বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের রোমাঞ্চ শেষে এখন নকআউটের স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এবারের গ্রুপ পর্ব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হাতেগোনা কয়েকটি ম্যাচ ছাড়া প্রতিটি লড়াই-ই ছিল প্রায় সমানে-সমান। জার্মানি, নেদারল্যান্ডস বা কানাডার মতো দল কোনো ম্যাচে বড় জয় পেলেও পরাশক্তিদের জন্য প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ী করা আগের মতো সহজ ছিল না। লাতিন বা ইউরোপীয় শক্তিরা আগে যেভাবে হেসেখেলে জিতত, সেই দিন এখন অতীত। এর মূল কারণ আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় দলগুলোর বৈজ্ঞানিক ও পেশাদার প্রস্তুতি। মাঠের লড়াইয়ের আগেই এখন ল্যাপটপে চলে প্রতিপক্ষের চুলচেরা বিশ্লেষণ। ‘আমরা কেন পারব না’—এই আত্মবিশ্বাস তথাকথিত ছোট দলগুলোকে বদলে দিয়েছে।

কৌশলগত দিক থেকে এবার ‘ডাবল লাইন ডিফেন্স’ বা নিশ্ছিদ্র রক্ষণভাগ ভাঙা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে থ্রু পাসের চেয়ে উইং বা ফ্ল্যাঙ্ক ব্যবহার করে দেওয়া ক্রস বা পাসে গোল আসছে বেশি। অবশ্য লিওনেল মেসি বা কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো তারকারা ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে বক্সের বাইরে থেকেও জাদু দেখাচ্ছেন।

বিভিন্ন দেশের দর্শকে বর্ণিল হয়েছে বিশ্বকাপের গ্যালারি

দলগুলোর মধ্যে আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্স সবচেয়ে ধারাবাহিক। আর্জেন্টিনার বেঞ্চের গভীরতা এতটাই যে মূল একাদশে বদল আনলেও খেলার ধার কমছে না। অন্যদিকে ব্রাজিল পরে কিছুটা ছন্দ পেলেও প্রথম ম্যাচে সমর্থকদের আশাহত করেছে। সবচেয়ে হতাশ করেছে স্পেন ও পর্তুগাল। পর্তুগালের শক্তিশালী মিডফিল্ড প্রত্যাশা মেটাতে পারেনি; আর জার্মানি বড় জয়ে শুরু করলেও পরের দিকে তাদের খেলার ধার কমেছে। ইংল্যান্ড লম্বা পাসের ঐতিহ্য ছেড়ে নতুন স্টাইলে মানিয়ে নিতে এখনো লড়ছে। মরক্কো গতবারের মতোই ভালো খেলছে। তবে এশিয়া থেকে জাপান নজর কাড়লেও একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ের পর তাদের দৌড় থেমে যাওয়ার উদাহরণ আছে।

ফুটবলপ্রেমী হিসেবে এবার গ্যালারির দর্শক উপস্থিতি আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে। অস্ট্রিয়া-আলজেরিয়ার মতো ম্যাচেও গ্যালারি ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর দর্শক ও অভিবাসীদের মাঠে এসে দলকে সমর্থন দেওয়ার দৃশ্যটি দেখার মতো।

ব্রাজিল সমর্থকেরা এখন একটু আশাবাদী হতেই পারেন

মাঠের কিছু নতুন দিকও ইতিবাচক। যেমন জাতীয় সংগীতের সময় শুধু শুরুর একাদশের ১১ জন নয়, পুরো ২৬ জনের স্কোয়াডই এখন মাঠে থাকে, যা দলের সংহতিকে ফুটিয়ে তোলে। তবে ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ খেলার স্বাভাবিক গতি নষ্ট করছে। এর চেয়ে গোলপোস্টের পাশে বোতল রেখে দিলে খেলোয়াড়েরা সেট পিস বা থ্রো-ইনের ফাঁকে পানি খেয়ে নিতে পারতেন। প্রযুক্তির ব্যবহারে ভিএআর এখন অনস্বীকার্য। এতে কিছুটা সময় লাগলেও বিশ্বকাপের মতো আসরে ভুল সিদ্ধান্তের কারণে কোনো দলের বিদায় একেবারেই প্রত্যাশিত নয়। পাশাপাশি, লিঙ্গসমতার স্বার্থে নারী রেফারিদের উপস্থিতি এবং তাঁদের পারফরম্যান্স দারুণ প্রশংসনীয়।

বিশ্বকাপে এক ম্যাচে তিন নারী অফিশিয়ালকেও দেখা গেছে

আধুনিক ফুটবলে এখন ‘ট্রানজিশন’ বা বল হারানোর সঙ্গে সঙ্গেই কেড়ে নিয়ে দ্রুত আক্রমণে ওঠার গতি অনেক বেড়েছে। এই বয়সেও মেসি বা লুকা মদরিচের মতো সিনিয়র খেলোয়াড়েরা যেভাবে নিচে নেমে রক্ষণকে সাহায্য করছেন, তা অনন্য। নতুন আইন ও সচেতনতার কারণে এবার খেলোয়াড়দের চোটের হারও বেশ কম। ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে মেসি ও এমবাপ্পেকে গতবারের চেয়েও বেশি কার্যকর মনে হচ্ছে। তবে স্পেনের তরুণ তুর্কি লামিনে ইয়ামালকে নিয়ে যত প্রত্যাশা ছিল, তিনি সেভাবে জ্বলে উঠতে পারেননি।

গোলকিপিংয়ে সৌদি আরব ও কেপ ভার্দের কিপারকে অবিশ্বাস্য লেগেছে। এবার রেকর্ড গোল হওয়ার পেছনে নতুন বলের গতি ও সুইংয়ের একটা ভূমিকা থাকতে পারে। সব মিলিয়ে মাঠের আধুনিক কৌশল আর গ্যালারির উপচে পড়া উন্মাদনা এবারের বিশ্বকাপকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।