আল-আজহার নয়, আজহার সম্বোধন করেই বলব। এটা আমাদের মুখের ভাষা হয়ে গেছে যে! প্রথমেই আপনাকে আমি আজহারে নিমন্ত্রণ করব। পৃথিবীর দ্বিতীয় প্রাচীনতম এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাসঙ্গিকতা তো আছেই নানা ক্ষেত্রে। এই বিশ্ববিদ্যালয় দর্শনীয়ও। আজহার তো কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, হাজার বছর পরে এসেও নববি সিলসিলা জারি রাখা এক দেদীপ্যমান আলোক রশ্মি। ইসলামি শিক্ষার চির আধুনিক নয় শুধু, অত্যাধুনিক বাতিঘর। একই সঙ্গে আজহারে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি জাগতিক শিক্ষাও সমান প্রাসঙ্গিক। মানে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেন কোনো কিছুই, কোনো শিক্ষাই অনুপস্থিত না থাকে, আজহার তার সর্বশ্রেষ্ঠ উপমা বা উদাহরণ!

৯৭০ খ্রিষ্টাব্দ। ফাতিমি শাসন তখন। চতুর্থ প্রধান খেলাফত। কায়রোতে তার রাজধানী। ওই বছরই কায়রো শহর প্রতিষ্ঠিত হয়। তৎকালীন ফাতিমি শাসক ও ইমাম আল-মুইজ লিদ্বীনিল্লাহর আদেশে প্রতিষ্ঠা করা হয় আল-আজহার মসজিদ। এই মসজিদই আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণতা নেয়। আল-মুইজ লিদ্বীনিল্লাহ ছিলেন ফাতিমি খেলাফতের চতুর্থ ইমাম বা খলিফা। বলে রাখা ভালো, ফাতিমি খেলাফত ছিল শিয়া ইসমাইলিয়া প্রভাবের খেলাফত। (এই খেলাফতের নামকরণ ছিল সাইয়েদা ফাতিমা (রা.)-এর নামে)। ইমাম বা খলিফা মুইজও ইসমাইলি শিয়াই ছিলেন। ফলে আজহার প্রতিষ্ঠা হয়েছিল শিয়া মতবাদ প্রচারের জন্যই।

১১৭১ খ্রিষ্টাব্দে মিসরের ক্ষমতায় আসেন মহান মুজাহিদ সালাহউদ্দিন আইয়ুবী। তিনি তখন আজহারের কার্যক্রম ও শিক্ষাদান সীমিত করে দেন। ধীরে ধীরে শিয়া ইমামদের প্রভাব কমিয়ে আনেন। তখন প্রায় ১০-১২ বছর আজহারের শিক্ষা কার্যক্রম অতি সীমিত হয়ে আসে, এমনকি বন্ধই ছিল বলা চলে। পরবর্তী সময়ে তিনি সুন্নি আলেমদের নিয়োগ দেন এবং যথাক্রমে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রম ও সামাজিক কার্যক্রম অগ্রগতির দিকে যেতে থাকে। এবং আজহারের সকল কার্যক্রমই এগোতে থাকে মাজহাবভিত্তিক। মানে প্রসিদ্ধ চার মাজহাবের রূপরেখায়—শাফেয়ি, হানাফি, মালিকি ও হাম্বলি।

আল-আজহারের নাম অপরিবর্তিতই আছে শুরু থেকে। কেননা শিয়ারা এই নামটি নির্বাচন করেছেন সাইয়েদা ফাতিমাতু আল-জাহরা (রা.)-এর নাম থেকে। তাই আজহারের এই নামকরণকে ফাতিমি খেলাফতের প্রতীক হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।

আজহারের স্থাপত্য একদিকে যেমন ইসলামি শিল্প ও স্থাপত্যকলার অনন্য নিদর্শন, তেমনি এটি ইতিহাসের নানা পর্বের সাক্ষী। প্রাচীন অংশে মুঘলীয় মিনার, মার্বেল পাথরের মেঝে ও মাঠ, আরবি ক্যালিগ্রাফি এবং কুব্বা (গম্বুজ) চোখে পড়ে, যা উসমানীয় এবং ফাতিমি স্থাপত্যের ছাপ বহন করে।

আধুনিক ভবনগুলো—গবেষণাকেন্দ্র, লাইব্রেরি, অডিটরিয়াম, আইটি ল্যাব, মেডিকেল ফ্যাকাল্টিসহ সকল আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন। এই যুগলতা আল-আজহারকে একাধারে অতীত ও ভবিষ্যতের সেতুবন্ধনে পরিণত করেছে। এমনকি আধুনিক ভবনগুলোতেও ইসলামি বিভিন্ন খেলাফতের বিভিন্ন ছাপ পরিলক্ষিত।

আজহার তো বহুমুখী। আজহারের ফ্যাকাল্টি পরিচিতি ও শিক্ষার বিষয়াদি নিয়ে বলতে গেলে আলাদা নিবন্ধের প্রয়োজন। তবু কিছু নোক্তা দিয়ে রাখছি। আজহারের ফ্যাকাল্টিগুলো সাধারণত তিন স্তরের। এর মাধ্যমে ফ্যাকাল্টিগুলোর বিন্যাস করা হয়—

বাংলাদেশ থেকে আল-আজহারে পড়তে যাওয়ার জন্য নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে হয়, যদিও বর্তমানে লিগ্যাল ভিসা বন্ধ আছে। তবু পুরোনো ধাপগুলো আওড়ানো—

অর্থায়ন: সাধারণত এখানে নিজ খরচে পড়তে হয়, কেউ কেউ সরাসরি আজহারের অথবা মিসর সরকারের বৃত্তিও (স্কলারশিপ) পায়। সেটার নানা প্রক্রিয়া আছে। সরাসরি স্কলারশিপেও আসা যায়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিভিন্ন সময় তাদের ওয়েবসাইট ও পত্রিকায় জানিয়ে দেয়। তবে সেটার দৌড়ঝাঁপ অনেক এবং কোটাও খুবই সামান্য।

এখানে আসার পর প্রথমেই ভাষা পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। তারপর ধীরে ধীরে সামনে এগোতে হয়। অবশ্য কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা দেশে থেকেই ভাষা পরীক্ষায় অংশ নেন। কেননা ওসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আজহারের মুআদালা বা সনদ সমতার চুক্তি আছে।

প্রিয় পাঠক, আপনাকে পিরামিডের শহরে দাওয়াত করছি। দাওয়াত করছি ঐতিহাসিক আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শহরে। আজহার তো শুধু কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নয়, বরং আজহার ইতিহাস আগলে আছে। আজহার একটি ঐতিহ্য, আলোক ও দিগ্‌দর্শন। এর ইতিহাস যেমন দীপ্তিময়, ভবিষ্যৎও তেমনি সম্ভাবনাময়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের মুসলিম যুবসমাজ যদি এখান থেকে সত্যিকারের জ্ঞান ও নৈতিকতা অর্জন করে, তবে পরবর্তী শতাব্দীর ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রভাব ভিন্ন হতে পারে।