বিশ্বকাপের মঞ্চে আবার সেই চেনা রোমাঞ্চ, আবার সেই চেনা হৃৎস্পন্দন। কিন্তু এবার ব্রাজিলের সামনে শুধু প্রতিপক্ষ এগারোজন ফুটবলার নন, লড়তে হবে নিজেদের অতীতের কিছু অদ্ভুত আর অস্বস্তিকর ইতিহাসের বিরুদ্ধেও। ‘হেক্সা’ বা ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে আজ নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শেষ ষোলোর মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে নরওয়ের মুখোমুখি হচ্ছে সেলেসাওরা। মাঠের লড়াইয়ে ব্রাজিল ফেবারিট হলেও পরিসংখ্যান কিন্তু অন্য কথা বলছে।ইতিহাসের পাতায় নরওয়ে এমন এক নাম, যাদের বিপক্ষে আজ পর্যন্ত কখনোই জয়ের মুখ দেখেনি পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। শুধু তাই নয়, ২০০২ সালের পর থেকে নকআউট পর্বে কোনো ইউরোপীয় দলের বিপক্ষে জিততে না পারার ব্যর্থতা এবং ২০১৪ সালের পর থেকে প্রতি বিশ্বকাপের ঠিক ‘পঞ্চম ম্যাচে’ এসে বিদায় নেওয়ার অদ্ভুত এক অভিশাপ তাড়া করছে তাদের। আজ নরওয়েকে হারালে এটিই হবে চলতি আসরে কার্লো আনচেলত্তির দলের পঞ্চম ম্যাচ।বিশেষ ছক নেইম্যাচের আগে অবধারিতভাবেই ফুটবল বিশ্বের সব আলো কেড়ে নিয়েছেন নরওয়ের গোলমেশিন আর্লিং হলান্ড, যিনি চলতি বিশ্বকাপে ইতিমধ্যেই ৫ গোল করে দুর্দান্ত ছন্দে আছেন। তবে এই অতিমানবীয় স্ট্রাইকারকে থামাতে কোনো আকাশকুসুম পরিকল্পনা করতে রাজি নন ব্রাজিলিয়ান বস কার্লো আনচেলত্তি। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে সংবাদ সম্মেলনে নিজের আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “আমি মনে করি না, ‘অ্যান্টি-হলান্ড’ বলে কোনো পরিকল্পনা আছে। কীভাবে রক্ষণ করতে হবে, আমার খেলোয়াড়দের তা বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তারা বেশ কয়েকবার হলান্ডের মুখোমুখি হয়েছে। দল সেরা অবস্থায় আছে।তবে, আমাদের উন্নতি অব্যাহত রাখতে হবে।” ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে হলান্ডকে আটকে রাখার প্রচুর অভিজ্ঞতা থাকা ডিফেন্ডার গ্যাব্রিয়েল মাঘালায়েসের ওপরই ভরসা রাখছেন কোচ। মাঘালায়েস নিজে ও কোচ একই সুরে বলছেন যে, হলান্ডের খেলার ধরন সবার জানা, তাই নতুন করে তাকে বোঝানোর কিছু নেই। তবে মাঝমাঠের সেনানি ব্রুনো গিমারায়েস কিছুটা সতর্কবার্তা দিয়ে রেখেছেন। গিমারায়েস বলেন, “হলান্ড সত্যিই ভিন্ন ঘরানার। তাকে আমাদের মার্ক করে রাখতে হবে ও আক্রমণে উঠতে হবে। আমরা যখন আক্রমণে উঠব, তখন নিশ্চিত করতে হবে হলান্ডের সঙ্গে যেন কেউ থাকে। কারণ একবার বল পেলেই সে ম্যাচের ফল ঠিক করে দিতে পারে। আমরা সেটি করতে দেব না।”পাকেতার চোটে একাদশে বদল, সুপার সাব হিসেবে ফিরছেন রাফিনিয়াজাপানের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের নাটকীয় জয়ে আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে থাকা ব্রাজিল শিবিরে চোটের ধাক্কা লেগেছে। হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে টুর্নামেন্ট থেকেই ছিটকে যাওয়ার শঙ্কায় পড়েছেন মাঝমাঠের প্রাণ লুকাস পাকেতা। তার জায়গায় আজকের একাদশে দেখা যেতে পারে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লিকে। তবে ব্রাজিলের জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর হলো, চোট কাটিয়ে দলে ফিরেছেন তারকা উইঙ্গার রাফিনিয়া। হাইতির বিপক্ষে ম্যাচে উরুর চোটে পড়া এই ফুটবলারের ফেরা অলৌকিকের মতো হলেও আজ তিনি শুরু থেকে খেলছেন না। আনচেলত্তি ইঙ্গিত দিয়েছেন, নকআউট পর্বের এই মরণ-বাঁচন লড়াইয়ে রাফিনিয়াকে তিনি ট্রাম্পকার্ড হিসেবে ব্যবহার করবেন।কোচের ভাষায়, “রাফিনিয়ার শারীরিক অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। ও হয়তো এখনো শতভাগ ফিট নয়, তবে ও কিছু সময়ের জন্য মাঠে নেমে দলকে সাহায্য করতে পারবে।” আনচেলত্তি বেশ ভালো করেই জানেন, নকআউট পর্বের ম্যাচ কেবল ৯০ মিনিটেই শেষ হয়ে যায় না, খেলা অতিরিক্ত সময়েও গড়াতে পারে। তাই বেঞ্চে থাকা রাফিনিয়া, এন্ড্রিক কিংবা নেইমার জুনিয়রের মতো তারকারা যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে প্রস্তুত।আজ রাত দুইটায় যখন রেফারি বাঁশি বাজাবেন, তখন কোটি কোটি ব্রাজিল ভক্তের চোখ থাকবে টেলিভিশনের পর্দায়। নরওয়ের বিপক্ষে আগের চার দেখায় দুটিতে হার আর দুটিতে ড্র করা ব্রাজিল কি পারবে ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপের সেই ২-১ গোলের হারের প্রতিশোধ নিয়ে ইতিহাসের অভিশাপ ভাঙতে? নাকি হলান্ডের নরওয়েজিয়ান ঝড় স্তব্ধ করে দেবে সাম্বা নৃত্য? উত্তর মিলবে মাঠের যুদ্ধেই।