মেক্সিকোর ফুটবল ইতিহাসে ১৯৮৬ সালের পর এমন রোমাঞ্চকর রাত আর আসেনি। স্বাগতিকদের সামনে ছিল কেবল একটি ম্যাচ জয়ের সমীকরণ নয়, বরং দীর্ঘ চার দশকের এক আক্ষেপ ঘোচানোর চ্যালেঞ্জ। ম্যাচের শুরু থেকেই মাঠের ভেতরে-বাইরে ছড়িয়েছিল চরম উত্তেজনা।
ম্যাচের আগের রাতেই ইকুয়েডর দল ফিফার কাছে অভিযোগ তোলে যে, মেক্সিকান সমর্থকেরা গভীর রাত পর্যন্ত তাদের হোটেলের বাইরে উৎসব করে খেলোয়াড়দের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। সেই উত্তাপ মাঠের লড়াইয়ে রূপ নেওয়ার আগেই হানা দেয় প্রকৃতি। প্রবল ঝড় আর ঘন-ঘন বজ্রপাতের কারণে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে প্রায় এক ঘণ্টা দেরিতে শুরু হয় খেলা। কিন্তু মাঠের বল গড়াতেই সব বাধা আর অপেক্ষার জবাব দিতে একটুও সময় নেয়নি মেক্সিকো।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবলের পসরা সাজিয়ে বসে স্বাগতিকেরা। নিজেদের রক্ষণভাগ থেকে নিখুঁত পাসের পসরা সাজিয়ে ইকুয়েডরকে আস্তে আস্তে সামনে টেনে আনে তারা। জোহান ভাসকেস থেকে জেসুস গালার্দো হয়ে বল চলে যায় জুলিয়ান কিনিওনেসের পায়ে। এরপর লুইস রোমোর পা ঘুরে রবার্তো আলভারাদোর এক দারুণ লব পাস খুঁজে নেয় কিনিওনেসকে। নিজের গতিকে কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ চূর্ণ করে দুর্দান্ত এক ফিনিশিংয়ে মেক্সিকোকে লিড এনে দেন কিনিওনেস। গ্যালারিতে তখন উৎসবের জোয়ার। সেই ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই ৩১ মিনিটে রাউল হিমেনেস দ্বিতীয় গোল করে ইকুয়েডরকে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেন। পুরো ম্যাচে ইকুয়েডর আর কখনোই ঘুরে দাঁড়ানোর মতো কোনো ছাপ রাখতে পারেনি।
এই ম্যাচটি মেক্সিকোর জয়ের পাশাপাশি ফুটবলের ইতিহাসের এক অনন্য মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে থাকবে। মাত্র ১৭ বছর ২৫৯ দিন বয়সে বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচের শুরুর একাদশে মাঠে নেমে ইতিহাস গড়েন তরুণ তুর্কি গিলবার্তো মোরা। ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে ১৭ বছর ২৩৯ দিন বয়সে খেলতে নামা কিংবদন্তি পেলের পর মোরাই হলেন নকআউট পর্বে খেলা সবচেয়ে কমবয়সী ফুটবলার। পেলের সেই আকাশছোঁয়া উচ্চতায় পৌঁছানো এখনো অনেক দূরের পথ হলেও, মোরার আত্মবিশ্বাসী বল নিয়ন্ত্রণ, নিখুঁত ওয়ান-টাচ পাস আর ড্রিবলিংয়ের সাহস দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। ৫৯ মিনিট মাঠে থেকে এই কিশোর বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি এই বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা আকর্ষণ হতে যাচ্ছেন।
খেলার শেষদিকে ইকুয়েডরের হতাশা আরও বাড়িয়ে দেন ডিফেন্ডার পিয়েরো হিনকাপিয়ে। মেক্সিকোর সান্তি হিমেনেসের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে তিনি মুখ ঢেকে কথা বলেন। এবারের বিশ্বকাপে খেলোয়াড়দের মুখ ঢেকে প্রতিপক্ষের সাথে কথা বলাকে সরাসরি লাল কার্ডযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। এর আগে প্যারাগুয়ের মিগেল আলমিরনও একই ভুল করে মাঠ ছেড়েছিলেন। সেই ঘটনা থেকে শিক্ষা না নিয়ে হিনকাপিয়ে একই কাণ্ড করায় ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির সহায়তায় তাকে লাল কার্ড দেখান রেফারি, যা ইকুয়েডরের রাতটিকে আরও তিক্ত করে তোলে।
শেষ পর্যন্ত ২-০ গোলের দাপুটে জয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয়বারের মতো নকআউট ম্যাচ জয়ের স্বাদ পায় মেক্সিকো। এই জয়ের পর পুরো টুর্নামেন্টেই স্বাগতিক দলটির গুরুত্ব নতুন করে আলোচনায় আসছে। উত্তর আমেরিকায় মেক্সিকোর আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রে থাকা প্রায় ৪ কোটি মেক্সিকান বংশোদ্ভূত মানুষের আবেগের কারণে তাদের বিশ্বকাপে টিকে থাকাটা টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক ও গ্যালারির সৌন্দর্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মেক্সিকো সিটি ও গুয়াদালাহারার দর্শকদের অকুণ্ঠ সমর্থন খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাসকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
গ্রুপ পর্বে সহজ প্রতিপক্ষের বিপক্ষে জয়ের পর ইকুয়েডরের মতো শক্তির বিরুদ্ধে মেক্সিকোর এই পারফরম্যান্স ফুটবল বিশ্বকে নতুন বার্তা দিচ্ছে। গোলরক্ষক রাউল রাঙ্গেলের অসাধারণ ফর্ম, জোহান ভাসকেস ও সিজার মন্তেসের দুর্ভেদ্য রক্ষণ, উইংয়ে কিনিওনেস ও আলভারাদোর গতি, সামনে রাউল হিমেনেসের নিরলস পরিশ্রম এবং মাঝমাঠে এরিক লিরার ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দলটিকে ভারসাম্যপূর্ণ করে তুলেছে।
টুর্নামেন্টের শুরুতে মিডফিল্ডার ওবেদ ভার্গাস যখন ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, তখন অনেক বিশ্লেষকই মেক্সিকোকে নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। তবে এই দলে হয়তো বিশ্বমানের মহাতারকা নেই, গতির কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে, কিন্তু কোচ হাভিয়ের আগিরের তৈরি করা পারিবারিক আবহ ও দলগত ঐক্যই এখন তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়ে মেক্সিকো এবার ফিরছে নিজেদের আসল দুর্গ ঐতিহাসিক অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে। আগামী ৫ জুলাই শেষ ১৬-র লড়াইয়ে ঘরের মাঠের কোটি সমর্থকের সামনে মাঠে নামবে তারা মেক্সিকো দলের যে ছন্দ আর মাঠের গর্জন, তাতে প্রতিপক্ষ হিসেবে যেই আসুক না কেন, ঘরের মাঠে মেক্সিকোকে হারাতে তাদের বিশেষ কিছুই করে দেখাতে হবে।








