বিশ্বকাপে রোমাঞ্চকর ম্যাচের তালিকায় নতুন এক অধ্যায়ের জন্ম দিল ইংল্যান্ড ও মেক্সিকো। পাঁচ গোল, একটি লাল কার্ড, দুই পেনাল্টি, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত টানটান উত্তেজনা, সব মিলিয়ে আজতেকা স্টেডিয়ামের এই লড়াই ছিল রুদ্ধশ্বাসপূর্ণ নাটকীয়তার ভরপুর। হার না মানা লড়াই করলেও শেষ পর্যন্ত ৩–২ ব্যবধানে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছে ইংল্যান্ড।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক ঘণ্টা পর শুরু হয় ম্যাচ। অপেক্ষার সেই সময়টুকু যেন সুদে-আসলে ফিরিয়ে দেয় দুই দল। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দেয় তারা, আর প্রথমার্ধেই ম্যাচ পায় নাটকীয় মোড়।
৩৬ ও ৩৮ মিনিটে পরপর দুই গোল করে ইংল্যান্ডকে দারুণ সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে যান জুড বেলিংহাম। চলতি বিশ্বকাপে এই প্রথম গোল হজম করে মেক্সিকো। নিজেদের দুর্গ আজতেকায় এমন ধাক্কা স্বাগতিকদের জন্য ছিল অপ্রত্যাশিত। তবে মেক্সিকো দ্রুতই ম্যাচে ফিরে আসে। ৪২ মিনিটে হুলিয়ান কিনিয়োনেস ব্যবধান কমিয়ে স্বাগতিকদের নতুন করে লড়াইয়ে ফেরান। প্রথমার্ধের বাকি সময়েও সমতায় ফেরার একাধিক সুযোগ তৈরি করেছিল মেক্সিকো, কিন্তু ফাইনাল টাচের অভাবে তা আর সম্ভব হয়নি। বিরতিতে ২–১ ব্যবধানে এগিয়ে থাকে ইংল্যান্ড।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ম্যাচ আরও কঠিন হয়ে ওঠে ইংলিশদের জন্য। ৫৪ মিনিটে হেসুস গায়ার্দোকে ফাউল করে সরাসরি লাল কার্ড দেখেন জ্যারেল কোয়ানসা। ১০ জনের দলে পরিণত হওয়ার পর ইংল্যান্ডকে চেপে ধরে মেক্সিকো। কিন্তু আক্রমণের মধ্যেই উল্টো বিপদে পড়ে স্বাগতিকরা। ৬০ মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনকে বক্সের ভেতর ফাউল করেন গোলরক্ষক রাউল রানহেল। পেনাল্টি থেকে নির্ভুল শটে ইংল্যান্ডের তৃতীয় গোল করেন অধিনায়ক হ্যারি কেইন।
ম্যাচের নাটক তখনও শেষ হয়নি। আট মিনিট পর নিজের বক্সে ব্রায়ান গুতিয়েরেজকে ফাউল করে বসেন কেইন। এবার পেনাল্টি পায় মেক্সিকো, আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাউল হিমিনেজ স্কোরলাইন ৩–২ করেন। এরপর পুরো ম্যাচ যেন একপেশে আক্রমণে পরিণত হয়।
শেষ আধাঘণ্টায় একের পর এক আক্রমণ চালায় মেক্সিকো। বলের দখল, কর্নার, শট; সব পরিসংখ্যানেই এগিয়ে ছিল তারা। ৬৬.৮ শতাংশ সময় বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে স্বাগতিকরা, নেয় ২০টি শট। তবে ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগ অসাধারণ শৃঙ্খলা দেখায়। নিকো ও'রাইলি ও মার্ক গেহির নেতৃত্বে ডিফেন্স বারবার প্রতিহত করে মেক্সিকোর আক্রমণ, আর প্রয়োজনের মুহূর্তে জর্ডান পিকফোর্ডের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ দলকে বাঁচিয়ে দেয়।
পরিসংখ্যানও ম্যাচের গল্প বলে। মেক্সিকো যেখানে ২০টি শট নিয়ে পাঁচটি লক্ষ্যে রাখতে পেরেছে, ইংল্যান্ড সেখানে মাত্র ছয়টি শট নিয়েই পাঁচটি পোস্টের মধ্যে রাখতে সক্ষম হয়। সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতাই শেষ পর্যন্ত দুই দলের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয়।
এই জয়ে শুধু কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত হয়নি, আজতেকার তিক্ত স্মৃতিও অনেকটাই মুছে ফেলেছে ইংল্যান্ড। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে একই মাঠে আর্জেন্টিনার কাছে বিতর্কিত হারের স্মৃতি বহন করে আসা দলটি এবার আনন্দ নিয়েই স্টেডিয়াম ছেড়েছে।
ম্যাচ শেষে কোচ টমাস টুখেল নিজের খেলোয়াড়দের আত্মত্যাগের প্রশংসা করেন। বিশেষ করে ১০ জন নিয়ে শেষ আধাঘণ্টা যেভাবে রক্ষণ সামলেছে দল, সেটিকে তিনি জয়ের মূল চাবিকাঠি হিসেবে দেখেছেন। একই সঙ্গে মেক্সিকোর লড়াকু মানসিকতারও প্রশংসা করেন ইংল্যান্ড কোচ।
অন্যদিকে শেষ বাঁশি বাজার পর আজতেকার গ্যালারিতে নেমে আসে নিস্তব্ধতা। বিশ্বকাপে স্মরণীয় এক লড়াই উপহার দিয়েও বিদায় নিতে হয় স্বাগতিকদের। আর ইংল্যান্ড এগিয়ে যায় নতুন চ্যালেঞ্জের দিকে, যেখানে কোয়ার্টার ফাইনালে তাদের অপেক্ষায় রয়েছে নরওয়ে। যে ভাইকিং নরওয়ে ৫ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে বিদায় করে উঠেছে শেষ আটে!








