যমুনা ও মেঘনার ভাঙনে সিরাজগঞ্জের চৌহালী ও শাহজাদপুরে ভোলার অসংখ্য বসতবাড়ি ফসলি জমি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাঁধ বিলীন হয়ে গেছে। অনেক পরিবার ভাঙনের মুখে বাড়িঘর সরিয়ে নিচ্ছে। অনেকেই এখন খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছে। যুগান্তর প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর : সিরাজগঞ্জের চৌহালীর দক্ষিণে যমুনা নদীতে অব্যাহত পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ ভাঙন। গত এক সপ্তাহে প্রায় ৭শ মিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নদীর পেটে গেছে বেশ কিছু বসতভিটা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। হুমকির মুখে পড়েছে শতাধিক বসতবাড়ি ও কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তবে পাউবো জিও ব্যাগ ও টিউব নিক্ষেপ করে ভাঙন রোধে চেষ্টা করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে। সরেজমিন চরছলিমাবাদ এলাকায় দেখা গেছে, নদীর তীব্র স্রোতে একের পর এক বসতভিটা নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। অসহায় মানুষগুলো নদীর দিকে তাকিয়ে আছে। অনেকেই ঘরের টিন ও আসবাব নিয়ে নৌকায় অন্যত্র চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্তত ২০টি পরিবার খোলা আকাশের নিচে টিন কাঠ ছড়িয়ে রেখেছে। স্থানীয়রা জানান, চৌহালী উপজেলার বাঘুটিয়া ইউনিয়নের সম্ভুদিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন ঘাটের উত্তরপাশে প্রায় ৩শ মিটার, দক্ষিণপাশে প্রায় ১শ মিটার, চর সলিমাবাদ উত্তর পাড়ায় প্রায় ১শ মিটার এবং দক্ষিণপাড়ায় প্রায় ২শ মিটার এলাকা মুহূর্তের মধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে ২টি ইউনিয়নের ৬টি গ্রামে যমুনা নদীর ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। গ্রামগুলো হল, সোনাতনী ইউনিয়নের শ্রীপুর, ধীতপুর, কুরসি, বারপাখিয়া, গালা ইউনিয়নের মোহনপুর ও বৃ-হাতকোড়া গ্রাম। চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত এই ভয়াবহ ভাঙনের তাণ্ডবে এ ৬টি গ্রামের অধিকাংশ ফসলি জমি, বাড়িঘর, মসজিদ, মাদ্রাসা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। অবশিষ্ট যেটুকু রয়েছে তাও বিলীন হওয়ার পথে। গত ১ মাস আগেও যেখানে বাড়িঘর ছিল, এখন সেখানে অথৈ পানি। এ বিষয়ে ধীতপুর গ্রামের শতবর্ষী রহিতন বেগম বলেন, জন্মের পর ছোটবেলা থেকেই বাবার বাড়িতে কষ্ট করেছি। আবার বিয়ের পর স্বামী গরিব হওয়ায় সেখানেও কষ্ট করেছি। এ জীবনে সুখ কি জিনিস তা পেলাম না। এ বিষয়ে ধীতপুর মসজিদের ইমাম আব্দুল আলীম বলেন, এই চরে প্রচুর পরিমাণে পটোল, বেগুন, ধান, বাদাম, মাষকালাই, সরিষা, ইরি-বোরো, বাঙ্গী, সবজি, ধনিয়াসহ সব ধরনের ফসল চাষ হয়ে থাকে। নানা ফসল চাষ করে এ চরের মানুষ ভালোভাবেই জীবন যাপন করছিল। এখন প্রায় সবারই বাড়িঘর ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এ বিষয়ে ওই গ্রামের শামছুল হক জানান, এ পর্যন্ত ৭ বার তার বাড়িঘর ও ফসলি জমি যমুনা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। আবারও তিনি ভাঙনের কবলে পড়েছেন। এখন তার রাত কাটে ভাঙন আতঙ্কে।

এ বিষয়ে শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাবরিনা সারমিন ও সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম ভিডিও বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে বলেছেন, খোঁজখবর নিয়ে এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডেও সঙ্গে কথা বলবেন। এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডেও নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, চর রক্ষায় তাদের কোনো প্রকল্প নেই। তাই এখানকার ভাঙনরোধে তিনি কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবেন না। ভোলার মেঘনা নদীর তীব্র অব্যাহত ভাঙনের মুখে পড়েছে ভোলা সদর উপজেলার ধনিয়া ও শিবপুর এবং দৌলতখান উপজেলার মেদুয়া ও চরপাতা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা। এতে ইতোমধ্যে মেঘনাগর্ভে বিলীন হয়েছেন কয়েকশ একর ফসলি জমি, পর্যটন স্পট গরিবের ডুবাই, ভিটেমাটি ও নানা স্থাপনা। স্থানীয়দের দাবি, ২০২৫ সালের বর্ষা মৌসুম থেকে ভাঙনের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় এ পর্যন্ত কমপক্ষে ৬০০ একর কৃষিজমি, বসতভিটা, বাজার, মাছঘাট ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ঝুঁকিতে রয়েছে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ। ভাঙন প্রতিরোধের দাবিতে ওই চার ইউনিয়নের হুমকির মুখে থাকা মানুষ আন্দোলনসহ নানা কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। শিবপুর নতুন-কালীকীর্তি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মনির চান বলেন, ২০২৩ সালে বিদ্যালয়টিতে প্রায় ৩৫০ জন শিক্ষার্থী ছিল। ২০২৫-২৬ সালে এসে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ২০০ জনের কম। ভাঙনের কারণে অনেক পরিবার এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিদ্যালয়টি বর্তমানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বাইরে ভাঙনের মুখে অবস্থান করছে। নতুন-কালীকীর্তি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো আরও ৪-৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় বাঁধের বাইরে ভাঙনের মুখে। মেদুয়া ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ মো. মোসলেহউদ্দিন বলেন, গত এক বছর ধরে ভাঙনের তীব্রতায় গরিবের ডুবাই থেকে দক্ষিণে চরপাতা পর্যন্ত ৫০০ থেকে ৬০০ একর কৃষিজমি মেঘনায় বিলীন হয়ে গেছে। ৪-৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ একাধিক মসজিদ, মাঝিরহাট মাছঘাট, মুন্সিরহাট মাছঘাট, পূর্ব চরপাতা হুমকির মুখে আছে। মাঝির হাটের মৎস্য ব্যবসায়ী মো. কবির হোসেন বলেন, এই মেদুয়া ইউনিয়নে ছিল সাবেক পিটিআই ও মহাকুমা শহর। ভাঙনের কারণে শহর ও পিটিআই সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ১৯৮০-৯০ সালে ভাঙন বন্ধ হয়ে চর পড়তে শুরু করে। বর্তমানে ভাঙনের তীব্রতা বাড়ায় মেদুয়া ইউনিয়ন পরিষদের ১, ২, ৩, ৪ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ৫-৬ হাজার পরিবার ভাঙনের হুমকিতে আছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়া উদ্দিন আরিফ বলেন, ধনিয়া, শিবপুর, মেদুয়া ও চরপাতা ইউনিয়নের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ তীর সংরক্ষণে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সেখানে বালুভর্তি জিওটেক্সটাইল বস্তা ফেলা হচ্ছে। চলতি বছরে প্রায় এক লাখ বস্তা ফেলা হয়েছে। কিন্তু এটা স্থায়ী সমাধান নয়। ভোলার জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান বলেন, ‘অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। যাকে পাচ্ছি তাকেই আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।’