মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের রাজকান্দি সংরক্ষিত বনে উচ্ছেদ অভিযানে একটি পরিবারের প্রায় ১ হাজার ২০০ কমলা গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ উঠেছে বন বিভাগের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, দীর্ঘদিন মাসোহারা দেওয়ার পর আর্থিক সংকটে তা বন্ধ করায় ফল ধরার আগমুহূর্তে তাদের বাগান ধ্বংস করা হয়েছে।

তবে বন বিভাগের দাবি, সংরক্ষিত বনভূমিতে ফল বাগান সম্পূর্ণ অবৈধ হওয়ায় আইন অনুযায়ী উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ১৬ জুলাই বৃহস্পতিবার আদমপুর বিটে কমলগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) উপস্থিতিতে বনবিভাগ, উপজেলা প্রশাসন ও কমলগঞ্জ থানা পুলিশের সমন্বয়ে যৌথভাবে চার ঘণ্টাব্যাপী এ অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানকালে রাজকান্দি রেঞ্জের সংরক্ষিত বনের ২০ ধারাভুক্ত প্রায় ৫ (পাঁচ) একর বনভূমি স্থানীয় প্রভাবশালীদের জবরদখল থেকে উদ্ধার করা হয়।

স্থানীয়রা বলছেন, যদি বাগানটি অবৈধই হয়ে থাকে, তাহলে রোপণের সময় বা এক-দুই বছরের মধ্যেই ব্যবস্থা নেওয়া হলো না কেন? আট বছর ধরে গাছ বড় হতে দেওয়া হলো, আর ফল ধরার সময়ই কেন উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলো?

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, শুরু থেকেই তারা বন বিভাগের বন বিট কর্মকর্তাকে নিয়মিত টাকা দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু এবার পারিবারিক আর্থিক সংকটের কারণে সেই টাকা দিতে না পারায় তাদের পুরো বাগান কেটে ফেলা হয়েছে।

বাগানের মালিক মোছা. সালমা বেগম বলেন, এ বাগান গড়ে তুলতে গত আট বছরে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। নিজের টাকা নয়, বিভিন্ন এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে এই টাকা বাগানে খাটিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, এবার ফল বিক্রি করে ঋণের টাকা শোধ করব। অথচ বন বিভাগ আমাদের সব শেষ করে দিল। বাগান না কেটে যদি আমাদের ঘরে তালা দিয়ে পুড়িয়ে মারত, তাহলেও এত কষ্ট হতো না। এখন এই ঋণের বোঝা নিয়ে আমরা কোথায় যাব? কীভাবে ঋণ শোধ করব?

সালমা বেগম ও তার স্বামী আলিম উল্লা জানান, বনের প্রায় ৩ একর জায়গায় দীর্ঘ আট বছর ধরে কমলা, পেঁপে ও লাউয়ের বাগান গড়ে তোলেন তারা। বিভিন্ন এনজিও থেকে নেওয়া প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার ঋণ বিনিয়োগ করা হয় এ বাগানে।

মাসোহারা না দেওয়ায় ১২শ কমলা গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ বন বিভাগের বিরুদ্ধে

তাদের দাবি, আরও প্রায় তিন মাস পর বাগান থেকে ২৫ থেকে ২৬ লাখ টাকার ফল বিক্রি করে ঋণের বড় একটি অংশ পরিশোধ করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বন বিভাগের অভিযানে সেই স্বপ্ন মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।

স্থানীয়রা এ অভিযানকে প্রতিহিংসামূলক বলে অভিযোগ করেছেন। তারা জানান, সরকারি জমি উদ্ধারের নামে এ অভিযান পরিচালিত হলেও এর পেছনে রয়েছে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা। কয়েক দিন আগে বন বিভাগের কথিত লিজ বাণিজ্য ও মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগের নিউজ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। সেই ক্ষোভ থেকেই তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

তাদের দাবি, বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে বনের জমি বনায়নের নামে টাকার বিনিময়ে অলিখিতভাবে বিভিন্ন ব্যক্তিকে পান ও জুম চাষের জন্য ব্যবহার করতে দিয়েছেন। অথচ সেই সব জায়গায় কোনো অভিযান না চালিয়ে শুধু এ পরিবারের বাগান ধ্বংস করা হয়েছে।

অভিযো উঠেছে, শুধু গাছ কেটেই ক্ষান্ত হয়নি অভিযানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা। তারা ভুক্তভোগী পরিবারের একমাত্র পানি সেচের মেশিনটিও ভেঙে ফেলেছে, যাতে অবশিষ্ট গাছগুলোও বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব না হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে কাটা কমলা গাছের ডালপালা। ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাগানের মাঝখানে নির্বাক বসে ছিলেন সালমা বেগম ও তার পরিবারের সদস্যরা। ঋণের কিস্তি, সংসারের ভবিষ্যৎ এবং জীবিকা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের।

অভিযোগের বিষয়ে রাজকান্দি রেঞ্জ সহকারী বন সংরক্ষক রেঞ্জ কর্মকর্তা প্রীতম বড়ুয়া বলেন, সংরক্ষিত বনের ভেতরে যে-কোনো ধরনের জবরদখল তা পান, কমলা কিংবা আনারস চাষ যা-ই হোক না কেন তা সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য এবং আইনগতভাবে সম্পূর্ণ বেআইনি। বনের জমি অবমুক্ত করতে বন বিভাগের উচ্ছেদ তৎপরতা সর্বদা চলমান।

তিনি বলেন, এটি একটি জবরদখল তা আট বছর হোক আর দশ বছর হোক, যত বছরই হোক না কেন, এটি বেআইনি। বন বিভাগ সবসময় যেকোনো ধরনের জবরদখল উচ্ছেদ করতে বদ্ধপরিকর। রাজকান্দি রেঞ্জের অধীনে যত জবরদখল রয়েছে, আমরা ধীরে ধীরে সেগুলো অবমুক্ত করার চেষ্টা করছি। প্রতি মাসেই আমাদের এ ধরনের একাধিক উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়।

টাকা দিলে একটি বাগান আট বছর ধরে বৈধ থাকে, আর টাকা না দিলেই রাতারাতি অবৈধ হয়ে যায় কীভাবে? এ প্রশ্নের সরাসরি কোনো জবাব দেননি এ কর্মকর্তা।

এ বিষয়ে সিলেট বন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুর রহমান জানান, ১৯২০ সালের দিকে যখন প্রথম ভিলেজার সিস্টেম চালু হয়, তখন একেক পরিবারকে কেবল ভ্যালিতে (নিচু জমিতে) ধান চাষের জন্য জমি দেওয়া হতো। পাহাড় বা টিলার ওপরে ফল বাগান করার কোনো বিধান বা নিয়ম বন আইনে নেই। কখন, কে এটি লাগানোর অনুমতি দিয়েছে তার কোনো ভিত্তি নেই।

তিনি বলেন, বনের জমিতে কোনো ফল বাগান থাকবে না, সেখানে বনায়ন করা হবে এ নীতি অনুযায়ীই এটি কেটে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। বন বিভাগের কোনো যদি এসব অনিয়মের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে, তাহলে তথ্য প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মাহিদুল ইসলাম/কেএইচকে/জেআইএম