদুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, বেশির ভাগ পরিবার প্রথমে বিশ্বাসই করতে চায় না যে তাদের সন্তান মাদকাসক্ত হতে পারে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার পরও তারা বিষয়টি গোপন করার চেষ্টা করে। সমাজে এখনো মাদকাসক্তিকে রোগ হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়নি। অনেকে ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়ে দিতে চান, তাড়াহুড়ো করে বিয়ে দিতে চান কিংবা ব্যবসায় জড়িয়ে দিতে চান। তারা মনে করেন, এতে সমস্যার সমাধান হবে।
টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুকের মতে, সামাজিক কলঙ্কের ভয় থেকেই পরিবারগুলো বিষয়টি লুকিয়ে রাখতে চায়। তিনি বলেন, সমাজে এখনো মনে করা হয়, পরিবারের কেউ মাদকাসক্ত হলে সেটি পরিবারের অসম্মানের বিষয়। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের সমালোচনার ভয় থেকেই অনেক পরিবার সমস্যাটি গোপন রাখে। কিন্তু এতে সমস্যার সমাধান হয় না, বরং আরও জটিল হয়ে ওঠে।
ডিএনসির চিকিৎসা ও পুনর্বাসনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মাদকাসক্ত ব্যক্তি শুধু নিজের জীবনই নয়, পুরো পরিবারের স্বাভাবিক জীবনকেও বিপর্যস্ত করে তোলে। চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হওয়ায় অনেকেই আরও গভীরভাবে মাদকের জগতে তলিয়ে যান। কেউ কেউ জটিল মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হন, আবার অনেকের মধ্যে সহিংস আচরণ দেখা যায়।
গত শুক্রবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, ১ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহে ২০০ শয্যার আধুনিক মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এসব কেন্দ্রে চিকিৎসার পাশাপাশি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মাদকাসক্তদের সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা থাকবে। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, শুধু নতুন নিরাময় কেন্দ্র নির্মাণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। সামাজিক ট্যাবু ভেঙে মাদকাসক্তিকে রোগী হিসেবে চিহ্নিত করা এবং দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনতে পারলেই সমাধান মিলতে পারে।








