বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে আমরা দেখছি অবকাঠামো, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি; অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনে ক্রমবর্ধমান চাপ-জীবনযাত্রার ব্যয়, বাসস্থান সংকট, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার অভাব এবং তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা। এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যেই একটি প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে-উন্নয়নের পরবর্তী ধাপ কী হবে? শুধুই প্রবৃদ্ধি, নাকি মানুষের জীবনমানের বাস্তব পরিবর্তন?
আমার বিশ্বাস, এখন সময় এসেছে একটি সুস্পষ্ট, দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবসম্মত জাতীয় রোডম্যাপ গ্রহণ করার, যা আগামী ১০ বছরের জন্য বাংলাদেশের উন্নয়নের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে। এ রোডম্যাপের মূল লক্ষ্য হবে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও সাশ্রয়ী জীবনব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে উন্নয়নের সুফল শুধু পরিসংখ্যানে নয়, প্রত্যেক মানুষের জীবনে দৃশ্যমান হবে।
শিক্ষা কোনো ব্যয় নয়, এটি একটি জাতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। একটি টেকসই উন্নত বাংলাদেশ গড়তে হলে শিক্ষাব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে আধুনিক, দক্ষতাভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। গ্রাম ও শহরের শিক্ষার বৈষম্য কমাতে হবে এবং প্রতিটি বিদ্যালয়ে ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ, বিজ্ঞানাগার, লাইব্রেরি ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার লক্ষ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল নয়, বরং বাস্তব জীবনের দক্ষতা অর্জন। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার পরিসর বাড়াতে হবে, যাতে তরুণরা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে নতুন জ্ঞান সৃষ্টির পরিবেশ তৈরি হবে।
স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মৌলিক অধিকার। আজও অনেক পরিবার চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। এ বাস্তবতা পরিবর্তনের জন্য জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোকে আধুনিক যন্ত্রপাতি, পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও নার্স দিয়ে শক্তিশালী করতে হবে। কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হবে, যাতে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সহজলভ্য হয়। টেলিমেডিসিন ও ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ করলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা দেশের যে কোনো প্রান্তে পৌঁছানো সম্ভব। একইসঙ্গে ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্য খাতে স্বচ্ছতা এবং জরুরি সেবার মান উন্নয়ন জরুরি, যাতে কোনো মানুষ চিকিৎসার অভাবে পিছিয়ে না থাকে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী, আর এই শক্তিকে কাজে না লাগাতে পারলে উন্নয়নের গতি সীমিত হয়ে পড়বে। তথ্যপ্রযুক্তি, উৎপাদন শিল্প, কৃষিভিত্তিক শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পর্যটন ও সেবা খাতে বড় পরিসরে বিনিয়োগ প্রয়োজন। বিশেষ করে স্টার্টআপ এবং উদ্ভাবনভিত্তিক অর্থনীতিকে উৎসাহিত করতে হবে, যাতে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি হয়।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজে ঋণ, কর-সহায়তা এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করলে কর্মসংস্থান বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। প্রতিটি জেলায় দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র গড়ে তুলে তরুণদের বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে, যা তাদের দেশীয় ও বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।
নাগরিকদের আয়ের বড় অংশ যদি বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পরিবহণে ব্যয় হয়, তাহলে প্রকৃত উন্নয়নের অনুভূতি তৈরি হয় না। তাই পরিকল্পিত নগরায়ণ, সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্প এবং আধুনিক গণপরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। মেট্রোরেল, বাস, রেল এবং নৌপরিবহণকে একীভূত করে একটি সমন্বিত পরিবহণ নেটওয়ার্ক তৈরি করা যেতে পারে, যাতে সময় ও খরচ দুটোই কমে।
সবুজ নগরায়ণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং বাসযোগ্য শহর গড়ে তোলা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি। উন্নয়নের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু অবকাঠামো নয়, বরং মানুষের জন্য নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও সাশ্রয়ী জীবন নিশ্চিত করা।
কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি এবং এ খাতকে আধুনিক ও লাভজনক করা এখন সময়ের দাবি। কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, আধুনিক সেচব্যবস্থা, সংরক্ষণ সুবিধা এবং উন্নত সরবরাহ চেইন গড়ে তুলতে হবে। কৃষিপণ্যের অপচয় কমাতে প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প সম্প্রসারণ করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সহনশীল কৃষিপ্রযুক্তি এবং গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে খাদ্য নিরাপত্তা দীর্ঘমেয়াদে নিশ্চিত থাকে। একইসঙ্গে কৃষক যেন উৎপাদনের ন্যায্যমূল্য পান, সেটিও রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব হওয়া উচিত।
প্রযুক্তি এখন আর ভবিষ্যৎ নয়, এটি বর্তমানের অপরিহার্য বাস্তবতা। ভূমি, কর, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং প্রশাসনিক সেবা সম্পূর্ণ ডিজিটাল করলে দুর্নীতি কমবে, স্বচ্ছতা বাড়বে এবং নাগরিক সেবা দ্রুততর হবে। একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নাগরিকদের জন্য ‘এক দরজা সেবা’ নিশ্চিত করতে পারে, যা সময় ও খরচ উভয়ই সাশ্রয় করবে।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হওয়ায় উপকূলীয় সুরক্ষা, নদী ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ প্রস্তুতিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ অপরিহার্য। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সবুজ প্রযুক্তি এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে হবে এবং একটি টেকসই অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে।
দক্ষ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। সরকারি সেবা দ্রুত, ডিজিটালাইজড ও নাগরিকবান্ধব করতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং আইনের সমান প্রয়োগ জনগণের আস্থা বাড়াবে এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করবে।
আমি এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যেখানে কোনো শিশুর ভবিষ্যৎ তার জন্মস্থান বা পারিবারিক অবস্থার ওপর নির্ভর করবে না; যেখানে কোনো পরিবার চিকিৎসার ব্যয় নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকবে না; যেখানে প্রত্যেক তরুণ নিজের দেশে সুযোগ খুঁজে পাবে এবং কোনো নাগরিক নিজেকে উন্নয়নের বাইরে মনে করবে না।
বাংলাদেশের সম্ভাবনা অসীম। প্রয়োজন শুধু একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং জাতীয় ঐক্য। আগামী ১০ বছরের মধ্যে যদি আমরা এ নতুন বাংলাদেশের রোডম্যাপ বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশ শুধু অর্থনৈতিক শক্তি নয়, মানবিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বিশ্বে একটি উদাহরণ হয়ে উঠবে।
অ্যাডভোকেট শফিকুল হক : সাবেক মেয়র, টাওয়ার হ্যামলেটস, যুক্তরাজ্য








