নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার জোড়খালী উচ্চবিদ্যালয়ে আবারও শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। আজ বুধবার অভিভাবক সমাবেশ চলাকালে ১০ জন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে তিনজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলা সদরের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ নিয়ে বিদ্যালয়টিতে তৃতীয়বারের মতো শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়ল।

৭ সেপ্টেম্বর থেকে আজ ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদ্যালয়টিতে মোট ৫০ জন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়েছে। অসুস্থ শিক্ষার্থীদের প্রায় সবারই একই ধরনের উপসর্গ দেখা গেছে—মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাবের পর অচেতন হয়ে পড়া। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকেরা শুরু থেকেই এটিকে গণহিস্টিরিয়া বা গণমনস্তাত্ত্বিক সমস্যা হিসেবে দেখছেন।

বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আজ সকালে প্রধান শিক্ষক অভিভাবক সমাবেশের আয়োজন করেন। এ উপলক্ষে বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ রাখা হয়। এরপরও বেশ কিছু শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিল। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিদ্যালয়ের পঞ্চম তলায় সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। এরপর একে একে আরও নয়জন অসুস্থ হয়ে পড়ে। এতে বিদ্যালয়ে উপস্থিত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

কয়েকজন অভিভাবক বলেন, এমন পরিস্থিতিতে অভিভাবক সমাবেশ না ডেকে চিকিৎসক এনে শিক্ষার্থীদের মানসিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত ছিল।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) শেখ মাহমুদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, জোড়খালী উচ্চবিদ্যালয়ের ১০ জন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে তিনজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বাকি সাতজনের চিকিৎসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চলছে।

হাতিয়ার বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে হঠাৎ অচেতন ১৮ শিক্ষার্থী, ১৩ জনকে হাসপাতালে ভর্তি

শেখ মাহমুদুর রহমান বলেন, সব শিক্ষার্থীর প্রায় একই ধরনের লক্ষণ—অচেতন হয়ে পড়া ও বমি বমি ভাব। প্রাথমিকভাবে চিকিৎসকেরা এটিকে গণহিস্টিরিয়া বা গণমনস্তাত্ত্বিক সমস্যা হিসেবে দেখছেন। এ ক্ষেত্রে একজনের অসুস্থ হওয়ার ঘটনা দেখে অন্যদেরও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

এর আগে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা চিকিৎসক মানসী রানী সরকার প্রথম আলোকে বলেন, জোড়খালী উচ্চবিদ্যালয়ে একের পর এক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনায় উপজেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করেনি। কমিটির অপর দুই সদস্য থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সময় দিলে তাঁরা সরেজমিন বিদ্যালয়ে যাবেন।

তবে আজ সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ার আগে ও পরে তার বাবার আচরণ নিয়ে সন্দেহের কথা জানিয়েছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ওই ব্যক্তি বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য এবং স্থানীয়ভাবে ওষুধের ব্যবসা করেন। তাঁর দোকানে কীটনাশকও বিক্রি করা হয়।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, সপ্তম শ্রেণির ওই শিক্ষার্থী বিদ্যালয় ভবনের পঞ্চম তলায় অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন সেখানে অন্য কোনো শিক্ষার্থী ছিল না। ওই শিক্ষার্থীর বাবা বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য। তিনি স্থানীয়ভাবে ওষুধের ব্যবসা করেন এবং তাঁর দোকানে কীটনাশকও বিক্রি করা হয়। ছেলে অসুস্থ হওয়ার পর তাঁর আচরণ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে সন্দেহজনক মনে হয়েছে। তাই বিষয়টি উপজেলা ও থানা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল প্রথম আলোকে বলেন, প্রধান শিক্ষক তাঁকে না জানিয়েই অভিভাবক সমাবেশের আয়োজন করেছিলেন। আজ অসুস্থ হয়ে পড়া এক শিক্ষার্থীর বাবার ওষুধের দোকানে তল্লাশি চালানো হয়েছে। সেখানে ওষুধের পাশাপাশি কীটনাশক বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে ব্যবস্থাপনা কমিটি নিয়ে বিরোধের কথাও শোনা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা নিছক মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা, নাকি অন্য কোনো কারণ রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তদন্ত কমিটিকে সব দিক বিবেচনায় নিয়ে কাজ করতে বলা হয়েছে।

নোয়াখালীর সেই বিদ্যালয়ে আবারও শিক্ষার্থীরা অসুস্থ, হাসপাতালে ভর্তি ২২

এর আগে ৭ সেপ্টেম্বর একই বিদ্যালয়ে পাঠদান চলাকালে ১৮ জন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে ১৩ জনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। এরপর ১৪ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় দফায় ২২ জন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়। তাদের মধ্যে একজনকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। আজ তৃতীয় দফায় অসুস্থ হয়েছে আরও ১০ জন। তাদের মধ্যে তিনজনকে জেলা সদরের হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

জেলা সিভিল সার্জন ও নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক মো. আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, হাতিয়ার বিদ্যালয়টির অসুস্থ তিন শিক্ষার্থীকে জেনারেল হাসপাতালে আনার পর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তাদের মেডিসিন বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষাও চলছে। প্রাথমিকভাবে তাঁরও ধারণা, এটি গণহিস্টিরিয়া বা গণমনস্তাত্ত্বিক সমস্যা হতে পারে।

মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, এর আগে ১৪ সেপ্টেম্বরও ওই বিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে জেনারেল হাসপাতালে আনা হয়েছিল। প্রয়োজনীয় চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে সে বাড়ি ফিরে গেছে।