রাজধানীর মিরপুরের শেওড়াপাড়া, মনিপুর ও ১১ নম্বর এলাকার অনেক বাসিন্দার দিন শুরু হচ্ছে পানি খোঁজার মধ্য দিয়ে। কোনো বাড়িতে কয়েক ঘণ্টার জন্য পানি আসছে, কোথাও আবার দিন–রাত পানির টেপ শুকনো। এমন অবস্থায় অনেককে রান্না, গোসল, কাপড় ধোয়া কিংবা শৌচাগার ব্যবহারের মতো নিত্যদিনের কাজ চালাতে বাইরে থেকে পানি কিনতে হচ্ছে। আবার অনেকে দূরের এলাকা থেকে পানি আনছেন, কেউ যাচ্ছেন আত্মীয়স্বজনের বাসায়।
এই সংকট কয়েক দিনের হলেও এর পেছনের কারণ দীর্ঘদিনের। মেট্রোরেল চালুর পর শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া ও আশপাশে নতুন নতুন বহুতল ভবন হয়েছে। বেড়েছে ভাড়াটে ও স্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা। সেই সঙ্গে পানির চাহিদাও বেড়েছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় সরবরাহব্যবস্থা বাড়েনি। এর মধ্যে সাভারের ভাকুর্তা পানি শোধনাগারে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
ঢাকা ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, ভাকুর্তা শোধনাগার থেকে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১২ কোটি লিটার পানি মিরপুর এলাকায় সরবরাহ করা হয়। কিন্তু ২০ জুন শোধনাগারের ট্রান্সফরমার ও জেনারেটরে ত্রুটি দেখা দেয়। ওই দিন মাত্র ৭ কোটি লিটার পানি পাওয়া যায়। পরের দুই দিন প্রতিদিন ১০ কোটি লিটার করে পানি সরবরাহ করা হয়। ফলে তিন দিনে স্বাভাবিকের তুলনায় মোট ৯ কোটি লিটার পানি কম সরবরাহ হয়েছে।
ওয়াসার কর্মকর্তারা বলছেন, ভাকুর্তার পানি মূলত বৃহত্তর মিরপুরে যায়। তাই সরবরাহে সামান্য ঘাটতি হলেও এর বড় চাপ পড়ে শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, মনিপুর ও আশপাশ এলাকায়। আগে থেকেই যেসব এলাকায় চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম ছিল, সেখানে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
এক সপ্তাহ ধরে দুর্ভোগ
শেওড়াপাড়ার ইকবাল রোডের বাসিন্দা সৈয়দ সারদিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের এলাকায় দিন–রাত ২৪ ঘণ্টাই পানি থাকছে না। বিভিন্নভাবে পানি সংগ্রহ করে চলতে হচ্ছে। গোসল করতে আত্মীয়স্বজনের বাসায় যেতে হচ্ছে। এক সপ্তাহ ধরে সংকট বেশি।

মনিপুর এলাকার এক বাসিন্দা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের একটি বড় পদে কর্মরত। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, পানি যে জীবনে কতটা অপরিহার্য, সংকটে না পড়লে তা বোঝা যায় না।
চার দিন ধরে মিরপুর ১১ নম্বরের কিছু এলাকাতেও পানির সংকট চলছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, কখন পানি আসবে, কতক্ষণ থাকবে কিংবা সংকট কত দিন চলবে—এসব বিষয়ে ওয়াসার কাছ থেকে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে আগে থেকে পানি সংরক্ষণ বা দৈনন্দিন কাজের পরিকল্পনাও করা যাচ্ছে না।
* মিরপুরে পানির তীব্র সংকটে ভোগান্তি* সড়ক অবরোধ করে বাসিন্দাদের বিক্ষোভ* ভাকুর্তা শোধনাগারে যান্ত্রিক ত্রুটি
পানির সংকটে ক্ষুব্ধ হয়ে আজ রোববার দুপুরে শেওড়াপাড়ার শতাধিক বাসিন্দা বালতি ও বোতল নিয়ে মূল সড়ক অবরোধ করেন। তাঁরা প্রায় ২০ মিনিট সেখানে অবস্থান করেন। পরে রাতের মধ্যে পানি দেওয়ার আশ্বাস পেয়ে সড়ক ছেড়ে দেন।
মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বেলা দুইটার দিকে শতাধিক মানুষ পানির দাবিতে সড়ক অবরোধ করেছিলেন। ঢাকা ওয়াসার সঙ্গে কথা বলার পর পানি দেওয়ার আশ্বাস পেয়ে তাঁরা চলে যান।
গভীর নলকূপেও কমছে পানি
ঢাকা ওয়াসা সূত্র বলছে, ঢাকায় প্রতিদিন পানির চাহিদা প্রায় ৩০০ কোটি লিটার। এই চাহিদা পূরণে ঢাকা ওয়াসা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৩৫০টি গভীর নলকূপ স্থাপন করেছে। পাশাপাশি নদীর পানি শোধন করেও সরবরাহ করা হচ্ছে।
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এপ্রিল, মে ও জুন পানির জন্য সংকটকাল। এ সময় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায়। মিরপুরের বিভিন্ন পাম্প থেকে যে পরিমাণ পানি পাওয়ার কথা, তার এক-তৃতীয়াংশের কম পাওয়া যাচ্ছে। কোনো কোনো পাম্প থেকে সক্ষমতার পাঁচ ভাগের এক ভাগ পানি উঠছে। তিনি বলেন, ভাকুর্তা থেকে একসময় দিনে ১৫ কোটি লিটার পর্যন্ত পানি পাওয়া গেলেও সম্প্রতি তা ১২ থেকে ১৩ কোটি লিটারে নেমে আসে। এর মধ্যে জেনারেটর অকেজো হয়ে যাওয়ায় সংকট আরও বেড়েছে।
ওয়াসার এমডি আরও বলেন, বিভিন্ন স্থানে অনুমতি ছাড়া মূল পাইপ কেটে পানির সংযোগ নেওয়া হয়েছে। মেট্রোরেলের কাজের সময়ও পানির লাইনের ওপর চাপ পড়েছে। সংকট সামাল দিতে এখন রেশনিং করে একেক এলাকায় একেক সময়ে পানি দেওয়া হচ্ছে। নতুন গভীর নলকূপ স্থাপন ও পুরোনো নলকূপ প্রতিস্থাপনের কাজও চলছে। পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে পরিস্থিতি সন্তোষজনক পর্যায়ে যাবে বলে তিনি আশা করছেন।








