ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজার ছয় দিনব্যাপী আনুষ্ঠানিকতায় থাকবেন বিশ্বের নানা দেশের সরকার, রাষ্ট্রপ্রধানসহ প্রতিনিধিরা। এজন্য নিরাপত্তামূলক ব্যাপক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তার বাবাকে শ্রদ্ধা জানানোর এ নজিরবিহীন আয়োজনে অংশ নেবেন কি না-এ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।

মোজতবার উপস্থিত থাকা, না থাকা এক ধরনের উভয় সংকট তৈরি করেছে। তিনি উপস্থিত থাকলে তার নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আবার না থাকলে প্রশ্ন উঠবে-বাবার শেষ শয়ানের আয়োজনে তিনি থাকলেন না? আজ শনিবার থেকে শুরু হচ্ছে এ আয়োজন। চলবে ৯ জুলাই বৃহস্পতিবার পর্যন্ত। ওইদিন পবিত্র শহর মাশাদে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে দাফন করা হবে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালিয়ে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে সপরিবারে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। ওই হামলায় গুরুতর আহত হন বর্তমান নেতা মোজতবা। বলা হয়, হামলার কারণে তার পা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওই ঘটনার পর বক্তব্য-বিবৃতি এলেও কখনো মোজতবা খামেনিকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ওই হামলায় মোজতবা খামেনির স্ত্রী জাহরা হাদ্দাদ-আদেলও নিহত হন। ওইদিন ইরানের মিনাব শহরের একটি স্কুলে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়ে ১৬৮ শিশুকে হত্যা করা হয়েছিল, যাদের বয়স ৬ থেকে ১১ বছরের মধ্যে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের ৪১ দিনের তীব্র যুদ্ধের পর এখন একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চলছে, যা যে কোনো সময় ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভারতে ইরানের প্রতিনিধি আয়াতুল্লাহ হাকিম ইলাহির উদ্ধৃতি দিয়ে শুক্রবার টাইমস অব ইন্ডিয়া জানায়, বাবার দাফন কেন্দ্র করে অনুষ্ঠানে নিরাপত্তার কারণে উপস্থিত থাকবেন না মোজতবা খামেনি। ইসরাইলের হুমকি ও পর্যবেক্ষণের জেরে সৃষ্ট উদ্বেগের কারণে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা তার উপস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন।

সর্বশেষ গত সপ্তাহে ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কার্টজ মোজতবা খামেনিকে হত্যার হুমকি দেন। তিনি বলেন, মোজতবাকে ‘হত্যার জন্য চিহ্নিত’ করেছে ইসরাইল। এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি কঠোর বার্তা দিয়ে বলেছেন, ইরানের নেতৃত্বের ওপর কোনো ধরনের হুমকির জবাব হবে তাৎক্ষণিক ও কঠোর। আরাঘচি বলেন, ‘ইসলামাদ সমঝোতা চুক্তির শর্ত একেবারে পরিষ্কার এবং এটা সবার দেখার জন্য উন্মুক্ত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট তেল আবিবে থাকা তাদের পোষ্যদের কণ্ঠরোধ করেছেন। যদি তারা (ইসরাইল) তাদের প্রভুদের অমান্য করে, তবে ইরান তাদের শিক্ষা দেবে। আমাদের জনগণ ও নেতৃত্বের ওপর হুমকি তাৎক্ষণিক শক্তিশালী জবাব পাবে।’

এছাড়াও গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপকূলীয় এলাকায় হামলা চালায়। জবাবে কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন স্থাপনা ও ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু বানায় ইরান। এতে দুপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ে। তবে সপ্তাহ শেষ হয় কাতারে দুপক্ষের প্রতিনিধিদের আলোচনার মাধ্যমে। পরে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে বলেও জানানো হয়। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চলাকালেই দুই হামলা চালিয়েছিল ইসরাইল, যা যুদ্ধে রূপ নিয়েছিল।

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় বিশ্বের কয়েক ডজন দেশের প্রতিনিধিরা থাকছেন। ইরান এটাকে ভিন্ন এক মাত্রায় নিয়ে গেছে। এ অবস্থায় ইসরাইলের কোনো ধরনের হামলা বড় বিপর্যয় নিয়ে আসতে পারে। তা সত্ত্বেও মোজতবা খামেনির ওপর কী হামলা হবে না, বা তার অবস্থান চিহ্নিত করে পরে হামলা হবে না-এমন কথা জোর দিয়ে বলা যায় না। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের শক্ত গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক রয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো-তাহলে কী মোজতবা তার বাবার জানাজায় থাকছেন না? এত ঝুঁকির পরও ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতার জানাজায় অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ অনুষ্ঠান চলবে ছয় দিন ধরে। ইরানের ইতিহাসে এত বড় আয়োজন আর হয়নি। এটা বৈশ্বিক পর্যায়ের আয়োজন। এ আয়োজনের কোনো একপর্যায়ে হয়তো উপস্থিত হতে পারেন মোজতবা। কিন্তু বিষয়টি আবেগের হলেও কৌশলের সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট। তাই তিনি জনসমক্ষে না এলে এটা ইরানের বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপ হিসাবেও দেখা হতে পারে।