চট্টগ্রামের আনোয়ারার চাতরী চৌমুহনী বাজারের টানেল সড়ক। সূর্য ওঠার আগে থেকেই টুকরি আর কোদাল নিয়ে সেখানে বসে আছেন কয়েকজন। কারো কারো হাত একেবারেই খালি। চোখমুখে দারিদ্রের ছাপ স্পষ্ট। তাঁরা যেন খুঁজছেন কাউকে! হ্যাঁ, তাঁরা ক্রেতা খুঁজছেন বিক্রি হওয়ার জন্য। আসলে শ্রম বিক্রি করেই চলে তাঁদের জীবন। এই শ্রমের হাটে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে বিক্রি হন তাঁরা নির্মাণ কাজ, খেতের কাজ বা পরিচ্ছন্নতার কাজের জন্য। ক্রেতা এলেই চলতে থাকে দরদাম। পণ্যের মতোই মৌসুম বিবেচনায় তাঁদের দামও ওঠানামা করে।
এখানে ৭০ বছরের বৃদ্ধ থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের শ্রমজীবী মানুষ কাজের সন্ধানে দলে দলে ছুটে আসেন। এ মানুষগুলোর অধিকাংশই আশ্রয়হীন, ছিন্নমূল ও হতদরিদ্র। ক্রেতাদের কাছে তাঁরা কেউ কেউ এক সপ্তাহ আবার কেউ কেউ এক মাস আমন রোপণের জন্য বিক্রি হন। আমনের চাষাবাদের সময় এ অঞ্চলে দিনমজুর বা কৃষিকাজের মানুষের বড়ই অভাব থাকে।
৮৫০ থেকে ১০০০ টাকায় দিনে এ শ্রম বিক্রি হয়। তবে শ্রম কেনা মালিকের পছন্দের ওপর নির্ভর করে শ্রমের মূল্য। বৃদ্ধের চেয়ে জোয়ানদের চাহিদা বেশি। তবে অনেকে শরীরের গঠন দেখেও ক্রয় করেন। বিক্রি হতে আসা শ্রমজীবী মানুষ যেদিন নিজেকে বিক্রি করতে না পারেন, সেদিন তাঁদের রাত কাটে বাজারের কাছাকাছি মসজিদ, মাদ্রাসা অথবা স্কুলের বারান্দায়। কখনো থাকেন আধা পেট খেয়ে, কখনো উপোস। সকাল থেকেই ফের বিক্রি হওয়ার আশায় শুরু হয় ছোটাছুটি। অনেকেই দিন বা কর্মঘণ্টা হিসেবেও কাজে নেন তাঁদের। জীবন ও জীবিকার তাগিদে নিজেদের যেন এভাবেই বেচে দিচ্ছেন তারা !
কথা হয় শ্রমের হাটের কয়েকজনের সঙ্গে। তাঁরা জানান, বাজারে এখন সব কিছুর দাম বাড়লেও শুধু তাঁদের শ্রমের মূল্য বাড়েনি, বরং কমছে। উত্তরবঙ্গের রংপুর থেকে কাজের খোঁজে টানেল পাড়ি দিয়ে এসেছেন আবদুর রহিম (৬০)। তিনি জানান, ‘এখানে দশ বছর ধরে নিয়মিত আসছি। আগে শরীরে শক্তি ছিল, চাহিদাও ছিল। এখন অনেক বয়স হয়ে গেছে বলে অনেকেই নিতে চায় না। আগের পরিচিত লোকজন এলে তারা ভালোবেসে কাজ দেয়। আর কাজ করে নিজে চলতে হয়, সাংসারিক খরচ মেটাতে হয়, টাকা পাঠাতে হয় গ্রামের বাড়িতে। আমার দিকে তাকিয়ে থাকে আমার পুরো পরিবার।’
আবু বকর বলেন, বর্তমানে দৈনিক ৮৫০ টাকা থেকে ৯৫০ টাকার মধ্যে সারা দিনের শ্রম বিক্রি হয়। এক দিন কাজ পেলে, বাকি দুই দিন কোনো কাজ থাকে না। তাই কৃষি কাজের পাশাপাশি বাড়ি-ঘর নির্মাণ কাজে কম মজুরিতে কেউ ডাকলেও চলে যাচ্ছি।’
ফেনী থেকে আসা শহিদুল ইসলাম ও নোয়াখালীর দিদারুল আলম বলেন, ‘আমরা কৃষি কাজের জন্য পারদর্শী। দুই যুগের বেশি সময় ধরে আনোয়ারার বিভিন্ন এলাকায় কৃষি কাজ করছি। কয়েক বছর ধরে এখানে কমেছে কৃষি জমি। সে সঙ্গে কমে গেছে চাষাবাদও। বর্তমানে কৃষি কাজ না পেলেও বিভিন্ন কন্ট্রাক্টরদের সঙ্গে বাড়ি-নির্মাণ কাজে দিনমজুর হিসেবে যাই।’
তাঁরা জানান, বছরের শ্রাবণ ও ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত আমন চাষাবাদের উপযুক্ত সময়। এ সময় শ্রমজীবী মানুষের চাহিদা বেশি। তাই শ্রম বিক্রির এই হাটে মানুষের ভিড় হচ্ছে অন্য সময়ের চেয়ে একটু বেশি। এই শ্রম বাজারটি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।
বাড়ি-ঘর নির্মাণ কাজে নিয়োজিত সিরাজুল ইসলাম কন্ট্রাক্টর এখানে এসেছেন শ্রমিক কিনতে। অনেক সময় এক সঙ্গে কয়েকটি বাড়িতে ছাদ ঢালাইয়ের কাজ চললে, মানুষ খুঁজলেও পাওয়া যায় না। চাতরী বাজার মোড়ে এলে যেকোনো ধরনের কাজের লোক পাওয়া যায়। এখান থেকে দরদাম করে কাজের লোক বেছে নেওয়া যায়। সে কারণে কাজের লোকের দরকার হলেই এখানে চলে আসেন তিনি।
চাতরী চৌমুহনীতে শ্রম কিনতে আসা জসিম উদ্দিন বলেন, এখানে দরদাম করে দেখেশুনে শ্রমিক নেওয়া যায়। মানুষের শ্রম কেনাবেচার এ হাট জমজমাট থাকে সকাল থেকে বিকেলে পর্যন্ত।
একদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথমবারের মতো নদীর তলদেশে গড়ে ওঠা বৃহত্তম সুড়ঙ্গপথ কর্ণফুলী টানেল, চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল, কোরিয়ান কেইপিজেডে, কাফকো, সিইউএফএলকে ঘিরে এখানে সৃষ্টি হয়েছে মানুষের কর্মসংস্থান। অপরদিকে এ উপজেলায় আশঙ্কাজনক হারে কমছে আবাদি জমি। অপরিকল্পিতভাবে বসতবাড়ি ও দোকানপাট নির্মাণের কারণে কৃষি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। গত এক দশকে উপজেলায় কৃষি জমি কমেছে অন্তত সাড়ে ৯ হাজার একর। কয়েক বছর আগেও যে জমিতে আউশ, আমনসহ রবি মৌসুমে বিভিন্ন জাতের চাষাবাদ হতো, সেসব জমিতে ক্রমান্বয়ে বাসাবাড়ি, আবাসিক, বাণিজ্যিক আর বহুতল ভবন গড়ে উঠছে। আবাদি কৃষিজমির পরিমাণ কম থাকায় কৃষিকাজে লোক প্রয়োজন হয় কম। নগরায়ণের কারণে বহুতল ভবন নির্মাণকাজে শ্রমিকদের নেওয়া হয়। শ্রমের হাটের শ্রমিকদের কাজেও তাই এসেছে বৈচিত্র। তবে তাঁদের হতাশা ভরা একঘেয়ে জীবনে বৈচিত্র আদৌ আসবে কি না, কেউ জানে না।








