প্রশ্নফাঁসের পুনরাবৃত্তি এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে চলমান যুব আন্দোলনের মধ্যে প্রথমবারের মতো এ বিষয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। স্থানীয় সময় গতকাল বৃহস্পতিবার তিনি প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে ফাস্ট-ট্র্যাক বা দ্রুত বিচার আদালত গঠনের ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘যুবসমাজের কল্যাণ ও ভবিষ্যতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই নয়’ এবং ‘যারা আমাদের যুবসমাজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করার চেষ্টা করবে, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যারের খবরে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মোদি লেখেন, ‘যুবসমাজের কল্যাণ ও ভবিষ্যতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই নয়! প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে আমরা ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছি। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সুরক্ষায় আমাদের ধারাবাহিক পদক্ষেপেরই এটি অংশ। যারা আমাদের যুবসমাজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করার চেষ্টা করবে, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’

তবে মোদি তাঁর বক্তব্যে জন্তর মন্তরে চলমান শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি কিংবা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের বলপ্রয়োগের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার এই প্রতিশ্রুতি নতুন নয়। গত কয়েক বছরে সংসদ ও নির্বাচনী প্রচারণায় একাধিকবার প্রায় একই ভাষায় এমন আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মোদি।

এর আগে, ২০২৪ সালের ২ জুলাই রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের জবাবে লোকসভায় মোদি বলেন, যারা যুবসমাজকে প্রতারণা করেছে, তাদের ‘সরকার কোনোভাবেই ছাড় দেবে না।’ তিনি বলেন, ‘মাননীয়া রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণেও প্রশ্নফাঁস নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আমি দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থী ও তরুণকে বলতে চাই, এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে সরকার অত্যন্ত আন্তরিক এবং যুদ্ধকালীন তৎপরতায় একের পর এক পদক্ষেপ নিচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যারা যুবসমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে খেলেছে, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। নিট (NEET) মামলায় সারা দেশে ধারাবাহিকভাবে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকার ইতোমধ্যে একটি কঠোর আইন প্রণয়ন করেছে। পুরো পরীক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।’

পরদিন ৩ জুলাই রাজ্যসভায়ও একই ধরনের বক্তব্য দেন মোদি। তিনি বলেন, ‘আমি দেশের যুবসমাজকে আশ্বস্ত করছি, যারা তোমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে, তাদের এই সরকার ছাড় দেবে না। যারা দেশের যুবসমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে, তাদের কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত করতে একের পর এক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সংসদে আমরা এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর আইন করেছি। আমরা পুরো ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করছি, যাতে ভবিষ্যতে আমার দেশের যুবসমাজকে আর কোনো অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে না হয় এবং তারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করে তাদের প্রাপ্য অর্জন করতে পারে। আমরা সেই লক্ষ্যেই কাজ করছি।’

মোদির ওই বক্তব্য আসে ২০২৪ সালের ১৮ জুন অনুষ্ঠিত ইউজিসি-নেট (UGC-NET) পরীক্ষা প্রশ্নপত্রের গোপনীয়তা ভঙ্গের অভিযোগে ১৯ জুন বাতিল হওয়ার পর। একই সময়ে ৫ মে অনুষ্ঠিত নিট (NEET-UG) পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে দেশজুড়ে বিক্ষোভ চলছিল।

তারও আগে, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১৭ তম লোকসভার শেষ অধিবেশনে মোদি বলেন, প্রশ্নফাঁসের কারণে যুবসমাজ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল বলেই তাঁর সরকার ওই মাসে পাবলিক এক্সামিনেশন (প্রিভেনশন অব আনফেয়ার মিনস) বিল–২০২৪ পাস করেছে। তিনি বলেন, ‘প্রশ্নফাঁস আমাদের যুবসমাজকে উদ্বিগ্ন ও উৎকণ্ঠিত করত। যুবসমাজ পুরো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ছিল। তাই সংসদ একটি কঠোর আইন পাস করেছে।’

রাজস্থানে বিজেপি সরকারের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে এক সমাবেশে মোদি বলেন, একসময় প্রশ্নফাঁস ‘রাজস্থানের পরিচয়ে’ পরিণত হয়েছিল, তবে বিজেপি সরকার তদন্ত শুরু করেছে। তিনি বলেন, ‘আগের সরকার রাজস্থানের যুবসমাজের সঙ্গে অবিচার করেছে। প্রশ্নফাঁস ও নিয়োগ জালিয়াতি রাজস্থানের পরিচয়ে পরিণত হয়েছিল। বিজেপি সরকার তদন্ত শুরু করেছে এবং বহুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। পাশাপাশি বিজেপি সরকার নিয়োগ কার্যক্রমও সম্পন্ন করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রশ্নফাঁস আমাদের যুবসমাজকে উদ্বিগ্ন ও উৎকণ্ঠিত করত। যুবসমাজ পুরো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ছিল। তাই সংসদ একটি কঠোর আইন পাস করেছে।’

রাজস্থানে ২০২৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে মোদি কংগ্রেসের বিরুদ্ধে রাজ্যে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিক্রির অভিযোগ আনেন এবং বলেন, প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের কারাগারে পাঠানো হবে। তিনি বলেন, ‘দেশের নানা প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার জন্য কোটায় আসে। গত পাঁচ বছরে কংগ্রেস বারবার যুবসমাজের স্বপ্ন ধ্বংস করেছে। কংগ্রেস সব পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিক্রি করেছে। আমি আপনাদের আশ্বস্ত করছি, প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের কারাগারের পেছনে পাঠানো হবে। এটাই মোদির গ্যারান্টি।’

এরও এক মাস আগে, ২০২৩ সালের ৫ অক্টোবর রাজস্থানে নির্বাচনী প্রচারণায় মোদি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠিত হলে কংগ্রেসের লালিত "প্রশ্নফাঁস মাফিয়া"কে ধ্বংস করা হবে। তিনি বলেন, ‘কংগ্রেসের প্রশ্নফাঁস মাফিয়া রাজস্থানের লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নষ্ট করেছে। রাজস্থানের যুবসমাজ ন্যায়বিচার চাইছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচনের সময় দুর্নীতি দূর করার প্রতিশ্রুতি দিলেও কংগ্রেস যুবসমাজকে প্রশ্নফাঁস মাফিয়ার হাতে তুলে দিয়েছে। নতুন বিজেপি সরকার এ ধরনের প্রশ্নফাঁস মাফিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে। মনে রাখবেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাজস্থান কর্মসংস্থান পাবে, আর প্রশ্নফাঁস মাফিয়ার ধ্বংস হবে।’

চলমান আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে মোদির সাম্প্রতিক ঘোষণার সঙ্গে তাঁর অতীতের এসব বক্তব্যের মিল থাকায় বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছেন, আগের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়িত না হওয়ার পরও কেন একই ধরনের আশ্বাস আবারও দেওয়া হচ্ছে।