মাঠের লড়াইয়ে নেইমার-হলান্ডদের ছাড়িয়ে লাইমলাইটে দুই ‘চিরশত্রু’বিশ্বকাপের শেষ ১৬-এর মঞ্চ। প্রতিপক্ষ চিরচেনা ব্রাজিল ও নরওয়ে। কিন্তু নিউ ইয়র্কের নিউ জার্সি মেটলাইফ স্টেডিয়ামের মহারণ ছাপিয়ে ফুটবল বিশ্বের চোখ এখন অন্য এক ব্যক্তিগত যুদ্ধের দিকে। লড়াইটা কেবল দুই দেশের নয়, লড়াইটা ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম রোমাঞ্চকর দুই সেনাপতির ‘শত্রুতা’ আন্তর্জাতিক রূপ নেওয়ার।বাংলাদেশ সময় রাত ২টায় মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন ম্যানচেস্টার সিটির অপ্রতিভ গোলমেশিন আর্লিং হলান্ড এবং ব্রাজিলের রক্ষণভাগের দুর্ভেদ্য প্রাচীর ও আর্সেনাল ডিফেন্ডার গাব্রিয়েল মাগালায়েস। ক্লাব ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের সেই চরম রেষারেষি, যা মাঠে প্রায়শই বারুদ ছড়ায়, এবার তা গড়াল বিশ্বমঞ্চে। যার ওপর নির্ভর করছে কার হাতে উঠবে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট।ইংল্যান্ডের সাবেক স্ট্রাইকার ক্রিস সাটন এই দ্বৈরথকে বিশ্বকাপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় আখ্যা দিয়ে বিবিসি স্পোর্টকে বলেছেন, "লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপে, হ্যারি কেইন এবং হলান্ডের মতো তারকা ফুটবলারদের মধ্যে গোল্ডেন বুটের লড়াই আমরা অনেক দেখেছি। কিন্তু তাদের মধ্যে এমন কোনো ব্যক্তিগত দ্বৈরথ ছিল না। এবার আমরা সেটি দেখতে পাচ্ছি। চলতি বিশ্বকাপে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যক্তিগত দ্বৈরথ এবং নিশ্চিত থাকুন, ম্যাচের ফলাফলের ওপর এর এক বিশাল প্রভাব থাকবে। এটি এতোটা আকর্ষণীয় হওয়ার মূল কারণ হলো আমরা জানি তাদের দুজনের মধ্যে কতটা তিক্ত সম্পর্ক রয়েছে। আমি নিশ্চিত যে তারকা খেলোয়াড়দের মধ্যে একে অপরের প্রতি এক ধরণের শ্রদ্ধা থাকে, কিন্তু মাঠে তাদের আচরণ দেখে মনে হয় তারা একে অপরকে চির শত্রু।"আরেক সাবেক ইংলিশ অধিনায়ক অ্যালান শিয়ারারও মুখিয়ে আছেন এই যুদ্ধ দেখতে। তিনি বলেন, "এটি একটি দারুণ লড়াই হতে যাচ্ছে কারণ সেখানে নিশ্চিতভাবেই কিছু ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব থাকবে। তারা একে অপরকে পছন্দ করে না এবং সেটি খুবই স্বাভাবিক, প্রতিপক্ষকে পছন্দ করার কোনো বাধ্যকতা নেই। আমরা আগেও তাদের মধ্যে সংঘর্ষ হতে দেখেছি, তাই এই ম্যাচটির দিকে সবার বাড়তি নজর থাকবে।"এই শত্রুতার শুরুটা হয়েছিল ২০২৪ সালের এক রোববারে, যখন শেষ মুহূর্তের গোলে আর্সেনালের জয় কেড়ে নিয়েছিল সিটি। চরম হতাশায় মুখ ঢেকে রাখা গাব্রিয়েলের মাথায় পেছন থেকে বল ছুঁড়ে মেরেছিলেন হলান্ড। শুধু তাই নয়, ম্যাচ শেষে আর্সেনাল বস আর্তেতাকে উদ্দেশ্য করে হলান্ড দুইবার ছুঁড়ে দিয়েছিলেন সেই কুখ্যাত মন্তব্য, "স্টে হাম্বল"। অবশ্য পরে নিজের পক্ষ সমর্থন করে হলান্ড বলেছিলেন, "ফুটবল মাঠে যা ঘটে, তা মাঠেই থাকে। এটাই নিয়ম। এটি একটি যুদ্ধ, একটি লড়াই, তাই ফুটবলে একে অপরকে উস্কে দেওয়া খুবই স্বাভাবিক। এটা খেলারই অংশ।"কিন্তু গাব্রিয়েল সেই অপমান ভোলেননি। পরের বছর সিটিকে ৫-১ গোলে বিধ্বস্ত করে হলান্ডের কানের কাছে গিয়ে চিৎকার করে মধুর প্রতিশোধ নিয়েছিলেন। পরে স্বীকারও করেছিলেন, "আমি এটা করেছিলাম কারণ ও আমার মাথায় বল ছুঁড়ে মেরেছিল। ও যেভাবে আমাকে উস্কে দিয়েছিল, আমিও তাঁকে সেভাবেই ফিরিয়ে দিয়েছি। আমরা যখন গোল করি, ও ঠিক আমার পাশেই ছিল, তাই আমি সরাসরি ওর কানের কাছে গিয়ে চিৎকার করি।" এরপর সোশ্যালে গান গেয়ে খোঁচাখুঁচি তো চলেছেই।আজকের ম্যাচের রোমাঞ্চ আরও বাড়িয়েছে অন্য এক ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান। পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল নরওয়ের বিপক্ষে চারবারের দেখায় একবারও জিততে পারেনি! এবার সেই জুজু কাটানোর মিশন কার্লো আনচেলত্তির। তবে ব্রাজিলের জন্য বড় প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে মেটলাইফ স্টেডিয়ামের কন্ডিশন। শব্দ বিভ্রাট, গুদামঘরের মতো প্রেস রুম আর চূড়ান্ত রকমের বাজে শুষ্ক পিচ নিয়ে চটেছেন সবাই। পিচের কড়া সমালোচনা করে খোদ ইর্য়গেন ক্লপ বলেছেন, "হিউস্টনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এবং দারুণ পিচে খেলা আর নিউ জার্সির এই শুষ্ক ঘাসে খেলার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে। এই শুকনো ঘাস পুরো খেলার ধরনই বদলে দেয়।"সাথে যোগ হয়েছে আকাশচুম্বী ট্রেন ভাড়ার বিতর্ক। এই শক্ত খটখটে মাঠের অভিশাপ থেকে ম্যাচটিকে বাঁচাতে পারে কেবল বৃষ্টি। সব মিলিয়ে, এক মহানাটকীয় রাতের অপেক্ষায় ফুটবল দুনিয়া, যেখানে গাব্রিয়েল ও হলান্ডের ব্যক্তিগত অহমিকার লড়াই-ই নির্ধারণ করে দিতে পারে বিশ্বসেরার মঞ্চে কার যাত্রা দীর্ঘ হবে আর কাকে ফিরতে হবে অশ্রুসিক্ত চোখে।