শাস্ত্রীয় নৃত্যের সঙ্গে লোকনৃত্যের পার্থক্য অনেক জায়গায়। শাস্ত্রীয় নাচের তাল, লয় আর ভঙ্গি রপ্ত করতে লাগে দীর্ঘ ও কঠোর অনুশীলন। কিন্তু লোকনৃত্য একেবারেই সহজ, স্বতঃস্ফূর্ত। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই নাচ হাতবদল হয়ে এসেছে মুখে মুখে, অনুশীলনে অনুশীলনে। শিল্পীরা পরিবেশনায় নিজের মতো স্বাধীনতা নেন ঠিকই, কিন্তু নাচের মূল কাঠামো থেকে যায় ঐতিহ্যের নিয়মেই অটুট। লোকনৃত্য একা যেমন পরিবেশিত হয়, তেমনি দলবদ্ধভাবেও। বরং দলগত নাচই বেশি দেখা যায়, যা সমাজের সমষ্টিগত চিন্তাভাবনার প্রতিফলন। গানও এই নাচের অবিচ্ছেদ্য অংশ - কখনো নৃত্যশিল্পীরা নিজেরাই গান, কখনো বা অন্য একদল গায়কের গানের তালে নাচেন তারা।ধর্ম, সমাজ আর সংস্কৃতির মেলবন্ধনবাংলাদেশের লোকনৃত্যকে মোটাদাগে তিন ভাগে ভাগ করা যায় - ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক। এর মধ্যে ধর্মীয় নাচের সংখ্যাই বেশি। কীর্তন, তপস্যা, বাউল আচার, গম্ভীরা, জারি ও ফকিরি রীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মবিশ্বাস ও লোকাচার। ঢালী আর লাঠি নাচের যোগসূত্র মার্শাল আর্টের সঙ্গে, আর ছোকরা, ঘাটু ও খেমটা নাচ মূলত বিনোদনের জন্য। কিছু নাচে ইসলামি বিশ্বাস ও কাহিনির ছাপ স্পষ্ট, আবার কিছু নাচ গড়ে উঠেছে হিন্দু পুরাণ ও উপকথা ঘিরে। বেশির ভাগ নাচই নিজ নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও কিছু নাচের আবেদন সর্বজনীন। যেমন কীর্তন মূলত হিন্দুদের মধ্যে আর জারি মুসলমানদের মধ্যে জনপ্রিয় হলেও লাঠি বা ঢালী নাচ উপভোগ করেন সব সম্প্রদায়ের মানুষই। তেমনি ছোকরা, ঘাটু ও লেটো নাচ মূলত মুসলমানদের পৃষ্ঠপোষকতায় টিকে থাকলেও এসব পরিবেশনা মুগ্ধ করে সব সম্প্রদায়কেই।বাউলের একতারা আর ঘোরলাগা নাচবাউল নাচ বাউল সাধকদের ধর্মীয় আচারেরই অংশ। বাউল গান মূলত আধ্যাত্মিক ভাবধারার, আর সেই গান গাইতে গাইতে একপর্যায়ে বাউলরা মেতে ওঠেন উদ্দাম নাচে। ডান হাতে থাকে একতারা, কারও কারও পায়ে বাঁধা থাকে ঘুঙুরের মালা। সাধারণত একা নাচলেও কখনো কখনো আখড়ায় দুজন বা দলবদ্ধভাবেও নাচেন বাউলরা। নাচের সময় মাথা ও চুলের গোছা ঝাঁকান, শরীর ঘোরান, হাত-পা নাড়েন - তবে নির্দিষ্ট কোনো বাঁধাধরা ভঙ্গি নেই এতে। একতারা এই নাচে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কখনো কানের কাছে, কখনো উঁচুতে তুলে ধরা হয় সেটি। কুষ্টিয়া-যশোর অঞ্চলে আর পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান-বীরভূমে এই নাচ বিশেষভাবে জনপ্রিয়।ছৌ: মুখোশ পরা যুদ্ধের নাচপশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া-বাঁকুড়া অঞ্চলের বিশেষ এক মুখোশ নাচ ছৌ। ঢাল, তরোয়াল আর লাঠি হাতে পরিবেশিত এই যুদ্ধং-দেহি নাচের বিষয়বস্তু রামায়ণ ও মহাভারত থেকে নেওয়া। দেবতা, দানব বা পশুর চরিত্র অনুযায়ী শিল্পীরা পরেন আলাদা আলাদা মুখোশ ও পোশাক। শক্তসমর্থ গড়নের শিল্পীরাই সাধারণত এই নাচে অংশ নেন, এমনকি নারী চরিত্রও রূপায়িত হয় পুরুষ শিল্পীর মাধ্যমে, নারীর পোশাক ও গহনা পরে। আগে চৈত্রের শেষে বা বৈশাখের শুরুতে শিবপূজা উপলক্ষে জমকালোভাবে হতো ছৌ নাচ, তবে এখন ঋতু বা উপলক্ষনির্বিশেষে যেকোনো সময় পরিবেশিত হয় এটি। বাগদি ও ভূঁইয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে এই নাচ বিশেষ জনপ্রিয়। নাচের সময় শিল্পীরা লাফিয়ে ওঠেন, হাঁটু গেড়ে বসেন, হঠাৎ ছুটে যান প্রতিপক্ষের দিকে। মাথা, ঘাড়, হাত, শরীরের ওপরের অংশ ও পায়ের সূক্ষ্ম নড়াচড়ায় ফুটে ওঠে নানা যুদ্ধভঙ্গি। একা হোক বা দলবদ্ধ, নাচ হয় গোলাকার একটি জায়গায়, চারপাশে বসেন বাদ্যযন্ত্রীরা, শিল্পীদের ঢোকা-বেরোনোর জন্য রাখা হয় সরু পথ। ঢোল আর সানাই এই নাচের প্রধান বাদ্যযন্ত্র। গণেশ বন্দনা দিয়ে শুরু হয় নাচ, এরপর শিল্পীদের স্বাগত জানিয়ে গাওয়া হয় দুই লাইনের গান। এখানে গানের চেয়ে নাচ আর বাজনার গুরুত্বই বেশি। এই নাচের জনপ্রিয়তা বাড়ানোয় বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন আশুতোষ ভট্টাচার্য।ছোকরা, ঘাটু ও লেটো: মেয়ে সেজে ছেলের নাচছোকরা নাচ (আক্ষরিক অর্থে তরুণদের নাচ) মূলত তরুণেরাই মেয়ে সেজে পরিবেশন করেন, সঙ্গে থাকে আলকাপ গান। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ ও মালদহ অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে এই ধারা। আম বাগানে বা খোলা মাঠে চাঁদোয়া টাঙিয়ে বানানো মঞ্চে হয় এই পরিবেশনা, নেতৃত্বে থাকেন একজন সরকার, যার অধীনে থাকেন গায়ক, বাদক ও অভিনয়শিল্পীদের বড় একটি দল। থাকেন একজন ভাঁড়ও। মঞ্চের দুই পাশে বসেন বাদ্যযন্ত্রীরা, বাকিরা অপেক্ষা করেন সাজঘরে, নিজেদের পালার জন্য। ঘাটু নাচের মতো এখানেও মেয়ে সাজা তরুণেরাই অংশ নেন। আলকাপ গান ও ছোকরা নাচের কিছু অংশ বেশ অশ্লীল হওয়ায় এসব পরিবেশনা হয় গভীর রাতে, শুধু বয়স্ক দর্শকদের সামনে। রাধা-কৃষ্ণের কাহিনি এই ধারার জনপ্রিয় বিষয়বস্তু। ঘাটু নাচেও কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক বার্তা নেই, একমাত্র লক্ষ্য বিনোদন। এক বা একাধিক কিশোর মেয়ে সেজে নাচেন, এটাই এই পরিবেশনার প্রধান আকর্ষণ। গান সাধারণত রাধা-কৃষ্ণের কাহিনি নিয়ে, কেউ গান, বাকিরা নাচেন। ঢোল, করতাল, বাঁশি ও সারিন্দা এই নাচের প্রধান বাদ্যযন্ত্র, আজকাল হারমোনিয়ামও ব্যবহৃত হয়। রাতভর চলে এই নাচ, কখনো কখনো বেশ অশ্লীল হয়ে ওঠে বলে জনবসতির বাইরে আয়োজন করা হয় এর আসর। কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনায় আজও আধুনিক মঞ্চে দেখা যায় ঘাটু নাচ। বর্ধমান-বীরভূম অঞ্চলে জনপ্রিয় লেটো নাচও একই ধারার - সুদর্শন এক কিশোর মেয়ে সেজে গান ও নাচ পরিবেশন করেন। কবিগানের আসরের ফাঁকে ফাঁকে বাড়তি বিনোদন হিসেবে পরিবেশিত হতো লেটো নাচ। কিশোর বয়সে কাজী নজরুল ইসলাম নিজেও লেটো গান রচনা করে এসব পরিবেশনায় অংশ নিতেন।জারি-লাঠি-ডাক: শোক আর বীরত্বের নাচজারি নাচ পরিবেশিত হয় জারি গানের সঙ্গে, মূলত শিয়া মুসলমানদের মধ্যে। মহররম মাসে এর আয়োজন হয়, কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসাইনের মর্মান্তিক মৃত্যুর কাহিনি তুলে ধরে এই নাচ। ৮-১০ জন তরুণ মিলে গড়ে ওঠে একেকটি জারি দল, দলনেতাকে বলা হয় ওস্তাদ আর বাকিদের দোহার। শিল্পীরা পরেন সাধারণ পোশাক, তবে হাতে ও কপালে বাঁধেন লাল রুমাল, কোথাও কোথাও পায়েও থাকে ঘুঙুরের মালা। ছন্দ বজায় রাখতে ওস্তাদ বাজান চটি, আর দোহাররা বাজান বাঁশের তৈরি ঝুনরি; কোথাও কোথাও শুধু হাততালিতেই রাখা হয় তাল। মাঝখানে দাঁড়িয়ে গান ধরেন ওস্তাদ, তাঁকে ঘিরে বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে দোহাররা ধরেন গানের ধুয়া। মাথা, হাত ও পায়ের নড়াচড়ায় ফুটে ওঠে বিষাদ। মহররমের চাঁদ দেখা দিলেই শুরু হয় জারি নাচ, গ্রামে গ্রামে ঘুরে পরিবেশনা করে দলগুলো, বিনিময়ে পায় নগদ অর্থ বা খাবার। আশুরার দিন সব দল একত্র হয় নির্দিষ্ট ‘কারবালা’ স্থানে, চূড়ান্ত পরিবেশনার জন্য। লাঠি নাচও মহররম উপলক্ষে তরুণদের দলবদ্ধ পরিবেশনা, তাল রাখতে ব্যবহৃত হয় ঢোল ও করতাল। আঁটসাঁট পোশাক পরা তরুণেরা হাতে নেন চার-পাঁচ ফুট লম্বা বাঁশের লাঠি, সঙ্গে থাকে তরোয়াল, ছোরা ও করতালও। অর্ধেক নাচ, অর্ধেক ক্রীড়া - এই লাঠিখেলায় শিল্পীরা প্রদর্শন করেন নিজেদের বীরত্ব, নকল যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। বাজনার তালে তালে লাঠি ঘোরান সামনে-পাশে, পায়ের নিচ দিয়ে বা মাথার ওপর দিয়ে, লাঠির ঝনঝন শব্দে তৈরি হয় যুদ্ধের আবহ। এই নাচে ঢাকিরই ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ - তার বাজনাই নির্দেশ দেয় শিল্পীদের গতিবিধি ও তাল। ভূমিকা, যুদ্ধভঙ্গি, লড়াই, পরিসমাপ্তি ও বিশ্রাম - এই কয়েক ধাপে বিভক্ত পুরো পরিবেশনা, শুরুতে ধীর লয় থাকলেও শেষে ওঠে তুঙ্গে। মহররমের প্রথম দশ দিন বাড়ির উঠানে, রাস্তার মোড়ে আর শেষে নকল কারবালা প্রাঙ্গণে চলে লাঠিশিল্পীদের প্রদর্শনী।মানিকগঞ্জে জনপ্রিয় ডাক নাচও একধরনের যুদ্ধনাচ, উদ্দেশ্য সহযোদ্ধাদের যুদ্ধে আহ্বান করা। দলনেতা ঘোষণা দেন শত্রুর আক্রমণের, সেই ডাক শুনে মঞ্চে ছুটে আসেন শিল্পীরা - এই অংশটিই ‘ডাক’ নামে পরিচিত। দ্বিতীয় ধাপে লাঠির সাহায্যে প্রদর্শিত হয় মার্শাল দক্ষতা। এই নাচের প্রধান বাদ্যযন্ত্র ঢোল।ঢাল হাতে দ্বৈরথ, কালীর মুখোশঢালী নাচে (আক্ষরিক অর্থে ঢাল নাচ) মঞ্চস্থ হয় দুই যোদ্ধার দ্বৈরথ, অস্ত্র হিসেবে থাকে বেতের বোনা মোটা ঢাল আর বাঁশের লাঠি। ঢোল আর কাঁসার করতালের সুরে এগোয় নাচ, যার মূল উদ্দেশ্য শিল্পীদের শারীরিক সামর্থ্য ও মার্শাল দক্ষতা প্রদর্শন। শুরুতে দুই যোদ্ধা পরস্পরের দিকে হুমকিভরা দৃষ্টিতে তাকান, বাজনার তালে তালে শুরু হয় আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ, কখনো দাঁড়িয়ে কখনো হাঁটু গেড়ে। এই নকল যুদ্ধ চলে চূড়ান্ত মুহূর্ত পর্যন্ত। যশোর-খুলনা অঞ্চলের লোকমেলায় সাধারণত আয়োজন করা হয় ঢালী নাচের।কালো মুখোশ পরে দেবী কালীর রূপ ধারণ করে পরিবেশিত হয় কালী নাচ, মুখোশে থাকে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ রক্তলাল বের করা জিভ। এক হাতে খড়্গ, অন্য হাতে মানুষের খুলি নিয়ে নাচেন শিল্পী। ঢোলই প্রধান বাদ্যযন্ত্র, যা একই সঙ্গে ফুটিয়ে তোলে বীরত্ব আর নিষ্ঠুরতা।গম্ভীরা, খেমটা আর ফকিরি নাচগম্ভীরা গানের সঙ্গে পরিবেশিত হয় গম্ভীরা নাচ, যা একসময় অবিভক্ত বাংলার মালদহে ভীষণ জনপ্রিয় ছিল। আগের মতো প্রচলন না থাকলেও রাজশাহীতে এখনো টিকে আছে এই ধারা। দুই শিল্পী মিলে পরিবেশন করেন এই নাচ, একজন নানা, অন্যজন নাতির চরিত্রে। গান ও নাচের মধ্য দিয়ে তারা তুলে ধরেন সমসাময়িক সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক সমস্যা - সংলাপ চলে গদ্য ও পদ্য দুই আঙ্গিকেই। থাকে একটি কোরাস দল, যারা গানের ধুয়া তোলে। হারমোনিয়াম, বাঁশি, ঢোল ও ঝুড়ি এই নাচের প্রধান বাদ্যযন্ত্র। সংলাপ, নাচ, গান ও বাজনার এই মিশেলে গম্ভীরা অনেকটা লোকনাট্যের মতোই। মালদহে শিল্পীরা মুখোশ পরেও পরিবেশন করেন এই নাচ। খেমটা নাচ পরিবেশিত হয় খেমটা গানের সঙ্গে, যার বিষয়বস্তু রাধা-কৃষ্ণের কাহিনি। ঢোল ও করতালই প্রধান বাদ্যযন্ত্র। যেকোনো উপলক্ষেই পরিবেশিত হতে পারে খেমটা নাচ, একসময় বিয়ে ও পূজায় এর কদর ছিল বেশ। মূলত নারীদের নাচ হলেও কিছু অঞ্চলে হিজড়া সম্প্রদায়ের হাত ধরেই টিকে আছে এই শিল্প। জটিল পদচালনা আর চোখেমুখের অর্থবহ ভঙ্গি এই নাচের বৈশিষ্ট্য। একে বলা যায় বাইজিদের নগর-নাচের গ্রামীণ সংস্করণ। মাদার পিরের অনুসারীরা তার ওরস উপলক্ষে পরিবেশন করেন ফকির নাচ। লম্বা চুল আর ঢিলেঢালা পোশাক পরা ভক্তরা চৈত্রের শেষে পিরের মাজারে জড়ো হন, জ্বালান মোমবাতি ও ধূপ। লাল কাপড়ে মোড়া একটি বাঁশ, যার মাথায় থাকে চামর, উৎসর্গ করা হয় পিরের প্রতীক হিসেবে। একজন ভক্ত কাঁধে বহন করেন সেই বাঁশ, বাকিরা অনুসরণ করেন তাকে। পায়ে বাঁধা থাকে ঘুঙুর। আগুন জ্বালিয়ে তাতে মাংস পোড়ানো হয় পিরের উদ্দেশে নৈবেদ্য হিসেবে। বাজনার তালে মাথা দুলিয়ে আগুনের চারপাশে নাচেন ভক্তরা।মুখোশ আর পুতুলের নাচচৈত্রের শেষ দিনগুলোয় পূজিত হন শিব, ধর্মঠাকুর ও নীল - এই উপলক্ষে বিভিন্ন দেব-দেবীর মুখোশ পরে গান-নাচ পরিবেশন করেন শিল্পীরা। বোলা নাচে মুখোশধারী শিল্পীরা ফুটিয়ে তোলেন শকুনের লাশ খাওয়ার দৃশ্য, নৃসিংহ নাচে দেখানো হয় বিষ্ণুর সিংহরূপী চতুর্থ অবতার। উত্তরবঙ্গে প্রচলিত মুখখেলা নামের এক মুখোশ নাচে গ্রামবাসীরা নিজেরাই কাঠ, কাপড়, কাগজ দিয়ে বানান মুখোশ - চরিত্র হয় রাজা-মন্ত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ কৃষক-কাঠুরে পর্যন্ত। খরার সময় রংপুরের রাজবংশী নারীরা বৃষ্টির দেবতা হুদুমা দেওকে তুষ্ট করতে পরিবেশন করেন বৃষ্টির নাচ - রাতের বেলা দল বেঁধে মাঠে গিয়ে পূজা সেরে নাচগান করেন তারা। বাংলায় পুতুলনাচের ইতিহাস কত পুরোনো তা সঠিক জানা না গেলেও এর প্রথম উল্লেখ মেলে পঞ্চদশ শতকের কাব্য ইউসুফ-জোলেখায়। বাংলায় প্রচলিত পুতুলের তিন ধরন - দণ্ড পুতুল, সুতা পুতুল ও দস্তানা পুতুল। সুতার সাহায্যে পুতুলগুলো এমনভাবে নাচানো হয় যেন তারা সত্যিই নাচছে। ঢোল, করতাল আর বাঁশির তালে শিল্পী গান ধরেন, গানের ভাবের সঙ্গে মিলিয়ে নাচান পুতুল। দণ্ড ও সুতা পুতুল দিয়ে সাধারণত পরিবেশিত হয় পালাগান - রাধা-কৃষ্ণ বা রাম-সীতার কাহিনি, কখনো সমসাময়িক সামাজিক ঘটনাও উঠে আসে এসব পালায়। শিক্ষামূলক হলেও এসব পরিবেশনা বেশ বিনোদনধর্মী। পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনায় আজও জনপ্রিয় দণ্ড পুতুল, নদীয়ায় সুতা পুতুল। দস্তানা পুতুল নাচে দেখা যায় নারী-পুরুষ জুটি। পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর ও বর্ধমানের কাহার সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ আজও পুতুলনাচকে জীবিকা হিসেবে ধরে রেখেছেন। এক হাতে এক পুতুল ধরে গান গেয়ে নাচান শিল্পী। পুরাণের গল্প এখানে জনপ্রিয় হলেও নাচের মূল লক্ষ্য বিনোদনই, ধর্মীয় তাৎপর্য নয়। আগে শিশুর অন্নপ্রাশন বা বিয়েতে পুতুলনাচের আয়োজন করা হতো। উত্তরবঙ্গ, ময়মনসিংহ ও কুমিল্লায় একসময় খুব জনপ্রিয় ছিল এই শিল্প, তবে দেশভাগের পর অনেক হিন্দু শিল্পী পশ্চিমবঙ্গে চলে যাওয়ায় এই ধারা কিছুটা ভাটা পড়ে। এখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হাতে গোনা কয়েকটি পরিবারই এই শিল্পকে জীবিকা হিসেবে ধরে রেখেছে।রায়বেঁশে আর আধুনিক লোকনৃত্যলাঠি নাচের কাছাকাছি ধরনের আরেক যুদ্ধনাচ রায়বেঁশে, যেখানে শিল্পীরা হাতে নেন শক্ত বাঁশের লাঠি, যাকে বলে রায়বাঁশ। তরোয়াল আর বর্শাও ব্যবহার করেন যোদ্ধারা।হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ই অংশ নেন এই নাচে, যা মূলত জনপ্রিয় ছিল বর্ধমান, বীরভূম ও মুর্শিদাবাদে। হাতের দক্ষ ব্যবহারই এই নাচের প্রধান আকর্ষণ।এসব ঐতিহ্যবাহী ধারার পাশাপাশি গড়ে উঠেছে আধুনিক লোকনৃত্যও, যেখানে ফুটে ওঠে বাংলাদেশি পরিচয় - কৃষক-জেলের জীবন, সাধারণ মানুষ আর মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকা মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে।