দেশে মাদকের বিস্তার ঘটেছে আশঙ্কাজনক হারে। সরকারি হিসাবে জনসংখ্যার ৫ শতাংশ মাদকাসক্ত বলা হলেও বাস্তবে সংখ্যাটি অনেক বেশি। সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো, মাদকসেবনকারীদের প্রায় ৮০ শতাংশই কিশোর ও তরুণ। পরিস্থিতির ভয়াবহতা এমন যে মাদক আজ বাংলাদেশের অন্যতম বড় জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। এটি শুধু একটি আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; বরং এটি জনস্বাস্থ্য, জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি, শিক্ষা, পরিবার, নৈতিকতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য বহুমাত্রিক হুমকি।
মাদক পাচারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ করিডর : বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান মাদক পাচারকারীদের জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক। দেশটির প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমারের সীমান্ত রয়েছে, যা বিশ্বের কুখ্যাত ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ অঞ্চলের খুব কাছাকাছি। এই অঞ্চল বহু দশক ধরে ইয়াবা, হেরোইন ও সিনথেটিক মাদক উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্র হিসাবে পরিচিত। ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে ফেনসিডিল, গাঁজা, হেরোইন, ইঞ্জেকশনজাতীয় মাদকসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ দ্রব্য বাংলাদেশে প্রবেশ করে। অন্যদিকে মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে বিশেষ করে ইয়াবার বিশাল চালান দেশে আসে। সমুদ্রপথ এবং আকাশপথও আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের জন্য ব্যবহৃত হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে অনেক সময় আন্তর্জাতিক ট্রানজিট রুট হিসাবেও ব্যবহার করা হয়।
মাদকের পরিবর্তিত চিত্র : একসময় বাংলাদেশে সীমিত আকারে গাঁজা ও ফেনসিডিলের ব্যবহার দেখা যেত। কিন্তু গত দুই দশকে ইয়াবা, আইস, কোকেন, এলএসডি, এমডিএমএ এবং বিভিন্ন ধরনের কৃত্রিম মাদক দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। সরকারি হিসাবে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে : গাঁজায় ৫২ শতাংশ, ইয়াবায় ২০ শতাংশ, মদ্যপানে ১৭ শতাংশ, ফেনসিডিল ও অন্যান্য মাদকে ১১ শতাংশ। বর্তমানে মাদক ব্যবসা একটি উচ্চ মুনাফার অবৈধ শিল্পে পরিণত হয়েছে। অল্প সময়ে বিপুল অর্থ উপার্জনের লোভে অনেক যুবক এই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে। মাদক নিয়ন্ত্রণ ও গোয়েন্দা সংস্থার বিভিন্ন সময় প্রকাশিত পরিসংখ্যানে সারা দেশে মাদক কারবারির সংখ্যা প্রায় ২১ হাজার বলে উল্লেখ করা হলেও প্রকৃত সংখ্যা আরও কয়েকগুণ হবে।
কেন কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসছে না : সরকার বিভিন্ন সময়ে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেছে, যথা : মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কার্যক্রম; আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান; সীমান্তে নজরদারি; পুনর্বাসন কেন্দ্র; জনসচেতনতা কর্মসূচি, তবুও কাঙ্ক্ষিত ফল আসছে না। এর অন্যতম কারণ হিসাবে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন-প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও দুর্বলতা, সীমান্তের দুর্বলতা, আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের ব্যাপকতা, দুর্বল তদন্ত ও সাক্ষ্যের অপ্রতুলতা, সনাতনী বিচারে দীর্ঘসূত্রতা, পুনর্বাসনের সীমাবদ্ধতা, নতুন মাদকের দ্রুত বিস্তার, পারিবারিক, সামাজিক ও শিক্ষকদের পর্যাপ্ত চাপের ব্যর্থতা।
সীমান্ত নিয়ন্ত্রণই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ : মাদক প্রবেশ বন্ধ না করতে পারলে ভেতরের অভিযান দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে না। সীমান্তে আধুনিক প্রযুক্তি, গোয়েন্দা নজরদারি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করে বিশেষ কম্বিং অপারেশন পরিচালনার বিষয়ে অনেক বিশেষজ্ঞ গুরুত্বারোপ করেন। সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে আরও সমন্বয় জরুরি।
আইনের কঠোরতা : অনেকের মতে, মাদক পাচার, উৎপাদন ও বড় আকারের সরবরাহের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান থাকা উচিত। অন্যদিকে মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলেন, শাস্তির কঠোরতার পাশাপাশি নিশ্চিত বিচার, দুর্নীতিমুক্ত তদন্ত এবং অপরাধ প্রতিরোধই বেশি কার্যকর। বাংলাদেশে অতীতে বিএনপি সরকার অ্যাসিড সন্ত্রাস দমনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান কঠোর আইনপ্রণয়ন করে ও বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। কঠোর প্রশাসনিক ও সামাজিক উদ্যোগ নিয়ে আইন কার্যকর বাস্তবায়ন করতে পারলে মাদক নির্মূলে সফলতা আসতে পারে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা : মাদক সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন দেশ ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। মাদক সমস্যা সমাধানে সবচেয়ে সফল ও আলোচিত দেশ পর্তুগাল। ২০০১ সালে তারা একটি বৈপ্লবিক নীতি গ্রহণ করে, যার মূল লক্ষ্য ছিল মাদককে ‘অপরাধ’ হিসাবে না দেখে একে একটি ‘জনস্বাস্থ্য সমস্যা’ হিসাবে বিবেচনা করা। মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর মাদক পাচারের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর আইনপ্রয়োগের জন্য পরিচিত। মালয়েশিয়ায় (মাদক অপব্যবহার আইন) অনুযায়ী মাদক পাচার, আমদানি বা রপ্তানি অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। কারও কাছে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি (যেমন ১৫ গ্রাম হেরোইন, ৩০ গ্রাম কোকেন বা ৫০০ গ্রাম গাঁজা) মাদক পাওয়া গেলেই তাকে মাদক পাচারকারী হিসাবে বিবেচনা করা হয় এবং আদালতে দোষী সাব্যস্ত হলে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। মালয়েশিয়ার আইনে (বিপজ্জনক মাদক আইন) দেশটিতে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো-টলারেন্স নীতি পালন করা হয়। নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়ে বেশি মাদকদ্রব্য (যেমন ২০০ গ্রামের বেশি গাঁজা বা ১৫ গ্রামের বেশি হেরোইন) কাছে থাকলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও বেত্রাঘাতের বিধান রয়েছে। ফিলিপাইনে মাদক পাচারের বিরুদ্ধে প্রধান ও কঠোরতম আইনটি হলো রিপাবলিক অ্যাক্ট নম্বর ৯১৬৫, যা কমপ্রেহেনসিভ ড্যানজারিয়াস ড্রাগস অ্যাক্ট অব ২০০২ নামে পরিচিত। এ আইনের অধীনে মাদক পাচার, উৎপাদন, এবং বিক্রির জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড থেকে শুরু করে কড়া শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের শাসনামলে (২০১৬-২০২২) তার ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধে’র সময় মাদক নির্মূলে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তি যদি প্রতিরোধের চেষ্টা করে বা পুলিশকে হুমকি দেয়, তবে তাকে ‘দেখামাত্র গুলি’ করতে। এই নীতিমালার কারণে পুলিশ ও অজ্ঞাত বন্দুকধারীদের হাতে হাজার হাজার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যা বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রে আইনপ্রয়োগের পাশাপাশি চিকিৎসা, পুনর্বাসন, প্রতিরোধমূলক শিক্ষা এবং গোয়েন্দা নজরদারির ওপরও জোর দেওয়া হয়। মাদক নেটওয়ার্ক বা ব্যবসার অজুহাতে অন্তত দুটি দেশে (পানামা ও ভেনিজুয়েলা) বলপূর্বক সরকার পরিবর্তন করে রাষ্ট্রপ্রধানকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। বাংলাদেশের জন্য একক কোনো বিদেশি মডেল নয়; বরং কঠোর আইনপ্রয়োগ, সীমান্ত নিরাপত্তা, দুর্নীতি দমন, পুনর্বাসন এবং জনসচেতনতার সমন্বিত কৌশলই বেশি কার্যকর হতে পারে।
করণীয় : বাংলাদেশকে মাদকমুক্ত করতে হলে মাদক পাচার, ব্যবসা, বহন, সরবরাহ, এবং নেটওয়ার্কের জন্য সংসদে মৃত্যুদণ্ডের আইন পাশ করতে হবে। মাদক নির্মূলে দ্রুত বিচার আইন ও বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যেতে পারে। প্রশাসন জানে কারা এলাকার মাদক কারবারি। তাই সারা দেশে মাদক ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারীদের তালিকা প্রণয়ন করে গ্রেফতারে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে। মিয়ানমার সীমান্তে সেনাবাহিনী মোতায়েন করে কম্বিং অপারেশন করে সব কারবারি ও নেটওয়ার্ক ধরে ফেলতে হবে। সীমান্ত এলাকায় ড্রোন, স্মার্ট নজরদারি, থার্মাল ক্যামেরা ও আধুনিক স্ক্যানিং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। বর্ডারে এবং মাদকসংশ্লিষ্ট এলাকায় আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে। স্কুল-কলেজের আশপাশকে মাদকমুক্ত অঞ্চল ঘোষণা করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মাদকবিরোধী সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে নিয়মিত মাদকবিরোধী কাউন্সেলিং সেবা চালু করতে হবে। মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ সম্প্রসারণ করতে হবে। মাদক সিন্ডিকেটের অর্থের উৎস, ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও হুন্ডি লেনদেনের ওপর সমন্বিত নজরদারি জোরদার করতে হবে। অর্থপাচার ও হুন্ডি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। মাদক উৎপাদন, পাচার ও অর্থায়নের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অবৈধ সম্পদ তদন্ত করে আদালতের আদেশ অনুযায়ী জব্দ ও রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কঠোর আইনপ্রয়োগের পাশাপাশি স্বচ্ছ বিচার, দুর্নীতি দমন, আর্থিক নেটওয়ার্ক ধ্বংস, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং পুনর্বাসনের বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব পায়। এই সমন্বিত পদ্ধতিই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর হবে।
উপসংহার : মাদক শুধু একটি অবৈধ ব্যবসা নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে পরিচালিত নীরব যুদ্ধ। একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ প্রজন্ম। সেই প্রজন্ম যদি মাদকের কারণে ধ্বংস হয়ে যায়, তবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অবকাঠামো কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতি কোনো কিছুরই স্থায়ী মূল্য থাকবে না। মাদক নির্মূল করতে হলে শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, শক্তিশালী সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, কার্যকর বিচারব্যবস্থা, সামাজিক প্রতিরোধ এবং পরিবারভিত্তিক সচেতনতা। রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার ও নাগরিক-সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই একটি মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
মো. শামসুল আলম : সিনিয়র ব্যুরোক্রেট








