খোলা ভোজ্যতেল বিক্রি বন্ধে সরকার একাধিকবার সিদ্ধান্ত নিয়েও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর চাপ, রাজনৈতিক প্রভাব ও সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের উদ্যোগ বারবার পিছিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান।

ক্যাব ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের আয়োজনে রোববার ‘স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য ভিটামিনসমৃদ্ধ ভোজ্যতেল সহজলভ্যকরণে স্বল্পমূল্যের প্যাকেজিং : জনমত সৃষ্টিসংক্রান্ত আলোচনা সভা’য় তিনি এ কথা বলেন। রাজধানীর ক্যাব কার্যালয়ে এএইচএম সফিকুজ্জামানের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (খাদ্য শিল্প ও উৎপাদন) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শোয়েব, বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফেকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট কেএম ইকবাল হোসেন, গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী প্রমুখ। আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন-এসএইচএফ এলএসএফএফ প্রোগ্রাম পরামর্শক মুশতাক হাসান মুহ. ইফতিখার।

ক্যাবের সভাপতি সফিকুজ্জামান বলেন, ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকেই খোলা তেল বন্ধের বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। পরে কয়েক দফা সিদ্ধান্তের পর ২০২৩ সালের ৩১ আগস্ট থেকে খোলা তেল বিক্রি বন্ধের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদেরও এ বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য সময় দেওয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি।

২০২৪ সালে নির্বাচনের পর আমি যখন ভোক্তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ছিলাম, আমি ব্যবস্থা নিতে গেলে তৎকালীন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন-আমি সরকারবিরেধী কাজ করছি কিনা। আশ্চর্যের বিষয়, সরকার আইন করেছে কিন্তু আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক চাপ ও বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর প্রভাব কাজ করেছে। বিশেষ করে ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজার নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ও চাপের কারণে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হয়েছে।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, দেশের ভোজ্যতেলের বাজারে কয়েকটি বড় রিফাইনারি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার করে বাজারে চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে উৎসব বা বাড়তি চাহিদার সময়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ায়। কারণ দেশে বছরে ৩০ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদা আছে। বাজারে হাতেগোনা পাঁচ-ছয়টি বড় কোম্পানি ৫০ শতাংশ বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। সেক্ষেত্রে প্রতিদিন দেশে ৫ লাখ টন চাহিদা আছে। সেই বড় কোম্পানিগুলো ১ দশমিক ৫ থেকে ২ লাখ টন করে বাজারে ভোজ্যতেল সরবরাহ করে। তারা সুযোগ বুঝে সিন্ডিকেট করে সরবরাহ বন্ধ করলেই বাজারে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়ে যায়। আর এ পরিস্থিতি সামনে এনে সরকারকে চাপ সৃষ্টি করে। ধাপে ধাপে বাড়ায় দাম। এখনো তা অব্যাহত আছে।

সফিকুজ্জামান বলেন, প্যাকেটজাত তেলে এমআরপি থাকায় নজরদারি সহজ হলেও খোলা তেলে সেই নিয়ন্ত্রণ দুর্বল। অনেক ক্ষেত্রে বোতলজাত তেল খুলে বেশি দামে খোলা তেল হিসাবে বিক্রি করে ভোক্তার পকেট থেকে অতি মুনাফা লুটে নেওয়া হয়। তাই সরকারকে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করে খোলা তেল বিক্রি বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে বিকল্প ব্যবস্থা, বাজার তদারকি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যকর পরিকল্পনা নিতে হবে।