রাজশাহীর গোদাগাড়ীর এক মাদ্রাসাশিক্ষক বেশ একটা বীরত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। তিনি তাঁর শিক্ষার্থীকে মারধর করে দাঁত ভেঙে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আহত শিক্ষার্থীর মা বলেছেন, ‘আসরের নামাজের সময় সবাই খেলে। ওই সময় পাশে এক বড় ভাই মোবাইল ফোন দেখছিল। সেখানে আমার ছেলেও যায়। সেও মোবাইল দেখছিল। তখন শিক্ষক ইয়াসিন আলী তাকে দেখেন। দেখার পর আমার ছেলের গলা টিপে ধরেন। তারপর একটা থাপ্পড় দেন। সে তখন দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যায়।

এরপর তুলে ধরে নাকের কাছে মারেন। এ সময় তিনটি দাঁত নড়ে গেছে। একটা দাঁতের অর্ধেক ভেঙে পড়ে গেছে। রক্ত পড়তে শুরু করে। জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থা। এই সময় তাকে আবার তুলে বল যেভাবে ছুড়ে মারে, ওইভাবে মেরেছে।’ মায়ের ভাষ্যটি পুরো তুলে দেওয়ার কারণ হলো, একজন শিক্ষক কতটা নৃশংস হলে একটি ছোট ছেলের ওপর এভাবে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারেন, তা পাঠককে জানানো। আমাদের দেশে শিক্ষকেরা কি এ রকম নৃশংস হয়ে উঠছেন? কেন হয়ে উঠছেন, তা নিয়ে কি কোনো গবেষণা হয়েছে?

মাদ্রাসাশিক্ষকদের কাছে শিশুরা যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে তা খুবই চিন্তার বিষয়। মাদ্রাসাশিক্ষকদের নিয়ে মাঝেমধ্যে যেসব খবর প্রকাশিত হয়, তা মোটেই স্বাভাবিক নয়। তাতে তাদের শিক্ষা-সংস্কৃতি-আদব ইত্যাদির ব্যাপারে সন্দেহ জাগে। বিশেষ করে, শিশুদের সঙ্গে অনৈতিক আচরণের জন্য যখন তাঁরা খবর হন, তখন গোটা জাতির জন্য তা লজ্জার ব্যাপার হয়ে ওঠে। মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সদস্যরা কি বিষয়গুলো খতিয়ে দেখেন না? শিক্ষকের সঙ্গে সম্মানের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু তাঁরা যদি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নানা ধরনের অন্যায় আচরণ করতে থাকেন, তাহলে সেই সম্মান তাঁরা পাবেন কী করে?

জুবায়ের নামের ১৩ বছরের যে ছেলেটিকে মারধর করা হয়েছে, তার মানসিক অবস্থা এখন কেমন, তা চিকিৎসকেরাই বলতে পারবেন। তবে ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী মাদ্রাসায় গিয়ে প্রতিবাদ করেছেন। এতে বোঝা যায়, ঘটনাটি মারাত্মক হয়ে ধরা দিয়েছে এলাকাবাসীর মনে। এলাকাবাসী উপযুক্ত বিচার চায়। বিচার না হলে মাদ্রাসায় তালা দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তাঁরা। এলাকার মানুষ যদি ঘটনাটিকে আমলে নিয়ে উপযুক্ত বিচারের দাবিতে অনড় থাকেন, তাহলে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত হবে, বিচারও হবে। কিন্তু এরই মধ্যে যদি ঘটনার মীমাংসা করার জন্য কোনো মহল আক্রান্ত ছেলেটি বা তার পরিবারকে চাপ দেয়, তাহলে বিচার আর হবে না। মামলা না হলে পুলিশও তদন্তে এগিয়ে আসবে না। তাই ঘটনাটিকে ধামাচাপা দেওয়ার কোনো সুযোগ না দিয়ে বিচারের দাবিতে অনড় থাকুক এলাকাবাসী।

শিক্ষকেরা কখন উপলব্ধি করবেন যে শিক্ষার্থীকে শারীরিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, গুরুতর মানসিক নির্যাতন করার কোনো অধিকার তাঁর নেই? কখন তাঁরা শিক্ষার্থীর নির্ভরযোগ্য অভিভাবক ও বন্ধু হয়ে উঠবেন? শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক গঠনে এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।