নবম জাতীয় পে-স্কেল পূর্ণ বাস্তবায়নের প্রতীক্ষা আরও দীর্ঘ হলো। পে-স্কেল বাস্তবায়নসংক্রান্ত সুপারিশমালা এখনো চূড়ান্ত করতে পারেনি মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের সচিব কমিটি।

বুধবার (১৫ জুলাই) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে এ বিষয়ে আরেকটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক হলেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে সুপারিশমালা চূড়ান্ত করতে আগামী সপ্তাহে আবারও বৈঠকে বসবে কমিটি।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সরকার ১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল কার্যকর দেখালেও গেজেট প্রকাশে আরও সময় লাগবে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রায় ২১ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য প্রথম ধাপে মূল বেতন (বেসিক) কার্যকর করা হবে। পরবর্তী দুই ধাপে অন্যান্য ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সর্বশেষ বৈঠকে পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতা, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, বাস্তবায়নের ধাপ, সফটওয়্যার কাঠামো ও প্রশাসনিক জটিলতাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সচিব কমিটি সরকারের কাছে একটি সুপারিশমালা দেবে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই ধাপে ধাপে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে বুধবারের বৈঠকেও সুপারিশ চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) একটি প্রতিনিধিদল ১২ জুলাই থেকে ঢাকা সফর করছে। সফরকালে প্রতিনিধিদল অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করে। চলমান আর্থিক সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে। আইএমএফের মতে, এ ধরনের বড় বেতন বৃদ্ধি একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতা আরও বাড়াবে, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলতে পারে।

সূত্র জানায়, সচিব কমিটির বৈঠকে পে কমিশনের সুপারিশ করা ২০টি গ্রেড নিয়েও আলোচনা হয়েছে। গ্রেডের সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকবে না কি কমানো-বাড়ানো হবে, সে বিষয়েও মতামত উঠে এসেছে। কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, ২০তম গ্রেডের বেতন ৪৮ হাজার ৪০০ টাকা এবং প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত বেতন এক লাখ ৬০ হাজার টাকা রাখার প্রস্তাব রয়েছে।

এ বিষয়ে কমিটির এক সদস্য বলেন, কত সময় নেবে বা কয়টা বৈঠক করবে, সেটা তো কমিটির স্বাধীনতা। কমিটি বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। কমিটির সুপারিশ পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে সরকার। এজন্য আরও কিছুটা সময় লাগতে পারে।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, অন্তর্বর্তী সরকার নবম পে-স্কেল ঘোষণা করলেও বর্তমান বিএনপি সরকার তা বাস্তবায়নে নীতিগতভাবে আন্তরিক। এ লক্ষ্যেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্রাচুইটিসহ মোট বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা। 

পাশাপাশি নতুন পে-স্কেলের আংশিক বাস্তবায়ন, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের সুবিধা ও পেনশনভোগীদের সমন্বিত সুবিধা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকার আর্থিক সংস্থান রাখা হয়েছে।

আরও পড়ুন

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি: বাকিদের চলবে কেমন করে?

তবে বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও রাজস্ব চাপে এত বড় বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আইএমএফ। সংস্থাটির মতে, অর্থের সংস্থান নিশ্চিত না করে পুরো বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করলে বাজেটের ওপর চাপ বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতিও আরও উসকে যেতে পারে।

অর্থ বিভাগের একাধিক সূত্র জানায়, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধার হিসাব-নিকাশ করতেই হিমশিম খাচ্ছে সরকার। এ কারণেই সচিব কমিটি একাধিক বৈঠক করেও বাস্তবায়ন কৌশল চূড়ান্ত করতে পারেনি। আর্থিক বাস্তবতা বিবেচনায় কমিশনের সুপারিশে কিছু কাটছাঁটের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। মূল বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধায় পরিবর্তন আনার পাশাপাশি তিন ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হতে পারে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম ধাপে শুধু মূল বেতন কার্যকর হবে। পরবর্তী ধাপগুলোতে অন্যান্য ভাতা ও সুবিধা যুক্ত হবে। যদিও এ ধরনের ধাপভিত্তিক বাস্তবায়নে প্রযুক্তিগত জটিলতা দেখা দিয়েছে। কারণ বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থায় পরিচালিত হয়। ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) এবং আইবাস প্লাস সফটওয়্যারের মাধ্যমে বেতন, ইনক্রিমেন্ট, পেনশন, গ্রাচুইটি ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পরিশোধ করা হয়। 

ফলে মূল বেতনকে কয়েক ধাপে কার্যকর করতে হলে পুরো সফটওয়্যার কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে হবে, যা সময়সাপেক্ষ ও জটিল। বুধবারের বৈঠকে এ বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হলেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

এসব কারণে নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নতুন অর্থবছর শুরু হলেও এখনো গেজেট জারি করা সম্ভব হয়নি। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ১ জুলাই থেকেই নতুন পে-স্কেল কার্যকর হিসেবে গণ্য হবে এবং সে অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেতন-ভাতা পাবেন।

এ পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে পেনশনভোগীরা সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকায় তারা নির্ভর করছেন গণমাধ্যমের ওপর। সর্বশেষ তথ্য জানতে অনেকেই নিয়মিত গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।

২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। 

কমিশনের প্রস্তাবে সর্বনিম্ন বেতন আট হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন এক লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়। তবে পরিবর্তিত অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বর্তমান সরকার সেই সুপারিশ হুবহু গ্রহণ করেনি। ক্ষমতায় আসার পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে নতুন একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। 

দেশের রাজস্ব আয়, মূল্যস্ফীতি, বাজেট ঘাটতি, সরকারি ব্যয় ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কমিটি নতুন খসড়া প্রস্তুত করেছে। বর্তমানে সেই খসড়ার ভিত্তিতেই গেজেট চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।

এমএএস/একিউএফ