পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে, সমুদ্রের নীল জগৎ থেকে শুরু করে দুর্গম বরফে ঢাকা মেরু অঞ্চল কিংবা আমাজনের গহিন অরণ্যে যাঁর কণ্ঠস্বর আমাদের প্রকৃতির ঐক্যতানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে, তিনিই হচ্ছেন স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো। তাঁর শততম জন্মবার্ষিকীতে আমরা কেবল একজন সম্প্রচারক বা প্রকৃতিবিদকে নয়, বরং এই গ্রহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক অভিভাবককে উদ্যাপন করছি।
১৯২৬ সালে জন্ম নেওয়া ডেভিড অ্যাটেনবরোর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল যখন টেলিভিশন ছিল সাদাকালো এবং প্রযুক্তি ছিল অত্যন্ত সীমিত। কিন্তু তাঁর কল্পনাশক্তি ছিল সীমাহীন। ১৯৫৪ সালে জু কোয়েস্ট সিরিজের মাধ্যমে তিনি বন্য প্রাণীকে মানুষের ড্রয়িংরুমে নিয়ে আসার যে যাত্রা শুরু করেছিলেন, তা গত সাত দশকে এক কাব্যিক রূপ ধারণ করেছে।

তাঁর যুগান্তকারী সিরিজ লাইফ অন আর্থ পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষকে প্রথমবার বুঝতে শিখিয়েছিল, প্রাণীরা বিবর্তিত হয়ে কীভাবে প্রতিটি প্রাণীকে এক সুতোয় গেঁথে রেখেছে। আমিও বিটিভিতে লাইফ অন আর্থ দেখেই তাঁর সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম। নিচে ডেভিড অ্যাটেনবরোর সেই চিরচেনা ধীরস্থির ও বিস্ময়মাখা কণ্ঠে একটি আলোচনা তুলে ধরা হলো।
ডেভিড অ্যাটেনবরো সম্পর্কে এই ১০ তথ্য জানেন কি১৯২৬ সালে জন্ম নেওয়া ডেভিড অ্যাটেনবরোর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল যখন টেলিভিশন ছিল সাদাকালো এবং প্রযুক্তি ছিল অত্যন্ত সীমিত। কিন্তু তাঁর কল্পনাশক্তি ছিল সীমাহীন।
চেতনার কঠিন সমস্যা থেকে শুরু করে আইনস্টাইন-বোরের বিতর্ক এবং আধুনিক গবেষণা, সবই সংগতিপূর্ণভাবে ইউটিউবের একটি ভিডিও থেকে নেওয়া হয়েছে:
‘আমাদের এই নীল গ্রহের বুকে কত শত বিস্ময় ছড়িয়ে আছে, তা হয়তো আমরা বলে শেষ করতে পারব না। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিস্ময়টি সম্ভবত লুকিয়ে আছে ঠিক আমাদের চোখের পেছনে—আমাদের মস্তিষ্কের ধূসর কোষগুলোর গভীরে। প্রায় দেড় কেজি ওজনের এই নরম জৈব পদার্থটি, যা মাত্র ২০ ওয়াট বিদ্যুৎ খরচ করে (একটি ফ্রিজের বাল্বের চেয়েও কম), তা কীভাবে আমাদের অনুভব করার ক্ষমতা দেয়? এটিই বিজ্ঞানের সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রশ্ন: চেতনার কঠিন সমস্যা।
দীর্ঘকাল ধরে আমরা ভেবেছি মস্তিষ্ক একটি জৈব কম্পিউটারের মতো। কিন্তু ১৯৯৫ সালে দার্শনিক ডেভিড চ্যামার্স আমাদের মনে করিয়ে দেন, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ আর অনুভব করা এক জিনিস নয়। নীল রং দেখে মুগ্ধ হওয়া কিংবা প্রিয়জনের অভাব বোধ করা—এসব নিছক গাণিতিক হিসাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।

এই রহস্যের জট খুলতে আমাদের ফিরে যেতে হবে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে, যখন পদার্থবিদ্যার জগৎ ওলটপালট হয়ে যাচ্ছিল। সেই সময়ে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন কোয়ান্টাম জগৎ। সেখানে নিয়মগুলো সম্পূর্ণ আলাদা। একটি কণা একই সঙ্গে দুটি জায়গায় থাকতে পারে, যাকে বলা হয় সুপারপজিশন। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, যখনই কোনো সচেতন পর্যবেক্ষক সেই কণাটিকে দেখেন, তখনই তার সেই রহস্যময় অবস্থা ভেঙে যায় এবং সেটি একটি নির্দিষ্ট রূপ নেয়।
কোয়ান্টাম জগতের ভৌতিক রহস্যদীর্ঘকাল ধরে আমরা ভেবেছি মস্তিষ্ক একটি জৈব কম্পিউটারের মতো। কিন্তু ১৯৯৫ সালে দার্শনিক ডেভিড চ্যামার্স আমাদের মনে করিয়ে দেন, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ আর অনুভব করা এক জিনিস নয়।
বিজ্ঞানী নীলস বোর মনে করতেন, আমরা না দেখা পর্যন্ত কোনো কিছু বাস্তব নয়। কণাগুলো কেবল সম্ভাব্যতার মেঘ হিসেবে ভেসে থাকে; আমাদের পর্যবেক্ষণই মহাবিশ্বকে বাস্তব করে তোলে। কিন্তু আলবার্ট আইনস্টাইন এটি মেনে নিতে পারেননি। তিনি মনে করতেন, মহাবিশ্বের সবকিছুই সুনির্দিষ্ট, আমরা জানি না বলেই তা অনিশ্চিত মনে হয়। তিনি আমৃত্যু বোরের সঙ্গে বিতর্ক করে গেছেন, প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে প্রকৃতির গভীরে কোনো লুকানো চলক আছে। কিন্তু আধুনিক পরীক্ষাগুলো প্রমাণ করেছে, আইনস্টাইন ভুল ছিলেন—মহাবিশ্ব আসলেই তার গভীরে রহস্যময় এবং অনিশ্চিত।
তাহলে কি আমাদের সচেতনতাই মহাবিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করছে? আশির দশকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতবিদ রজার পেনরোজ এক সাহসী দাবি করলেন। তিনি বললেন, মানুষের চেতনা কোনো যান্ত্রিক কম্পিউটেশন বা হিসাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এটি এমন কিছু, যা পদার্থবিজ্ঞানের গভীরতম স্তরে ঘটে। ঠিক সেই সময়ে অ্যানেসথেসিওলজিস্ট স্টুয়ার্ট হ্যামারফ নিউরনের ভেতরে থাকা ক্ষুদ্র সুড়ঙ্গের মতো কাঠামো মাইক্রোটিউবিউলের দিকে নজর দেন। তাঁরা দুজন মিলে তৈরি করলেন অর্ক ওআর তত্ত্ব।

তাঁরা বলছেন, চেতনা আমাদের মস্তিষ্কের ওপরিভাগে জন্মায় না, বরং মাইক্রোটিউবিউলের ভেতরে কোয়ান্টাম কম্পন ঘটে এবং মহাকর্ষের প্রভাবে সেই অবস্থা যখন ভেঙে পড়ে, তখনই আমাদের মনে একটি সচেতন মুহূর্তের জন্ম নেয়। অনেক সমালোচক বলেছিলেন, মস্তিষ্ক খুব গরম এবং ভেজা জায়গা, এখানে কোয়ান্টাম অবস্থা টিকে থাকা অসম্ভব। কিন্তু প্রকৃতি আমাদের বারবার চমকে দিয়েছে। আমরা দেখেছি কীভাবে একটি উদ্ভিদ কোয়ান্টাম মেকানিকস ব্যবহার করে সূর্যের আলো থেকে নিখুঁতভাবে শক্তি সংগ্রহ করে কিংবা পরিযায়ী পাখিরা কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্ট ব্যবহার করে হাজার মাইল পথ পাড়ি দেয়।
বোর-আইনস্টাইন বিতর্কগণিতবিদ রজার পেনরোজ বললেন, মানুষের চেতনা কোনো যান্ত্রিক কম্পিউটেশন বা হিসাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এটি এমন কিছু, যা পদার্থবিজ্ঞানের গভীরতম স্তরে ঘটে।
এই তত্ত্ব যদি সত্যি হয়, তবে আমাদের মস্তিষ্ক কোনো চেতনা উৎপাদনকারী যন্ত্র নয়; এটি আসলে একটি অ্যান্টেনা। মহাবিশ্বের যে কোয়ান্টাম কাঠামো বা স্পেস-টাইম, তার ভেতরেই হয়তো চেতনা চিরকাল লুকিয়ে ছিল। আমাদের মস্তিষ্ক কেবল সেই বিশাল সুর থেকে নির্দিষ্ট কম্পন গ্রহণ করে আমাদের পরিচয় গড়ে তোলে। একে বলা হয় প্যানসাইকিজম—অর্থাৎ চেতনা মহাবিশ্বের একটি মৌলিক গুণ, যেমনটা ভর বা বিদ্যুৎ।
সবশেষে ২০২৪ সালের সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো আরও রোমাঞ্চকর তথ্য দিচ্ছে। ভিয়েনার বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, জীবন্ত কোষের সমতুল্য তাপমাত্রায় কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্ট অনেক দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকতে পারে। এমনকি প্রাণীর মৃত্যুর ঠিক পরবর্তী মুহূর্তেও মাইক্রোটিউবিউলগুলোতে কোয়ান্টাম স্পন্দন লক্ষ করা গেছে, যা বিজ্ঞানের ধরাবাঁধা নিয়মের বাইরে।

হয়তো আমরা মহাবিশ্ব থেকে আলাদা কেউ নই। আমাদের প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস, প্রতিটি চিন্তা আসলে সেই আদিম মহাজাগতিক চেতনারই অংশ। আমরা আসলে এই বিশাল ব্রহ্মাণ্ডেরই এক সচেতন চোখ, যা নিজের সৃষ্টির দিকে তাকিয়ে অবাক বিস্ময়ে নিজেকেই চেনার চেষ্টা করছে। আমাদের দেহযন্ত্র হয়তো এক দিন ভেঙে যাবে, কিন্তু মহাবিশ্বের সেই অমর সংগীতে আমাদের অস্তিত্বের প্রতিধ্বনি চিরকাল রয়ে যাবে।’
কোয়ান্টাম জেনো ইফেক্ট







