কাপড় ধোয়ার কথা উঠলেই আজ আমাদের মনে আসে ডিটারজেন্ট, ওয়াশিং মেশিন কিংবা সুগন্ধি সফটনারের কথা। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির বহু আগে মানুষ কীভাবে পোশাক পরিষ্কার করত? ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, প্রাচীন রোমানদের কাপড় পরিষ্কারের পদ্ধতি ছিল অদ্ভুত। তারা পোশাক ধোয়ার কাজে ব্যবহার করত মানুষের মূত্র। শুনতে যতই অস্বস্তিকর লাগুক, প্রায় দুই হাজার বছর আগে এটি ছিল রোমান সমাজের একটি প্রতিষ্ঠিত ও লাভজনক ব্যবসা।
মনে করুন, আপনি প্রাচীন রোমের ব্যস্ত কোনো সড়ক দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। হঠাৎ চোখে পড়ল রাস্তার পাশে রাখা বিশাল মাটির পাত্র। তাতে লেখা—‘এখানে মূত্রত্যাগ করুন’। প্রথমে বিষয়টি অদ্ভুত মনে হলেও, এটি ছিল না জনসাধারণের শৌচাগার। বরং রোমান অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পথচারীদের মূত্র সংগ্রহ করে তা বিক্রি করা হতো স্থানীয় লন্ড্রিগুলোতে।
প্রাচীন রোমের পেশাদার ধোপাদের বলা হতো ফুলোনেস । তারা মূত্র সংগ্রহ করে তা পচিয়ে বিশেষ উপায়ে ব্যবহার করতেন কাপড় পরিষ্কারের কাজে। অবৈজ্ঞানিক মনে হলেও এর পেছনে ছিল যথেষ্ট শক্তিশালী রসায়ন।
আসলে, জমিয়ে রাখা মূত্র সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে গিয়ে তৈরি করত অ্যামোনিয়া—এক ধরনের তীব্র ক্ষারীয় রাসায়নিক পদার্থ। এই অ্যামোনিয়াই কাপড়ের তেলচিটে ময়লা দূর করতে এবং গভীর দাগ তুলতে কার্যকর ভূমিকা রাখত। আধুনিক অনেক পরিষ্কারক দ্রব্যেও অ্যামোনিয়ার ব্যবহার দেখা যায়। ফলে প্রাচীন রোমানদের এই পদ্ধতি যতই অস্বাভাবিক মনে হোক না কেন, তা ছিল বৈজ্ঞানিকভাবে কার্যকর।
তবে ইতিহাসবিদদের মতে, এই কৌশলের উদ্ভাবক রোমানরা নয়। এর শিকড় পাওয়া যায় প্রাচীন মেসোপটেমীয় সভ্যতায়। রোমানরা সেই পদ্ধতিকে আরও উন্নত ও বাণিজ্যিক রূপ দিয়েছিল।
রোমান লন্ড্রির কাজ ছিল অত্যন্ত শ্রমসাধ্য। বড় বড় চৌবাচ্চার মতো পাত্রে পানি ও পচা মূত্র মিশিয়ে তাতে কাপড় ভিজিয়ে রাখা হতো। এরপর ধোপা বা তাদের ক্রীতদাসেরা খালি পায়ে সেই পাত্রে নেমে দীর্ঘ সময় ধরে কাপড় মাড়াতেন। অনেকটা আজকের ওয়াশিং মেশিনের ঘূর্ণনের মতোই কাজ করত এই পদ্ধতি।
কাপড় পরিষ্কার হওয়ার পর তা বিশুদ্ধ পানিতে ধুয়ে নেওয়া হতো। এরপর রোদে শুকিয়ে সাদা পোশাকের উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে আনতে ব্যবহার করা হতো গন্ধকের ধোঁয়া। অন্যদিকে রঙিন পোশাকে বিশেষ ধরনের মাটি বা খনিজ পদার্থ ঘষে আবারও ফিরিয়ে আনা হতো তার পুরোনো ঔজ্জ্বল্য।
বর্তমান যুগে এই পদ্ধতির কথা কল্পনাও করা কঠিন। তবু ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি যুগে যুগে কত বিচিত্র পথ খুঁজে নিয়েছে। আধুনিক ওয়াশিং মেশিনের যুগে দাঁড়িয়ে প্রাচীন রোমের মূত্রনির্ভর লন্ড্রি ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে সভ্যতার এক বিস্ময়কর ও কৌতূহলোদ্দীপক অধ্যায়।
সূত্র: সংবাদ প্রতিদিন








