দেশের ৮টি ওষুধ কোম্পানির ১৪টি কাশির সিরাপ পরীক্ষা করে ‘ডেক্সট্রোমেথরফেন’ নামের একটি উপাদান পেয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। উপাদানটি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ‘ক’ শ্রেণির তফসিলভুক্ত মাদক। এ বিষয়ে কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করেও সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর বলেছে, অপব্যবহার রোধে ডেক্সট্রোমেথরফেনযুক্ত ওষুধ প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি না করার বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

আলোচ্য সিরাপগুলোর প্রস্তুতকারী কোম্পানির ভাষ্য, ডেক্সট্রোমেথরফেন কাশির ওষুধে ব্যবহৃত একটি স্বীকৃত উপাদান। সরকারি অনুমতি এবং নির্ধারিত মাত্রা অনুসরণ করেই ওষুধগুলো প্রস্তুত করা হয়। তবে অতিরিক্ত সেবনে নেশাজাতীয় প্রভাবসহ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে।

অভিযোগ উঠেছে, সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ কাশির ওষুধ ফেনসিডিলের মতো মাদকের চোরাচালান কমে যাওয়ার পর থেকে মাদকাসক্তদের একটি অংশ বিকল্প হিসেবে ডেক্সট্রোমেথরফেনযুক্ত কাশির সিরাপ সেবন করছে। এসব সিরাপ বেশি গ্রহণ করলে নেশাজাতীয় প্রভাব তৈরি হতে পারে। রাজধানীর কয়েকটি এলাকার ফার্মেসিতে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, প্রেসক্রিপশন ছাড়াই এসব সিরাপ কেনা যায়। কেউ কেউ চিকিৎসার প্রয়োজন ছাড়াও নেশা করতেও এসব সিরাপ কিনছেন বলে বিক্রেতাদের ধারণা।

কাশির সিরাপের রাসায়নিক পরীক্ষার পর ডেক্সট্রোমেথরফেনযুক্ত ওষুধের আমদানি এবং বিক্রি সীমিত করতে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে চিঠি দিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। একই সঙ্গে এসব ওষুধ প্রস্তুতকারী, বিপণনকারী ও বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও সুপারিশ করেছে তারা।

গত ১৩ মার্চ বগুড়া সদর থানায় মাদকসংক্রান্ত একটি মামলা হয়। সেই মামলার আলামত পরীক্ষার অংশ হিসেবে ডিএনসির রাজশাহী বিভাগীয় পরীক্ষাগারে ১৪টি কাশির সিরাপের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। গত ১৬ মার্চ ডিএনসির মহাপরিচালককে এক চিঠিতে রাজশাহী বিভাগীয় রাসায়নিক পরীক্ষাগারের পরীক্ষক মো. শফিকুল ইসলাম সরকার বলেন, বেক্সিমকো, স্কয়ার, এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস, অপসোনিন ফার্মা, এসিআই, একমি ল্যাবরেটরিজ, বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস ও অ্যারিস্টোফার্মার ১৪টি কাশির সিরাপে ডেক্সট্রোমেথরফেন পাওয়া গেছে।

অপব্যবহারে উৎসাহিত হওয়ার আশঙ্কায় সংশ্লিষ্ট সিরাপগুলোর ব্র্যান্ড নেম প্রকাশ করছে না আজকের পত্রিকা।

ডেক্সট্রোমেথরফেন দেশের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের প্রথম তফসিলের ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত একটি নিয়ন্ত্রিত মাদকদ্রব্য। আইন অনুযায়ী এর সহযোগে যেকোনো অনুপাতে প্রস্তুত করা ওষুধ মাদক হিসেবে গণ্য হবে।

তবে এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল ফার্মাসি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মুহিত আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বৈজ্ঞানিক তথ্যের ওপর নির্ভর করে ডেক্সট্রোমেথরফেনকে ‘ক’ শ্রেণির মাদক হিসেবে তালিকাভুক্ত না করলেও হতো। তবে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া এ ধরনের সিরাপ বিক্রি নিষিদ্ধ করা উচিত।’

ড. মুহিত প্রসঙ্গত উল্লেখ করেন, সাধারণত হেরোইন, গাঁজা ও কোকেনের মতো মাদক ‘ক’ শ্রেণির উপযুক্ত। অন্যদিকে নিয়ন্ত্রিত উপাদান হলেও ডেক্সট্রোমেথরফেন বহু দেশে ওষুধের উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে লেখা ডিএনসির চিঠিতে বলা হয়েছে, ডেক্সট্রোমেথরফেনযুক্ত সিরাপ দীর্ঘস্থায়ী কাশি নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়। তবে দেশে ফেনসিডিলসহ প্রচলিত মাদকদ্রব্য সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিকল্প হিসেবে এই উপাদানযুক্ত কাশির সিরাপ যুবসমাজ ও মাদকাসক্তরা ব্যবহার করছে। এটি সেবনে হাইপোম্যানিয়া বা তীব্র সাইকোসিস, শ্বাসকষ্ট, জিহ্বা বা গলায় ফোলাভাব, মারাত্মক মাথা ঘোরা, অস্থিরতা ও খিঁচুনির মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত সেবনে মৃত্যুও ঘটতে পারে।

এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকাসহ নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার ঘেঁটে দেখা যায়, ডেক্সট্রোমেথরফেন মরফিনের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সিনথেটিক ওষুধ, যা কাশি নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হয়। আন্তর্জাতিকভাবে ডেক্সট্রোমেথরফ্যান অবৈধ উপাদান নয়। এটি দিয়ে তৈরি সর্দি-কাশির ওষুধ বিশ্বের বহু দেশে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ অঙ্গরাজ্যে প্রেসক্রিপশন ছাড়া কেনা যায়। তবে কিছু দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে ১৮ বছরের কম বয়সীদের এই ওষুধ কেনার ওপর আইনগত নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফ্রান্স, রাশিয়া, সুইডেন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো কিছু দেশে ডেক্সট্রোমেথরফেন প্রেসক্রিপশন ছাড়া কেনা যায় না বা তা নিয়ন্ত্রিত পদার্থ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ। ব্রিটানিকায় বলা হয়েছে, মরফিন-সংশ্লিষ্ট অনেক উপাদানের মতো এটি সাধারণত আসক্তি তৈরি করে না। তবে বিনোদনমূলক মাদক হিসেবে এর অপব্যবহার করা হয়। এটি বেশি মাত্রায় গ্রহণ করলে ইন্দ্রিয়গত উপলব্ধিতে পরিবর্তন ঘটাতে এবং বিভ্রম সৃষ্টি করতে পারে। এ ছাড়া দীর্ঘদিন অপব্যবহারের ফলে স্মৃতিশক্তি ও অন্যান্য মানসিক কার্যক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

রাজশাহী বিভাগীয় রাসায়নিক পরীক্ষাগারের প্রতিবেদন পাওয়ার পর ডিএনসির প্রধান কার্যালয় গত ২৯ জুন ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে চিঠি দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের প্রথম তফসিলের বিধান অনুযায়ী যে বাণিজ্যিক নাম বা আকারেই থাকুক না কেন, ডেক্সট্রোমেথরফেন নিয়ন্ত্রিত মাদকদ্রব্যের আওতায় পড়ে। এই উপাদান সহযোগে প্রস্তুত করা ওষুধের আমদানি এবং বিক্রয় সীমিতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএনসির একজন কর্মকর্তা জানান, কোন কোন প্রতিষ্ঠান ডেক্সট্রোমেথরফেন ব্যবহার করে ওষুধ তৈরি করছে, সে বিষয়ে অধিদপ্তরের কাছে আগে সুস্পষ্ট তথ্য ছিল না। তবে বিষয়টি এখন সামনে আসার পর খোঁজ নেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। এসব সিরাপ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওষুধের রাসায়নিক পরীক্ষা করতে অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিএনসির রাজশাহী বিভাগীয় রাসায়নিক পরীক্ষাগারের পরীক্ষক শফিকুল ইসলাম সরকার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ফেনসিডিলের বিকল্প হিসেবে অনেকে এসব সিরাপ ব্যবহার করছে। এর আগেও তিনটি রাসায়নিক পরীক্ষায় কাশির সিরাপে মাদকের উপাদান পাওয়ার পর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে অধিদপ্তর দৃশ্যত তা আমলে নেয়নি।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএনসির একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এসব সিরাপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি ধাপাচাপা দিয়ে রেখেছিল। নতুন নমুনা পরীক্ষার ফলাফল হাতে পাওয়ার পর বর্তমান প্রশাসন পদক্ষেপ নিয়েছে।’

এ বিষয়ে জানতে আজকের পত্রিকার পক্ষ থেকে সম্প্রতি ডিএনসির মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। গত রোববার অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল হালিম রাজ মহাপরিচালকের লিখিত বক্তব্য পাঠিয়েছেন। এতে হাসান মারুফ বলেছেন, ‘বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের বিধান এবং সংশ্লিষ্ট সিরাপগুলোর অপব্যবহারের আশঙ্কা বিবেচনায় এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এ জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ইতিমধ্যে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে চিঠি দিয়েছে।’

১৪ সিরাপ প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ডেক্সট্রোমেথরফেন কাশির ওষুধে ব্যবহৃত স্বীকৃত উপাদান। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুমতি এবং নির্ধারিত মাত্রা অনুসরণ করেই তাঁরা ওষুধ প্রস্তুত করেন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সেবন করলে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তবে অতিরিক্ত সেবনে নেশাজাতীয় প্রভাব এবং বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে।

৮টি ওষুধ কোম্পানির মধ্যে ৫টির বক্তব্য পেয়েছে আজকের পত্রিকা। অপসোনিন ফার্মার জেনারেল ম্যানেজার (প্রোডাক্ট ম্যানেজমেন্ট) আকতার হোসাইনের দাবি, তাঁদের সিরাপে ডেক্সট্রোমেথরফেনের মাত্রা স্বাভাবিক। নিয়ম মেনে সেবন করলে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তবে অতিরিক্ত সেবন করলে নেশা হতে পারে।

এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ম্যানেজার (রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স) শাহমির হোসাইন বলেন, ‘কাশির সিরাপে এটা থাকতেই পারে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনুমতি নিয়ে এই সিরাপ তৈরি করা হয়। আইনের বাইরে কিছু করার সুযোগ নেই।’

স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের জেনারেল ম্যানেজার (মার্কেটিং) আতিকুজ্জামান বলেন, ‘১৯৫৩ সাল থেকে ডেক্সট্রোমেথরফেন কাশির সিরাপে ব্যবহার হয়ে আসছে। সরকারের অনুমতি নিয়েই ব্যবসা করছি। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর যদি ডেক্সট্রোমেথরফেন ব্যবহার করতে না দেয়, তাহলে আমরা আর এটি ব্যবহার করব না। ওষুধের প্যাকেটেও প্রয়োজনীয় তথ্য উল্লেখ করা হয়। কেউ অতিরিক্ত সেবন করলে অন্য ওষুধের ক্ষেত্রেও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে।’

বিকন ফার্মার পরিচালক (সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং) এস এম মাহমুদুল হক পল্লব বলেন, ‘আমাদের মতো অনেক কোম্পানির কাশির সিরাপেই ডেক্সট্রোমেথরফেন রয়েছে। কাশির ওষুধ বানাতে এটি লাগে।’

এসিআই ফার্মাসিউটিক্যালসের মার্কেটিং ম্যানেজার সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর যদি ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে এ বিষয়ে জানায় এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে আমরাও ওই উপাদান ছাড়া কীভাবে সিরাপ তৈরি করা যায়, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেব।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ও মুখপাত্র ড. আকতার হোসেন গত সোমবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ওষুধ তৈরি করতে অনেক ধরনের উপাদান ব্যবহার করা হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ডেক্সট্রোমেথরফেনকে তফসিলভুক্ত ‘ক’ শ্রেণির মাদক বলতে পারে। তাদের দিক থেকে বিষয়টি ঠিক আছে। কিন্তু ওষুধের কার্যকারিতা এবং ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ঔষধ প্রশাসনের নিজস্ব কিছু নিয়মনীতি রয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর যেহেতু এ বিষয়ে চিঠি দিয়েছে, আমরা তাদের বিষয়টিও আলোচনায় তুলব। আর অপব্যবহার ঠেকাতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ডেক্সট্রোমেথরফেনযুক্ত ওষুধ প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি না করার বিষয়ে আবারও জোর দেওয়া হবে।’