আজ থেকে ১.৩ বিলিয়ন বছর আগে, আমাদের পরিচিত মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি থেকে অনেক দূরে দুটি কৃষ্ণগহ্বর নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষের ফলে একসঙ্গে মিশে যায় । গত বছরের ১৪ই জানুয়ারি, লেজার ইন্টারফেরেমিটার গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ অবজারভেটরি বা লাইগো (LIGO) ডিটেক্টরে তার আভাস মেলে; ধরা পড়ে এযাবৎকালের সবচেয়ে শক্তিশালী মহাকর্ষ তরঙ্গ, GW250114। মহাকর্ষ তরঙ্গ এমনিতে খুবই ক্ষীণ। আর এই দুর্বলতাই তার শক্তি। কিন্তু, লাইগোর ডিটেক্টর এতই সংবেদনশীল যে, কয়েক হাজার আলোকবর্ষের মধ্যে স্থান-কালের জ্যামিতিতে কোনো ঢেউ উঠলেও, তা তৎক্ষণাৎ ধরা পড়ে ডিটেক্টরে।

সম্প্রতি কানাডার পেরিমিটার ইনস্টিটিউট ফর থিওরিটিক্যাল ফিজিকসের বিজ্ঞানী, সিঝেং মার তত্ত্বাবধানে একদল গবেষক এই মহাকর্ষ তরঙ্গের সাহায্যে সন্ধান পেয়েছেন কৃষ্ণগহ্বরকে ঘিরে থাকা ঘটনা দিগন্তের। তাঁদের এই কাজ, গত ২৪ শে জুন প্রকাশিত হয়েছে নেচার পত্রিকায়। কী এই ঘটনা দিগন্ত? ব্লাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বরের সঙ্গে এর সম্পর্কও কী?

জ্যোতির্বিজ্ঞানে ঘটনা দিগন্ত বা ইভেন্ট হরাইজন হলো কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশে বিদ্যমান এমন একটি অদৃশ্য সীমানা, যেখান থেকে আর ফিরে আসা যায় না। কোনো বস্তু এই দিগন্ত রেখা একবার অতিক্রম করলে, তা মহাবিশ্বের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এর ভিতরের টান এত বেশি যে, আলোও এখান থেকে পালিয়ে আসতে পারে না। সেজন্য পদার্থবিদেরা একে বলেন পয়েন্ট অব নো রিটার্ন। একটা সহজ উদাহরণ দিলে ঘটনা দিগন্ত ঠিক কি, তা বুঝতে সুবিধা হবে।

মহাকাব্যিক মহাকর্ষ তরঙ্গ
গত বছরের ১৪ই জানুয়ারি, লেজার ইন্টারফেরেমিটার গ্রাভিটেশানাল ওয়েভের ডিটেক্টরে তার আভাস মেলে; ধরা পড়ে এযাবৎকালের সবচেয়ে শক্তিশালী মহাকর্ষীয় তরঙ্গ, GW250114।

ধরা যাক, পাড়ার ক্লাব ঘরে, মাকড়সা একটি বিশাল জাল বুনেছে; জালের বাইরে যতক্ষণ মাছিটি উড়ছে, ততক্ষণ সে নিরাপদ। জালের সুতোর কাছাকাছি গেলেও হয়তো তার ফেরার ক্ষীণ সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু মাছিটি যদি একবার জালের আঠার ওপর পা দিয়ে ফেলে, সে আর নড়তে পারবে না। কৃষ্ণগহ্বরের ঘটনা দিগন্ত হলো সেই আঠালো অংশটি।

আসলে, কৃষ্ণগহ্বরের তীব্র মহাকর্ষ টানের কারণে, আলো সোজা না গিয়ে বেঁকে ভেতরের দিকে চলে যায়। কৃষ্ণগহ্বরের আরো কাছাকাছি গেলে, মহাকর্ষের টান ক্রমশ বাড়তে থাকে এবং সময় তত ধীরগতিতে চলে। এইভাবে চলতে চলতে ঘটনা দিগন্তের একদম কাছাকাছি পৌঁছালে, বাইরের দুনিয়ার সাপেক্ষে সময় প্রায় থমকে যায়। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বই আমাদের শিখিয়েছে, স্থান এবং কাল স্থির নয়, বরং নমনীয়। আর এই তত্ত্বের গাণিতিক প্রয়োগ থেকেই জানতে পারা গেছে ঘটনা দিগন্তের অস্তিত্বের কথা।

কানাডার পেরিমিটার ইনস্টিটিউটের প্রখ্যাত‍ বিজ্ঞানী, ড. মা ভেবেছিলেন, আইনস্টাইনের তত্ত্বটি বাস্তবতার সঙ্গে কতটা মিলছে, তা পরখ করার একটা বড়ো উপায় হতে পারে মহাকর্ষ তরঙ্গগুলো। এমনিতেই আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব দাবি করে, দুটি কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষের ফলে মিলিত হয়ে নতুন কৃষ্ণগহ্বর তৈরির সময় নির্গত হওয়া মহাকর্ষ তরঙ্গগুলো নবগঠিত কৃষ্ণগহ্বরের সংশ্লিষ্ট ঘটনা দিগন্তের স্বাক্ষর বহন করে। এটি পরীক্ষা করার জন্য, ড. মা লাইগোর বিজ্ঞানীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। যেহেতু GW250114 লাইগোর ডিটেক্টরে ধরা পড়া সবচেয়ে শক্তিশালী মহাকর্ষ তরঙ্গ, তাই মা ও তাঁর সহযোগীরা এই মহাকর্ষ তরঙ্গের ওপর মনোনিবেশ করেন।

আইনস্টাইন, মহাকর্ষ তরঙ্গ এবং লাইগো
আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বই আমাদের শিখিয়েছে, স্থান এবং কাল স্থির নয়, বরং নমনীয়। আর এই তত্ত্বের গাণিতিক প্রয়োগ থেকেই জানতে পারা গেছে ঘটনা দিগন্তের অস্তিত্বের কথা।

তাঁদের গবেষণা, প্রকৃতপক্ষে ঘটনা দিগন্তের বাইরের পরিবেশকে চিত্রিত করে। কৃষ্ণগহ্বরের বিশাল মহাকর্ষ ক্ষেত্র থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করার সময়, এই অঞ্চলে, আলো তার শক্তি হারায়। ফলে দিগন্তের দিকে এগিয়ে আসা বস্তুগুলো বাইরের পর্যবেক্ষকদের কাছে ক্রমশ লাল দেখায়। কৃষ্ণগহ্বরটি ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে স্থান-কালের চাদরকে নিজের দিকে টেনে নেয়। এটিই দূরত্ব এবং সময়ের প্রবাহকে বিকৃত করে। এই দুই ঘটনায় মহাকর্ষ তরঙ্গের গর্জনে ধরা পড়ে। ফলে গবেষকদের সামনে চরম পর্যায়ে মহাকর্ষ অনুসন্ধান করার একটা সুযোগ উন্মোচিত হয়।

এই ঘটনা দিগন্তের পিছনে, কৃষ্ণগহ্বরের কেন্দ্রে এমন একটি অস্বাভাবিক অঞ্চল রয়েছে, যেখানে আইনস্টাইনের তত্ত্ব অর্থহীন হয়ে পড়ে, যার নাম সিঙ্গুলারিটি বা পরম বিন্দু। এখানকার ঘনত্ব অসীম। তাছাড়া এখানে মহাকর্ষ ক্ষেত্র এতই শক্তিশালী যে, পদার্থবিজ্ঞানের চির পরিচিত নিয়মগুলো আর খাটে না। আসলে, এটি ইঙ্গিত দেয় যে, মহাকর্ষ তত্ব আজও অসম্পূর্ণ।

কোয়ান্টাম তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাবিশ্বের কোনো শূন্যস্থানই একদম ফাঁকা নয়। ঘটনা দিগন্তের ঠিক বাইরে প্রতিনিয়ত জোড়ায় জোড়ায় অতি ক্ষুদ্র কণা এবং প্রতিকণা তৈরি হচ্ছে এবং পরক্ষণেই একে অপরকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, আলোর যেমন ফোটন কণা থাকে, তেমনি মহাকর্ষেরও একটি অতি ক্ষুদ্র কণা রয়েছে। এই কাল্পনিক কণার নাম গ্র্যাভিটন। ঘটনা দিগন্তের কাছে এই গ্র্যাভিটনগুলোর আচরণ তীব্র হয়ে ওঠে।

গ্যালাক্সি-পরিসরের মহাজাগতিক তরঙ্গ শনাক্ত
বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, আলোর যেমন ফোটন কণা থাকে, তেমনি মহাকর্ষেরও একটি অতি ক্ষুদ্র কণা রয়েছে, যার নাম গ্র্যাভিটন। ঘটনা দিগন্তের কাছে এই গ্র্যাভিটনগুলোর আচরণ তীব্র হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞানীরা এখনো কৃষ্ণগহ্বরের সম্পূর্ণ রহস্য ভেদ করতে পারেননি। অপরদিকে, আমাদের কাছে কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটির কোনো নিখুঁত গাণিতিক সূত্র নেই। অদূর ভবিষ্যতে যদি বিজ্ঞানীরা এই কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটির রহস্য পুরোপুরি সমাধান করতে পারেন, তাহলে আমরা জানতে পারব মহাবিশ্ব একদম শুরুতে কেমন ছিল এবং কৃষ্ণগহ্বরের ভেতরে হারিয়ে যাওয়া তথ্যের শেষ পরিণতি কী হয়। গত কয়েক দশক ধরেই বিজ্ঞানীরা সেই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

লেখক: পদার্থবিদ, স্টেট ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরি, কলকাতা

নতুন পাওয়া মহাকর্ষ তরঙ্গ থেকে খোঁজ মিলবে ব্ল্যাকহোলের অজানা রহস্য