মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর ছোড়া গুলিতে আহত হয়েছিলেন মন্নাস আলী (৭৫)। এ কারণে প্রায় সময় অসুস্থ থাকলেও অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছিলেন না তিনি। দীর্ঘ ৫৫ বছর পেটে বহন করা গুলিটি অবশেষে অপসারণ করা হয়েছে। গতকাল শনিবার দুপুরে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অস্ত্রোপচার করে গুলিটি অপসারণ করা হয়।

হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা তানজিরুল ইসলাম রায়হানের নেতৃত্বে চিকিৎসকদের একটি দল বিনা মূল্যে প্রায় আধা ঘণ্টা অস্ত্রোপচার চালিয়ে মন্নাস আলীর শরীর থেকে গুলিটি বের করে আনে। মন্নাস নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার গাঁওকান্দিয়া ইউনিয়নের হরিয়াউন্দ গ্রামের বাসিন্দা। পেশায় কৃষক।

স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবার, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গ্রন্থ ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দুর্গাপুরে পাকিস্তানি বাহিনী ক্যাম্প স্থাপন করেছিল। ওই বছরের ৫ মে গাঁওকান্দিয়া ইউনিয়নের হরিয়াউন্দ গ্রামে এক নারীকে সম্ভ্রমহানির চেষ্টা করে পাকিস্তানি বাহিনী। তখন ওই নারীসহ দুজন নারী এবং একজন মুক্তিযোদ্ধা আত্মরক্ষার্থে তিনজন পাকিস্তানি সেনাকে কুপিয়ে হত্যা করেন। পরে সেখানেই তাঁদের মাটিচাপা দিয়ে রাখা হয়।

এ ঘটনার প্রতিশোধ নিতে পর দিন ৬ মে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন নিয়াজ মুর্শেদের নেতৃত্বে আশপাশের গ্রামগুলোতে হত্যাযজ্ঞ চালাযনো হয়। এর অংশ হিসেবে স্থানীয় ইউনুস মাস্টারের বাড়ির একটি ঘরে অর্ধশত মানুষকে আটকে রেখে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং নির্বিচার গুলি চালানো হয়। এতে অনেকে আগুনে পুড়ে ও গুলিতে নিহত হন। কেউ কেউ প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে পালিয়ে যান। মন্নাস আলীও সেদিন পালানোর চেষ্টা করছিলেন। তখন পাকিস্তানি সেনাদের ছোড়া একটি গুলি তাঁর পেটে বিদ্ধ হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ইউনুস মাস্টারের ভিটা থেকে ২১ জনের মাথার খুলি পাওয়া যায়।

মন্নাস আলীর পেট থেকে বের করা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গুলি

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক আলী আহাম্মদ খান আইয়োব রচিত ‘নেত্রকোনা জেলার ইতিহাস’ গ্রন্থের ৩২৭ ও ৩২৮ পৃষ্ঠায় এ ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। ‘গণহত্যা, বধ্যভূমি ও গণকবর’ নামে লেখকের আরেকটি গ্রন্থেও ঘটনার বর্ণনা আছে।

পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার নজির মন্নাস আলী নিজের শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছিলেন। দারিদ্র্যের কারণে উন্নত চিকিৎসা করাতে পারেননি। অস্ত্রোপচার করে গুলি বের করার বিষয়ে মনে ভীতিও কাজ করত। এ অবস্থায় শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে জীবন পার করছিলেন তিনি।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মন্নাস আলীর কষ্টের বিষয়টি উঠে এলে তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পরে স্থানীয় যুবক মোশারফ হোসেনসহ কয়েকজনের উদ্যোগে তাঁকে গত শুক্রবার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা নিশ্চিত হন। এরপর গতকাল দুপুরে চিকিৎসকদের সহযোগিতায় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে গুলিটি তাঁর শরীর থেকে অপসারণ করা হয়।

মন্নাস আলীর ছেলে আবুল হোসেন বলেন, ‘আমার আব্বা গুলির কারণে বেশির ভাগ সময় অসুস্থ থাকতেন। টাকার অভাবে আমরা চিকিৎসা করাইতে পারছি না। এ ছাড়া আব্বাও অপারেশন কইরা গুলি বাইর করা নিয়া খুব ভয় পাইতেন। সবার সহযোগিতায় তাঁর শরীর থাইক্কা গুলিটি বের করা হইছে। আমরা সবার কাছে দোয়া চাই।’

মন্নাস আলীর পুত্রবধূ হামিদা খাতুন বলেন, ‘আমার শ্বশুর সব সময়ই কইতেন তাঁর শরীরে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানিদের ছোড়া গুলি রইছে। মৃত্যুর পর যেন গুলি বের না করেই তাঁকে দাফন করা হয়। আজ আল্লাহ আমাদের দিকে মুখ তুইল্লা তাকাইছেন। অপারেশনের পরে আমরা নিজের চোখে গুলিটি দেখলাম।’

মোশারফ হোসেন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাটি শুনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করি। এরপর গুলি অপসারণে অনেকেই আমাদের সাহস দেন। পরে মান্নাস আলী ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে কথা বলে হাসপাতালে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকের পরামর্শে পরদিন আবারও হাসপাতালে নিয়ে গেলে অপারেশন করে গুলি বের করা হয়।’

দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা তানজিরুল ইসলাম জানান, শুক্রবার মোশারফ নামের এক ব্যক্তি মন্নাস আলীকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও এক্স-রে করার পর তাঁর পেটে গুলি থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। টাকার অভাবে তিনি এত দিন চিকিৎসা নিতে পারেননি জেনে সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে অস্ত্রোপচারটি করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া গুলির বিষয়ে স্থানীয় থানা-পুলিশকে অবহিত করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি সুস্থ আছেন এবং তাঁকে আরও তিন-চার দিন হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হবে।

চিকিৎসকদের বরাতে জানা যায়, গুলিটি দুই সেন্টিমিটারের মতো হতে পারে। এখনো তা হাসপাতালে রাখা আছে। তাঁর সঙ্গে মো. সোহেল রানা নামের একজন চিকিৎসক অস্ত্রোপচারে অংশ নেন। পেটের বাঁ পাশে গুলিবিদ্ধ স্থানে ইনফেকশন হয়ে গিয়েছিল। অস্ত্রোপচারের সময় প্রচুর পুঁজ বের হয়।

দুর্গাপুর থানার ওসি খন্দকার শাকের আহমেদ বলেন, মান্নাস আলীর শরীর থেকে গুলি অপসারণের বিষয়টি চিকিৎসকেরা পুলিশকে জানালে বিষয়টি থানায় রেকর্ড করে রাখা হয়েছে। তাঁর পরিবার চাইলে এ নিয়ে সাধারণ ডায়েরি করতে পারেন।